Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শুক্রবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১১ অক্টোবর, ২০১৮ ২৩:২৭
পিছনে ফেলে আসি
রফিক আজাদের পাগলামি
ইমদাদুল হক মিলন
রফিক আজাদের পাগলামি

রফিক আজাদের পাগলামি এবং রসিকতার কোনো তুলনা ছিল না। আমাদের বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজামও একবার তার পাগলামির শিকার হয়েছিলেন। বছর তিরিশেক আগের কথা। এক রাতে আমার গেন্ডারিয়ার বাসায় আড্ডা দিতে গেছেন রফিক আজাদ আর নঈম নিজাম। নঈমকে খুবই ভালোবাসতেন রফিক ভাই। সেদিন প্রায়  মধ্যরাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে বেরোলেন দুজনে। রফিক ভাইয়ের ব্যাগে তার প্রকাশিত নতুন বই। এক কপি বই তিনি নঈমকে দেবেন। সঙ্গে কলম নেই বলে লিখে দিতে পারছেন না। নঈম তখন আরামবাগে থাকেন। রফিক ভাই থাকেন ধানমন্ডিতে। আমি রিকশা ঠিক করে দিয়েছি। নঈমকে আরামবাগে নামিয়ে দিয়ে রফিক ভাই চলে যাবেন তার বাসায়। আরামবাগে এসে একটা কলমের খোঁজে পুরো পাড়া প্রায় জাগিয়ে তুললেন রফিক ভাই। বন্ধ দোকানপাট ধাক্কাধাক্কি করে প্রায় খুলে ফেলেন। নঈম যত বোঝাচ্ছেন, বইটা আপনি দিয়ে যান রফিক ভাই। পরে একদিন লিখে দিলেই হবে। রফিক ভাই কিছুতেই সে কথা মানছেন না। না, এই মধ্যরাতেই তিনি নিজ হাতে লিখে বই দেবেন নঈম নিজামকে। শেষ পর্যন্ত এক চায়ের দোকান থেকে ভাঙাচোরা একটা কলম সংগ্রহ করে নঈমকে লিখে দিলেন। বাংলাদেশ প্রতিদিনে এই কলাম লেখার কথা যখন হচ্ছে নামটা নঈমই ঠিক করে দিলেন। রফিক আজাদের কবিতার লাইন ‘পিছনে ফেলে আসি’। আহা রে কত পিছনে ফেলে এসেছি আমরা আমাদের সেই সুখের জীবন। সেই উত্তাল পাগলামিভরা দিনগুলি। দুজন মানুষ রফিক আজাদকে বাবা ডাকতেন। একজন সেলিম আল দীন আরেকজন আমি। সেলিম ভাই ডাকতেন প্রকাশ্যে আমি গোপনে। বিভিন্ন জায়গায় বলতাম রফিক আজাদ আমার বাবা। ঔরসজাত না হয়েও আমি তার সন্তান। সেলিম ভাইকে নাটক লেখার জগতে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন রফিক আজাদ। সেলিম ভাই লিখতেন কবিতা। তার কবিতা পড়ে রফিক ভাই বললেন, তোর কবিতায় নাটকের উপাদান আছে। তুই নাটক লেখ। এই মন্ত্রেই সেলিম আল দীন হয়ে উঠলেন বাংলা নাট্যজগতের কিংবদন্তি। ছিয়াত্তর সালে প্রায় রাস্তা থেকে ডেকে নিয়ে আমার প্রথম উপন্যাস ‘যাবজ্জীবন’ দেড় বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ছাপলেন বাংলা একাডেমির ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকায়। তখন তিনি ওই পত্রিকার সম্পাদক। একুশ বছর বয়সের ইমদাদুল হক মিলনের কথাসাহিত্যের ভুবন তৈরি করে দিলেন। এই মানুষকে বাবা ডাকব না তো কী ডাকব! রফিক আজাদকে নিয়ে আমি একটা উপন্যাস লিখেছিলাম, ‘দুঃখ কষ্ট’। উপন্যাসের প্রতিটি চ্যাপ্টার শুরু হয়েছিল রফিক আজাদের কবিতার লাইন দিয়ে। ‘দুঃখ কষ্ট’ নামটাও তাঁর কবিতা থেকে নেওয়া। এই পাগল আর রসিক কবিটির মনে লুকিয়ে ছিল চিরকালীন এক দুঃখবোধ। সেই জায়গাটি আবিষ্কারের চেষ্টা করেছিলাম। থাক সেসব বেদনার কথা। রফিক ভাইয়ের পাগলামি আর রসিকতার কথা বলি। একবার এক সাহিত্য সম্মেলনে গেছি। খুলনা অথবা যশোরে। রফিক ভাই তখন জিন্স আর টি-শার্ট পরেন। শরীর কুস্তিগিরের মতো। নাকের তলায় বিশাল গোঁফ। হাতে চেইন পরা। গলায় লকেট। আমার অবস্থাও প্রায় তেমন। সেই সাহিত্য অনুষ্ঠানে একজন রাজনৈতিক নেতা এসেছেন। আমরা দুজন প্যান্ডেলের বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছি। নেতা আমাদের দেখতে চাইলেন, মঞ্চে ডাকলেন। রফিক ভাই খুবই বিরক্ত। আমাদের আবার দেখার কী আছে? আমার হাত ধরে বললেন, আয় তো।

আমরা মঞ্চে গিয়ে উঠলাম। রফিক ভাই মাইক নিয়ে সেই নেতাকে বললেন, ভাই, আমাদের দেখে আপনি খুশি হবেন না। আমাদের চেহারা কবি-সাহিত্যিকদের মতো না। আমাদের চেহারা জলদস্যুদের মতো। সেই লোক হতভম্ব। বাংলা একাডেমির তিনতলায় উত্তরাধিকারের অফিস। রফিক ভাইয়ের রুমে একদিন বসে আছি। দুজন যুবকের একজন রুমে ঢুকল আরেকজন উঁকি দিয়ে চলে গেল। রুমে যে ঢুকেছে রফিক ভাই তার দিকে তাকালেন। যুবককে তিনি চিনেছেন কিন্তু মহাবিরক্ত। বললেন, তুমি যেন কে? ছেলেটি অবাক! রফিক ভাই, আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না? আমার নাম গোলাপ। রফিক ভাই বললেন, গোলাপ তো বুঝলাম, সঙ্গের ওই কাঁটাটি কে? যে উঁকি দিয়ে গেল! হুমায়ূন আহমেদের ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ উপন্যাসের প্রকাশনা উৎসব হলো সেগুনবাগিচার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। অনুষ্ঠান শেষে ঢাকা ক্লাবে পার্টি। বড় বড় কবি-সাহিত্যিকরা আছেন। শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আনিসুজ্জামান, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, রফিক আজাদ। হুমায়ূন আহমেদের প্রতিভায় রফিক ভাই খুবই মুগ্ধ। একসময় হুমায়ূন আহমেদকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে লাগলেন। হুমায়ূন আহমেদ অস্থির হয়ে গেলেন কিন্তু রফিক ভাই তাকে ছাড়ছেনই না। পাশে দাঁড়িয়ে আছি আমি। হুমায়ূন আহমেদ আমার দিকে তাকিয়ে অসহায় কাতর কণ্ঠে বললেন, মিলন, তোমার বাবার হাত থেকে আমাকে বাঁচাও। চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর আগে সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকা ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন দেওয়ার রেওয়াজ চালু করল। রফিক আজাদ বিজ্ঞাপন দিলেন ‘যে মেয়ে আমাকে চুমু খাবে তাকে কবিতা উৎসর্গ করবো’। পাগলামি কাহাকে বলে! একবার ‘পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি’ নামে একটা সংগঠন করেছিলেন রফিক ভাই। স্ত্রীদের হাতে নির্যাতিত পুরুষদের একত্রিত করার কাজে নেমেছিলেন। কোনো সদস্য পাননি। কে আসবে নিজের সংসারে আগুন জ্বালাতে? এই বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাগী এবং মহান কবি রফিক আজাদের মনের ভিতরটা ছিল শিশুদের মতো। গভীর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। নিজেকে অবিরাম বদলাবার চেষ্টা করেছেন কবিতায় এবং জীবনে। লিখেছিলেন, ‘যদি ভালোবাসা পাই, আবার শুধরে নেবো জীবনের ভুলগুলি’।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow