Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১৪ নভেম্বর, ২০১৮ ২২:৫৬
সাক্ষাৎকারে এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসাইন ভূঁইয়া
আয়কর আদায় বাড়লে ন্যায় বিচারও বাড়বে
রুহুল আমিন রাসেল
আয়কর আদায় বাড়লে ন্যায় বিচারও বাড়বে

বাংলাদেশে আয়কর আদায়ের হার বাড়লে সামাজিক ন্যায়বিচারও বাড়বে বলে মনে করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসাইন ভূঁইয়া। তার মতে, যে দেশে কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর এই তিন শ্রেণির করের মধ্যে আয়কর আদায় বেশি হয়, সেখানে ন্যায়বিচারও পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টনও ভালো হয়। অর্থাৎ গরিব মানুষ কর দেবে না কিন্তু ধনী মানুষ সেই অভাবটা পূরণ করবে—আয়কর আদায়ের এই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এখনো বাংলাদেশ পৌঁছায়নি। রাজধানীর সেগুনবাগিচার রাজস্ব ভবনের নিজ কার্যালয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসাইন ভূঁইয়া। তিনি বলেন, অনেকের একটা ধারণা, কর যদি কম দেখানো হয় তাহলে ভবিষ্যতেও কর কম দেওয়া যাবে। করদাতাদের এই মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে। এ বিষয়ে দৃষ্টি দিয়ে কাজ করছে এনবিআর। অর্থাৎ একজন করদাতা যখন যেমন আয় করবেন, তখন তেমন কর দেবেন। তার ব্যবসা ভালো হলে কর বেশি দেবেন। ব্যবসা খারাপ হলে কম কর দেবেন। আবার করদাতাদের প্রণোদনা দিয়েও উৎসাহিত করছি।’ এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘করদাতার সংখ্যা বাড়ানোই এখন এনবিআরের বেশি চ্যালেঞ্জ। করের জাল বাড়াতে কিছু সংস্কার আমরা করব। অনেকের ধারণা করহার কমালে আয় বাড়বে। এটাও আমাদের বিবেচনায় আছে। এ ক্ষেত্রে করদাতাদের প্রতি আহ্বান, এখনো যারা করদাতা হননি তাদের নৈতিক দায়িত্ব থেকেই আয়কর প্রদানের জোর অনুরোধ করছি।’ অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের এই সিনিয়র সচিব কর প্রশাসনের সম্প্রসারণের কথা তুলে ধরে বলেন, সারা দেশে কর বিভাগের জনবল বাড়ানো হচ্ছে। দেশের যেসব জেলা-উপজেলায় আয়কর অফিস নেই, কিন্তু কর আদায়ের ভালো সম্ভাবনা আছে, সেখানে নতুন অফিস করা হবে। এ লক্ষ্য আছে এনবিআরের। পাশাপাশি ভ্যাটের আওতা বাড়াতে অনলাইন প্রকল্প চালু আছে। কাস্টমসের অটোমেশনের দিকে নজর দিচ্ছি। বন্ড কার্যক্রম অটোমেশন করে সেখানকার দুর্নীতি বন্ধ করা হবে। কাস্টমস বন্দরের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে। পণ্য খালাসে বিলম্ব যেন না হয় সেদিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। সঠিকভাবে যাতে শুল্কায়ন হয়, যাতে বন্দর থেকে প্রত্যাশিত রাজস্ব আয় হয়। মোশাররফ হোসাইন ভূঁইয়া বলেন, ‘একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো রাজস্ব। দেশের রাজস্বের সিংহভাগ আসে আয়কর থেকে। কাজেই অর্থনৈতিক উন্নয়নে আয়করের বিকল্প নেই। আয়করের ভূমিকা আরও সুসংহত করার জন্য করভিত্তি সম্প্রসারণ ও করসেবার মান বাড়ানোর মাধ্যমে কর প্রদান সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে জনসচেতনতা বাড়ানো, উন্নত তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, আইনের সহজিকরণ, সর্বোপরি করবান্ধব পরিবেশ তৈরি আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির অন্যতম সোপান।’ তিনি বলেন, এনবিআরের আয়কর অফিস ও ব্যবস্থাপনা সনাতনী পদ্ধতি থেকে বের করে এনে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসন হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। এখন অনলাইনে শুধু টিআইএন নয়, সম্পদবিবরণীসহ রিটার্ন দাখিল করা যাচ্ছে। অনলাইনে পেমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে সহজেই কর পরিশোধ করা যাচ্ছে। এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, এনবিআরের আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও করসেবার সৃজনশীল আয়োজন আয়কর মেলা। আয়করের মতো কঠিন বিষয়কে নিয়ে মেলার আয়োজন জনসেবার ক্ষেত্রে নতুন মাইলফলক তৈরি করেছে। কর আহরণের পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আয়কর বিভাগ নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ‘উন্নয়ন ও উত্তরণ, আয়করের অর্জন’ স্লোগান সামনে রেখে এ বছর আয়কর মেলার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘আয়কর প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচার ও ধারাবাহিক উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ’। তিনি বলেন, সরকারের রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নের জন্য একদিকে যেমন পর্যাপ্ত রাজস্ব প্রয়োজন, অন্যদিকে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যও হ্রাস করা জরুরি। সরকারের নীতিমালার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এনবিআর রাজস্ব রূপকল্প-২০২১ ও রাজস্ব রূপকল্প-২০৪১ নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। রাষ্ট্রের রাজস্ব ভাণ্ডারে পর্যাপ্ত রাজস্বের জোগান দিতে আয়কর বিভাগে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উদ্ভাবনীমূলক কর্মকাণ্ড চালু করা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। মোশাররফ হোসাইন ভূঁইয়ার মতে, আয়কর কেবল রাজস্ব আহরণের প্রধান খাত নয়, এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠারও কার্যকর মাধ্যম। ফলে আয়করের মাধ্যমে রাজস্বের বৃহত্তম অংশ আদায়ে সব দেশ সচেতন প্রয়াস চালায়। কিন্তু কর পরিপালন বিশ্বের সব দেশেই একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। বাঙালি জাতির উৎসবমুখী চিরায়ত সামাজিক জীবনের সঙ্গে যদি আয়কর আহরণের মতো জটিল বিষয়কে যুক্ত করে দেওয়া যায়, তাহলে করদাতারা উৎসবের আমেজে আয়কর প্রদানের সুযোগ পাবেন এবং এর মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়বে। এনবিআর চেয়ারম্যান করদাতাদের সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, ‘অনেকেই এখন স্বেচ্ছায় আয়কর দিতে আসছেন। আয়করবিষয়ক আইন ও বিধি সম্পর্কে করদাতারা এখন ভালোভাবে জানার সুযোগ পাচ্ছেন। রিটার্ন দাখিলে অতীতে অন্যের ওপর করদাতাদের যে নির্ভরশীলতা ছিল, তা কমে আসছে। এখন অনেকেই নিজের আয়কর রিটার্ন নিজেই পূরণ করতে পারছেন। কর সম্পর্কে অস্পষ্টতা এবং  ভয়ভীতির বিষয়ও অনেকটা কেটে গেছে। অদূর ভবিষ্যতে এ ধরনের অস্পষ্টতা ও ভয়ভীতি  একেবারেই থাকবে না বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।’

এই পাতার আরো খবর
up-arrow