Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২২:৫৭

দিল্লির চিঠি

পরাজিতদের বিস্ময়কর শক্তি

এম জে আকবর

পরাজিতদের বিস্ময়কর শক্তি

ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার আগ্রহ পোষণ সৃজনশীলতার উৎস হয়ে ওঠে। পরিণতিতে অপ্রতিরোধ্য হয়ে যায় কল্পকথা বলার বাসনা। এভাবেই মূর্ত হয়েছে মহান শেকসপিয়রের মঞ্চ নাটক আর সাড়া জাগানো সিনেমার বর্ণিল পরিবেশনা। এ প্রক্রিয়ায় অবশ্য বর্তমানের আয়নায় অতীত ইতিহাসের প্রতিফলন তেমন ঘটে না। সর্বকালের সুপারহিট, ১৯৬০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মোগল-ই-আজম’ ছবির কথা বলা যায়। কতকাল আগে তৈরি, তবু এখনো ছবিটি মানুষকে টানে। মুগ্ধকর গান, চমৎকার অভিনয় দিলীপ কুমার, মধুবালা আর পৃথ্বিরাজ কাপুরের। শিল্পীদের উচ্চারিত প্রতিটি সংলাপ হৃদয়ছোঁয়া। মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে বিনিয়োগকারীরা এ ছবির প্রতিপাদ্যকে শতাধিক অভিনেতা-অভিনেত্রীকে দিয়ে গীতিনাট্যের আকারে উপস্থাপন করছেন। আনারকলি নামে সত্যিই কোনো নর্তকী ছিল কি ছিল না, মোগল সামাজ্যের উত্তরাধিকারী শাহজাদা সেলিম ওই নারীর সৌন্দর্যে মজেছিলেন কী মজেননি, তাতে কী আসে যায়! নির্ভেজাল প্রেমের ডানায় উড়তে উড়তে তার ভারত সম্রাজ্ঞী হওয়ার যে আকাক্সক্ষা তা তো মার্কসীয় ব্যাঞ্জনায় চমৎকার এক কাহিনী। প্রেমিকার তরে পিতার বিরুদ্ধে সেলিমের যুদ্ধ সম্পর্কিত তথ্যটি যে অসত্য, সেই সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন ঐতিহাসিক আবুল ফজল। পুরোটাই যদি নর্তকীর পরাজয়ের ঘটনা, তাহলে লাহোরে কীভাবে গড়ে ওঠে ‘আনারকলি’ নামের অভিজাত বিপণি কেন্দ্র! ঐতিহাসিক কল্পকাহিনী কিংবা কল্প কাহিনীভিত্তিক ইতিহাসের পুনর্জন্ম ইদানীং শুরু হয়েছে টিভি সিরিয়াল ‘সোর্ড অব টিপু সুলতান’ দিয়ে। ১৯৯০-১৯৯১ সালে ‘দূরদর্শন’-এর রমরমা দিনে ৬০ পর্বে প্রচারিত দারুণ সাড়া জাগায়। তখন দূরদর্শন ছিল একমাত্র বিনোদনদাতা। মামুলি বিষয় পরিবেশনার ভিড়ে মাঝে মাঝে সে ভালো জিনিস প্রচার করত। ‘প্রদর্শিত বিষয় ও কাহিনীর সঙ্গে বাস্তবের সম্পর্ক নেই’- এরকম সংবিধি দেখিয়ে টিপু কাহিনী কখনই দেখানো হয়নি। কল্পনাকে বাস্তব বলে বিক্রি করা হয়েছিল। প্রযোজক ও প্রধান অভিনেতা সঞ্জয় খান নাটকটির কাহিনী নিয়েছিলেন ভগবান গিদওয়ানি রচিত বই ‘টিপু সুলতান’ থেকে। টিপুর তলোয়ারের যে দুটি ধার (একদিকে খ্যাতি, অন্যদিকে দুর্ভাগ্য) সেটা সঞ্জয় খান উপলব্ধি করেননি। ১৭৯৯ সালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াইয়ে পরাজয় মূল তলোয়ারকে ঢেকে দিয়েছিল। এই তলোয়ার এবং টিপুর প্রিয় খেলনা যান্ত্রিক একটি বাঘ (দেখা যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক সিপাহিকে খেয়ে ফেলছে) শেষতক নিয়ে যাওয়া হয় লন্ডনে। ব্রিটিশের বিজয় স্মারক হিসেবে এ দুটি বস্তু স্কুলশিশুদের দেখানো হয়। সর্বশেষ খবর : মদ প্রস্তুত কারখানার ধনাঢ্য এক মালিক লন্ডনে এই তলোয়ার কিনে নিয়েছেন তার ‘দেশকে আমি কত ভালোবাসি’ প্রমাণের মতলবে। তখন তিনি রাজ্যসভার একটি আসনে জয়ের জন্য সচেষ্ট ছিলেন। ওই প্রার্থিতার পর থেকে কেন জানি দ্রুত তার ধনসম্পদ দ্রুতগতিতে কমছে। আমরা এমন যুগে বাস করছি যে যুগে অসঙ্গতি ধারণ-পোষণ খুবই স্বাভাবিক বিষয়। টিপু সুলতান একালে তার ভক্তদের কাছে গুণের মহাআকর। আমি জেনেবুঝেই ‘ভক্তদের’ শব্দটি ব্যবহার করলাম। বছর কয়েক আগে কর্নাটকের এক রাজনীতিকের মুখে টিপু সুলতানকে ‘হযরত’ বলতে শুনে স্তম্ভিত হয়েছিলাম। টিপুর কবর দর্শনে আমি কখনো যাইনি বটে। তবে সেখানে যদি অলৌকিক শক্তির সাধক পুরুষ হিসেবে টিপুর অনুসারীরা জজবায় লিপ্ত হতে থাকেন, তাতে বিস্মিত হব না। টিপু উচ্চমানের সুলতান (শাসক) হতেই পারেন, যিনি কৌশলগত কিছু ভুলের খেসারত দিয়েছেন। কিন্তু বুজুর্গ? না, তা তিনি ছিলেন না। সত্যকথা বলতে কী, এই রাজনীতিক টিপুর ঐশ্বরিক বিভার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন না। তার আগ্রহ ভোট বাগানোয়। কর্নাটকের বেশ কিছু মুসলিম মহলে আজকাল টিপু সুলতানের নামের আগে ‘হজরত’ উচ্চারণ সওয়াবের কাজ বলে গণ্য হচ্ছে। অনেকে তাকে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ‘প্রথম মুক্তিযোদ্ধা’ বলে আখ্যায়িত করেন। এটা এক ধরনের মূর্খামি। প্রশংসাধ্বনি করার জন্য ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়াটা যদি কৃতিত্ব, তবে সেটা প্রাপ্য নবাব সিরাজুদ্দৌলার। টিপুর প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে ১৭৫৭ সালে পলাশী প্রান্তরে সিরাজ পরাজিত হন। ১৭৬৪ সালে দ্বিতীয় শাহ আলম, বাংলার মীর কাসেম ও অযোধ্যার সুজাউদ্দৌলা জোটবদ্ধ হয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাহিনীর মোকাবিলা করেন। মেজর হেক্টর মুনরো ছিলেন ব্রিটিশ সেনাপতি। যুদ্ধ হয় বকসার নামক স্থানে। পলাশীর যুদ্ধে জিতেছিলেন বলে ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশ সূচনার সব কৃতিত্ব দেওয়া হয় রবার্ট ক্লাইভকে। অথচ সত্য হলো, বকসারের পতনই সাম্রাজ্য গড়ার সুযোগ এনে দিয়েছিল ব্রিটিশের হাতে। আমাদের গণতন্ত্রে চাতুরি হচ্ছে ওপর থেকে ভোটারদের ওপর মায়াবর্ষণ করা। কিন্তু উচিত হলো, চিন্তাকে উৎসাহিত করবে গণতন্ত্র আর চিন্তা জাগিয়ে তুলবে প্রশ্ন। টিপু হয়ে উঠছেন বুজুর্গ পুরুষ, আর তার পিতা হায়দার আলীর স্মৃতি কর্ণাটকের মুসলিম মানস থেকে কার্যত মুছে যাচ্ছে। কেন? ১৭৬৬ থেকে ১৭৬৯ সাল পর্যন্ত প্রথম ইঙ্গ-মহীশুর যুদ্ধে হায়দার আলী ব্রিটিশ সেনাদের দাবড়িয়ে তাদের ছাউনিতে ফিরে যেতে বাধ্য করেন। ১৭৮০ থেকে ১৭৮৪ পর্যন্ত হওয়া দ্বিতীয় যুদ্ধে টিপু জিতেছিলেন তার পিতার হাতে তৈরি সুশৃঙ্খল সেনাদল ব্যবহার করেই। তৃতীয় ও চতুর্থ যুদ্ধে ঘটে টিপুর শোচনীয় পরাজয়।

কৌশলগত কিছু ভ্রান্ত পদক্ষেপ নিয়ে এবং অবাস্তব আশা পোষণ করে নিজের সম্ভাবনার বিনাশ ঘটান টিপু। ফরাসিরা তার পক্ষে সর্বব্যাপী হস্তক্ষেপ করবেই, এমন আশা ছিল টিপুর। ফ্রান্সে তখন বিপ্লবের ঘনঘটা, ওদের মহামতি সেনাধ্যক্ষ নেপোলিয়নের চোখ তখন মিসরের দিকে। মিসর হয়ে ওসমানীয় সাম্রাজ্যে আঘাত হানার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। ফরাসিদের দৃষ্টিতে ভারতের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপ। হায়দার আলীকে নিচে নামিয়ে টিপুকে কেন উঁচুতে তোলে কর্ণাটকের মুসলিম মহল? এর কারণ, সংখ্যালঘুর হীনমন্যতা। ব্রিটিশ-প্ররোচিত মুসলিম রাজনীতি ওই মানসিকতা তৈরি করেছিল ধীরগতিতে। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর, ভোট-ব্যাংক মজবুতকরণ প্রক্রিয়া মুসলিম মানসকে সাফল্য অর্জনে উতলা করে। ব্যাপারটা আগেও ছিল। সর্বশেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহীরা “শাসক” বানিয়েছিল। অভ্যুত্থান এগিয়ে নেওয়ার নায়ক করেছিল তাকে। মিথ্যা আরামবোধের চেষ্টা আর কি। আমি অবশ্য জাফরকে টিপুর সমতুল্য করছি না। টিপু সুলতান অবশ্যই যোদ্ধা ছিলেন। প্রশ্ন হলো, পরাজিত এই সুলতানকে বুজুর্গ বানানোর চেষ্টা মুসলিমসত্তা বিকাশের সহায়ক হবে? একটা সুসংবাদ দিয়ে শেষ করছি। কর্ণাটক ও ভারতের একবিংশ শতকের সন্তানরা তাদের আত্মচেতনা, তাদের লক্ষ্যাভিসার ও আস্থার ক্ষেত্রে ভিন্ন সত্তা হয়ে উঠছে। কেবলমাত্র এই শতকের দ্বিতীয় শতকে পা-রাখা এই ছেলেমেয়েরা জানে, অতীতের হাতে নয়, তাদের নিয়তি ভবিষ্যতের হাতে।


আপনার মন্তব্য