Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : সোমবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২৩:২৫
পরিবহনে চলছেই নৈরাজ্য
উন্নয়নের জোয়ারেও পরিবহনে দুর্ভিক্ষের ছাপ, চালক-শ্রমিকরা বেপরোয়া, ভোগান্তির শেষ নেই, শৃঙ্খলা ফেরেনি সড়কে
সাঈদুর রহমান রিমন
পরিবহনে চলছেই নৈরাজ্য
এলোমেলো চলছে বাস। যাত্রী ওঠানো-নামানো যেখানে সেখানে

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলন, সরকারি নানা উদ্যোগ, ট্রাফিক বিভাগের বিভিন্ন তৎপরতা সত্ত্বেও রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরেনি। ফলে দুর্ঘটনা কমেনি মোটেও, পদে পদে-বেড়েছে যাত্রী হয়রানি। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর পরই সরকারের উচ্চ মহলের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাজপথসহ সড়ক-মহাসড়কের সর্বত্র সতর্ক ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠে। এতে সড়ক ও পরিবহন সেক্টরে কিছুটা শৃঙ্খলা আনা গেলেও তা টেকসই হয়নি। মাত্র এক মাসের ব্যবধানেই বদলে গেছে সে দৃশ্যপট। পরিবহন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতা ও গাড়ি মালিকদের দাপটে চালক-হেলপাররা আবার বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা করছে না। বিপজ্জনক ওভারটেকিং ও যাত্রীবোঝাই বাস-মিনিবাস নিয়ে তারা মরণঝুঁকির পাল্লাপাল্লিতেও লিপ্ত হচ্ছে অহরহ। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে, যাত্রী-পথচারীরাও প্রাণ হারাচ্ছেন গাড়ির চাপায়। চালকের সহযোগী কন্ডাক্টর-হেলপাররা যাত্রীদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করেন, বাদানুবাদ, হাতাহাতিতেও জড়িয়ে পড়েন। এ ছাড়াও মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামাসহ নানা কারণেই যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। দায়িত্বশীলরা পরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে আবার চাঁদাবাজি, টোকেন বাণিজ্য আর বখরাবাজিতে মেতে উঠেছেন। ট্রাফিক পুলিশের সামনেই ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল করছে। ভুয়া লাইসেন্সধারী চালকের নানা অপকর্ম দেখেও তারা না দেখার ভান করেন। রাস্তায় শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ট্রাফিক সদস্যরা ভুক্তভোগী যাত্রী ও পথচারীদের কোনো অভিযোগ আমলে নেন না। তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিবহন চালকদের পক্ষে ভূমিকা রাখেন। 

নৈরাজ্য চরমে : সড়ক ও পরিবহন খাতের নৈরাজ্য চরম আকার ধারণ করেছে। ট্রাফিক কর্মকর্তারা জানান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণেই দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। যাতায়াত ক্ষেত্রে নিত্য ভোগান্তির শিকার ক্ষুব্ধ নাগরিকরা বলেন, দেশের সর্বত্র উন্নয়নের আলো পৌঁছালেও পরিবহন সেক্টরে এখনো রয়েছে দুর্ভিক্ষের ছাপ। খোদ রাজধানীতেই সড়ক ও পরিবহনের নৈরাজ্য চিত্র গোটা দেশের ভাবমূর্তিকে ম্লান করে দেয়। ঢাকার রাস্তায় বের হলেই চোখে পড়ে লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহন। বাস-মিনিবাসের বাম্পারসহ নানা অংশ খুলে ঝুলতে থাকে বিপজ্জনকভাবে। কোনোটির রং চটা, কোনোটির ছাল ওঠা। জোড়াতালি দিতে দিতে সিট কভারের ওপর পড়ে আছে দুর্ভিক্ষের ছাপ। ফিটনেসবিহীন শত শত গাড়ির ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে রাজধানী। রাজপথ দাপিয়ে বেড়ানো বেশির ভাগ বাস-মিনিবাসই ফিটনেসবিহীন। ঢাকায় কয়েক হাজার বাস-মিনিবাসের ফিটনেসের মেয়াদ অতিক্রান্ত হলেও ফিটনেস সার্টিফিকেট মিলছে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিআরটিএ-তে ‘কম্পিউটারাইজড ব্যবস্থাপনা’ চালুর পর থেকে চোরাগোপ্তা পথে ফিটনেস সার্টিফিকেট ম্যানেজের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফিটনেস সার্টিফিকেটবিহীন, চলাচলের সম্পূর্ণ অযোগ্য, রুট পারমিট ছাড়া গাড়িগুলো রাজপথ দাপিয়ে বেড়ালেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো উপায় নেই। অবৈধ গাড়ির বেআইনি চলাচলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলেই পরিবহনের মালিক সমিতি, চালক ইউনিয়ন, শ্রমিক ফেডারেশনসহ নানা সংগঠনের ব্যানারে হরতাল, অবরোধ, ধর্মঘটের সীমাহীন নৈরাজ্যের সৃষ্টি করা হয়।  

সড়কে বেপরোয়া প্রতিযোগিতা : যাত্রীবাহী বাস-মিনিবাস দৈনিক ভিত্তিতে ‘ইজারা’ নিয়েই বেপরোয়া হয়ে উঠেন চালকরা। রাস্তায় নামলেই দৈনিক চাঁদা, পুলিশের বখরা, মাস্তান ভাতাসহ মালিকের টাকা মিলিয়ে অন্তত ছয় হাজার টাকা পরিশোধের পরই কেবল চালক-হেলপাররা নিজেদের বেতন-ভাতা পকেটে নিতে পারেন। খরচের তালিকায় রয়েছে মালিক সমিতির চাঁদার টাকা, মোবাইল কোর্ট বন্ধের নামে টাকা, শ্রমিকদের নানা সংগঠনের নামে টাকা এবং চালক, কন্ডাক্টর, হেলপারের বেতন-ভাতাসহ রুট খরচ, পার্কিং বখরা, টার্মিনাল খরচ, মস্তান ভাতা। এ ছাড়া পুলিশ বখরা তো আছেই। গাড়ির মালিক প্রতিদিন ৩-৪ হাজার টাকার বিনিময়ে গাড়ি দেন ড্রাইভারকে। সেই ড্রাইভার ভোর ৫টা-রাত ১২টা পর্যন্ত গাড়ি চালান নিজে অথবা হেলপারকে দিয়ে। গাড়ি থেকে যা আয় হয় তা সব পাওনা মিটিয়ে ড্রাইভার- হেলপার নেন। অতিরিক্ত আয়ের হাইপার টেনশনের মধ্যে চালকরা চরম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতেও পিছপা হন না। এ কারণেই মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং একই রুটে চলাচলকারী বাস-মিনিবাসকে পেছনে ফেলতে পাল্লাপাল্লি করে গাড়ি চালানোর অপকর্মে মেতে ওঠেন চালকরা। সড়কে নৈরাজ্য সৃষ্টির নানা অপরাধ করেও চালকরা শাস্তিমুক্ত থাকায় দিন দিনই তারা বেপরোয়া হয়ে উঠছেন।

যেখানে ট্রাফিক সেখানেই যানজট!! সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্ট পরিদর্শনকালে দেখা যায়, যেসব স্থানে ট্রাফিক সার্জেন্ট-কনস্টেবলরা ডিউটিতে ব্যস্ত তাদের চারপাশেই যানজটের ভয়ঙ্কর দৃশ্যপট গড়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে টার্গেটকৃত গাড়িগুলো থামিয়ে কাগজপত্র পরীক্ষার নামে চাঁদাবাজিকেই দায়ী করেন ভুক্তভোগী চালকরা। তারা জানান, মাঝ রাস্তায় এসব চাঁদার লেনদেন, দরকষাকষির ঘটনাতেই ট্রাফিক পয়েন্টগুলোতে যানজট হয়। এদিকে রাজধানীতে মধ্যরাতেও ভয়াবহ যানজট সৃষ্টির নেপথ্য কাহিনী জানা গেছে। রাত ১০টার পর থেকেই ব্যস্ততম বিভিন্ন সড়কের সিংহভাগ অংশ বাস-মিনিবাসের পার্কিংস্থল হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়। ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের মাস্তান-সন্ত্রাসীরা এসব সড়ক ভাড়া দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাত ৯টার পর মহাখালী টার্মিনাল থেকে মহাখালী মোড় পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশে তিন সারিতে শত শত কোচ পার্ক করে রাখা হয়। ফাঁকা রাখা সামান্য একচিলতে রাস্তা দিয়ে প্রাইভেটকার-মাইক্রো যাতায়াতও কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। অবৈধ পার্কিং বাণিজ্যের কারণে বঙ্গবাজারের সামনে থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত ফুলবাড়িয়ার প্রশস্ত রাস্তাটি অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। স্থানটি মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, কাপাসিয়া, কালিগঞ্জ, সাভার-ধামরাইসহ ৩০টি রুটের শত শত বাস-মিনিবাসের স্থায়ী টার্মিনালে পরিণত হয়েছে। গোটা সড়কটি টার্মিনাল, না স্ট্যান্ড, নাকি হাটবাজার তা ঠাহর করা মুশকিল। একইভাবে মিরপুর ১১ থেকে ১২ পর্যন্ত, কালশী সড়ক, মিরপুর মাজার রোড, চিড়িয়াখানা রোড, যাত্রাবাড়ী থেকে শনির আখড়া পর্যন্ত, মোহাম্মদপুর টাউন হল থেকে ধানমন্ডি আবাহনী মাঠ পর্যন্ত, আজিমপুর মোড়ের চারপাশের রোডগুলো, টিকাটুলী রাজধানী মার্কেট থেকে সায়েদাবাদ ব্রিজ পর্যন্ত, রিং রোড থেকে মেরুল বাড্ডা পর্যন্ত, মালিবাগ বাজার মোড় থেকে খিলগাঁও ফ্লাইওভার, কমলাপুর স্টেশন থেকে পীরজঙ্গি মাজার পর্যন্ত এলাকা বিভিন্ন রুটের বাস-মিনিবাসের স্থায়ী টার্মিনালে পরিণত হয়েছে। পুরান ঢাকার প্রধান সড়ক নর্থ-সাউথ রোডের অর্ধেকটা অনেক আগেই দখল করে নিয়েছে সংলগ্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। ওই সড়কের বেশির ভাগ অংশই সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মালামাল রাখা ও লোড-আনলোডের পয়েন্টে পরিণত হয়ে আছে।

ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ডিজিটাল সিগন্যালিং ব্যবস্থা গড়ে তুললেও ট্রাফিক কর্মকর্তারাই সেসব সিগন্যাল ব্যবস্থা অচল করে ফেলে রাখছেন। রাস্তায় দাঁড়ানো ট্রাফিক কর্মকর্তারা লাল-সবুজ সংকেতের ভ্রুক্ষেপও করেন না। তারা ইচ্ছামাফিক গাড়ি ছাড়েন, ইচ্ছামাফিক বন্ধ রাখেন।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow