Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২৩:১৪

মানব পাচারে নিত্যনতুন রুট

আকাশপথে ইন্দোনেশিয়া হয়ে নতুন গন্তব্যে পৃষ্ঠপোষকতায় বিদেশি তিন এয়ারলাইনস

মির্জা মেহেদী তমাল ও সাখাওয়াত কাওসার

মানব পাচারে নিত্যনতুন রুট

রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর ও নরসিংদীর পলাশ এলাকার বাসিন্দা দুই নারীকে মালয়েশিয়ায় ভালো বেতনের চাকরি পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখায় আক্তার বেপারী ও তার চক্র সঙ্গীরা। তাদের লোভনীয় প্রস্তাবে সাড়া দিলে, গত বছরের আগস্টে পাচার চক্রের লোকরাই ওই দুই নারীকে প্রথমে নিয়ে যায় ভারতের কলকাতায়। সেখান থেকে ট্রেনযোগে উড়িষ্যা হয়ে আরও ২৩ জনকে ভিসা দেওয়া হবে পদ্ধতিতে (অন-এরাইভাল) ইন্দোনেশিয়ায় নিয়ে যায়। ৫/৭ দিন পর ইন্দোনেশিয়ার             মেদান থেকে সমুদ্রপথে তাদের ঢুকিয়ে দেয় মালয়েশিয়ায়। সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি দালাল বাবুল ও মহসিন ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকায় নারীদ্বয়কে বেচে দিল এক চীনা নাগরিকের কাছে। তিন মাস ধরে তাদের ওপর চলে যৌন নির্যাতন। এক পর্যায়ে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিক আবদুল হাকিম নরসিংদীর নারীটিকে উদ্ধার করতে গেলে তার কাছ থেকে প্রায় তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় পাচারকারী চক্র। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে দেশ থেকে টাকা নিয়ে বাংলাদেশে আসে। জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে মানব পাচার চক্রগুলোর চোখ পড়েছে আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়া এবং  মৌরিতানিয়ার দিকে। চক্রের খপ্পরে পড়া নরনারীদের সেখান থেকে সাগরপথে পাচার করা হচ্ছে ইউরোপের  স্পেন ও ইতালিতে। এর বাইরে মানব পাচারের জন্য চক্রের পছন্দে রয়েছে ইউরো-এশিয়ান দেশ জর্জিয়া, তুরস্ক, এশীয় দেশ ইরান এবং আফ্রিকান দেশ লিবিয়া।

অভিযোগ রয়েছে, মানব পাচারের অন্যতম পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকায় থেকে দালাল চক্রকে খুঁজে নিচ্ছে কয়েকটি এয়ারলাইনসের দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা। এগুলো হচ্ছে ফ্লাই দুবাই, এয়ার এরাবিয়া এবং মালিন্দ।

বিশেষায়িত একটি সংস্থার কর্মকর্তা বলেন, এয়ার এরাবিয়া, মালিন্দ এবং ফ্লাই দুবাই এয়ারলাইনস বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনের কিছু লোককে ‘হাত’ করে নেয়। এরাই বলে দেয় কোন কাউন্টার দিয়ে লোক ঢুকাবে। একাধিক চক্রের সঙ্গে এই এয়ারলাইনসগুলোর বদলোকগুলোর সরাসরি লেনদেন চলে। বেশির ভাগ সময়ই এসব এয়ারলাইনসের এয়ারক্রাফটগুলো তাদের ফাঁকা সিট ভর্তি করে নিয়ে যায় ভিসা-টিকিটহীন সহজ-সরল বাংলাদেশিদের দিয়ে।

চক্রটি বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে ই-ভিসার (ইলেকট্রনিক্স ভিসা) সুবিধায় ইউরোপে যেতে আগ্রহীদের প্রথমে জর্জিয়া পাঠায়। এরপর তাদের তুরস্ক হয়ে ইউরোপের অন্য  কোনো দেশে পাঠানোর জোর চেষ্টা চালায়। বিকল্প হিসেবে অবৈধভাবে সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। সব কিছুই হয় চুক্তির ভিত্তিতে। বাংলাদেশি দালাল চক্রের সঙ্গে তুরস্ক ও জর্জিয়ার কিছু নাগরিক জড়িত। বাংলাদেশ থেকে জর্জিয়া পাঠানোর জন্য ঢাকা, যশোর ও সিলেটকেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে উঠেছে। এদের নিজস্ব লোক রয়েছে জর্জিয়ায়। তুরস্কের আঙ্কারায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম. আল্লামা সিদ্দিকী ও প্রথম সচিব মো. আরিফুর রহমানের স্বাক্ষরে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে পাঠানো দুটি প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রথম সচিবের পাঠানো প্রতিবেদনে ১০ সদস্যের দালাল চক্রের কথা বলা হয়েছে। এ তালিকায় রয়েছে- সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার  গোবিন্দগঞ্জ গ্রামের ইসলাম উদ্দিন, যশোরের নোয়াপাড়ার  দোপাটি পশ্চিম পাড়ার হালিম হোসেন, সিলেটের স্টেশন রোডের অভি ট্রাভেলসের মালিক অভি (তার সঙ্গে সজীব নামে একজন জড়িত), সিলেটের তাজ ট্রাভেলসের মালিক শরীফ ও আল হারামাইন ট্রাভেলস। এ ছাড়া সিলেটের পাভেল, সোহেল, রনি, ফরিদপুরের মনির (জর্জিয়ার তিবিলিসে বসবাসরত) এবং যশোরের দীপ্ত দালাল চক্রের সদস্য হয়ে জর্জিয়াতে মানব পাচার করছেন।

জানা গেছে, জর্জিয়া থেকে ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপের  দেশগুলোয় যাওয়ার সময় মৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছেন অনেক বাংলাদেশি। এ ছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে দ-প্রাপ্ত হয়ে অনেক বাংলাদেশি জর্জিয়ার জেলখানায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এরই মধ্যে জর্জিয়া থেকে তুরস্কে যাওয়ার সময় সীমান্তে মারা যান দুই বাংলাদেশি, যাদের লাশ দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে এসেছে। ২০১৫ সালের ৪ ডিসেম্বর জর্জিয়াতে পাঁচজন বাংলাদেশি মারা যান। বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে তুরস্ক পাড়ি দিতে গিয়ে তাদের প্রাণ যায়। ইউরোপে ঢুকতে অনেক বাংলাদেশি সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ হয়ে জর্জিয়াতে যাচ্ছেন। র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জাহাঙ্গীর আলম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মানব পাচার ঠেকাতে এলিট ফোর্স র‌্যাব কী ভূমিকা রেখেছে তা সবাই জানে। কিছুদিন ধরে মাদক এবং জঙ্গি-সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বের কারণে মানব পাচারকারীরা হয়তো একটু সুযোগ খুঁজছে। তবে মানব পাচার থেকে কিন্তু আমরা দৃষ্টি সরাইনি। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার  মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, মানব পাচারের কোনো ঘটনা নজরে এলে আমরা আইনের আশ্রয় নেব। এ ব্যাপারে সবসময়ই আমরা কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে আসছি। মানব পাচার ও মানি লন্ডারিংয়ের হোতা হিসেবে কয়েকদফা গ্রেফতার তেজগাঁও কলেজের শিক্ষক আছেমের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আছেম আদালত থেকে জামিনে বের হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। আমরা বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছি। অন-এরাইভাল ভিসা সুবিধার কারণে ইন্দোনেশিয়ার বালি ও মেদান দীপকে ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে  নৌকা এবং ঢাকা থেকে সরাসরি বিমানে জাকার্তায়  নেমে চলে যাচ্ছে সোরাবাইয়া, বালি, বাতাম এবং মেদানে। ইন্দোনেশিয়ার মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার পর তাদের জড়ো করা হয় ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায়। সুযোগ বুঝে পাচারের অপেক্ষায় থাকা হয় দীর্ঘদিন। অনেককেই  খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করতে হয়। একাধিক সূত্র বলছে, অতি সম্প্রতি মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় মেরিন ফোর্স অনেক বাড়ানো হয়েছে। ফলত দুই শতাধিক বাংলাদেশি আটক হয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার মেদানে। গত দুই সপ্তাহে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় ইন্দোনেশিয়া থেকে ১৫০ জন বাংলাদেশিকে তাদের নিজ খরচে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ না হওয়ার কারণে পৃথিবীর এমন কোনো জেলখানা নেই যেখানে বাংলাদেশিরা নেই। এ পর্যন্ত মানব পাচারের ৫৭১৬ মামলা হয়েছে। বেশির ভাগ মামলাই এখনো পর্যন্ত ঝুলে আছে। আলাদা ট্রাইব্যুনাল হওয়ার কথা থাকলেও এর কোনো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। মোদ্দাকথা, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় সিন্ডিকেটগুলো এখনো সক্রিয়। কিছুদিন পর পরই তারা রুট বদলাচ্ছে।

পুলিশ ও র‌্যাব সদর দফতর বলছে, ২০১৮ সালে ২১২ জন পুরুষ, ২১০ জন মহিলা এবং ৮০টি শিশু পাচারের শিকার হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে ১৩৪ জন পুরুষ, ১৬০ জন নারী এবং ৬২ জন শিশু। মামলার সংখ্যা ৫৬১টি। গ্রেফতার হয়েছে ১৩১০ জন। এর মধ্যে ২০১৮ সালে র‌্যাব ১৫টি অভিযান চালিয়ে ২৩ জন আসামি গ্রেফতার করে। উদ্ধার করেছে ২০ জন ভিকটিমকে। মামলা হয়েছে ১৩টি। ২০১৭ সালে ৩৮টি অভিযান চালিয়ে র‌্যাব ১২৯ জন আসামি গ্রেফতার ও ৮৮ জন ভিকটিমকে উদ্ধার করে। এসব ঘটনায় মামলার সংখ্যা ১০৩টি। ২০১৬ সালে র‌্যাবের মামলার সংখ্যা ৫৬টি ও ২০১৫ সালে মামলার সংখ্যা ৪৯টি।


আপনার মন্তব্য