Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২৩:২৩

রাষ্ট্র এভাবে ঘুমিয়ে থাকতে পারে না

পীর হাবিবুর রহমান

রাষ্ট্র এভাবে ঘুমিয়ে থাকতে পারে না

বসন্তের উৎসবের আনন্দ, কোকিলের প্রাণ আকুল করা ডাক এখনো শেষ হয়নি। ভালোবাসা দিবসের রঙিন আনন্দ মুছে যায়নি। মহান একুশের রাতে শহীদ মিনারে মানুষের শ্রদ্ধাঞ্জলির চিহ্ন শেষ হয়নি। কিন্তু একুশের প্রথম প্রহর শেষ হতে না হতেই সবকিছু শোকের কফিনে ঢেকে দিয়ে দেশবাসীর জন্য রাতটি অভিশপ্ত হয়ে যায়। সকালের আলো ফুটে ওঠার আগেই দেশের মানুষের মন বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। শোকস্তব্ধ নগরীর সকালটি ছিল যেন অন্ধকার। সেই নিমতলীর দুঃস্বপ্ন মুছে যেতে না যেতেই চকবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাে  এখন পর্যন্ত ৮১ জনের জীবন পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। বাতাসে আবার মানুষ পোড়ার গন্ধ। স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে ঢাকা মেডিকেল মর্গে গিয়ে পুড়ে যাওয়া প্রিয় মানুষকে চেনার ক্ষমতা কারও নেই।

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার কারণে এ যেন দুর্ঘটনা নয়, এক নারকীয় হত্যাকা । নিমতলী থেকে চকবাজার যেন হয়ে উঠেছে অভিশপ্ত শ্মশানঘাট। যেখানে মানুষ অসহায়ের মতো ধর্মবর্ণনির্বিশেষে চিতার আগুনে পুড়ে সহমরণে যাবে। জীবনের চেয়ে সম্পদ-অর্থ কখনই বড় হতে পারে না। তবু দুর্ঘটনার মরণফাঁদ পাতা নিমতলীর আগুনে পুড়ে ১১৭ জনের ভয়াবহ প্রাণহানির ঘটনা থেকেও আমরা কোনো শিক্ষা নিইনি। নিমতলীর ঘটনায় একটি বিয়েবাড়ির ভবনের চুলা থেকে ছড়িয়ে পড়া আগুন নিচের কেমিক্যাল গোডাউনে দাউ দাউ করে ছড়িয়ে ছিল। সেই ভবন থেকেই বিয়েবাড়িতে জড়ো হওয়া পরিবারের ৪৮ জনের বীভৎস প্রাণহানি ঘটেছিল বাতাসে মানুষ পোড়ার গন্ধ ছড়িয়ে। বরের সঙ্গে আসা ১৪ জন যাত্রীর শরীরও পুড়ে কয়লায় রূপ নিয়েছিল। সেই মৃত্যুযন্ত্রণার বীভৎস দৃশ্য গোটা দেশকে ঝাঁকুনি দিয়েছিল।

এ ঘটনার আগে সেখানে ১২ বার আগুন লেগেছে। ঘিঞ্জি গলির মধ্যে বসতি ও কেমিক্যাল গোডাউন ঘিরে যে বাণিজ্য তা করুণ মৃত্যুফাঁদে পরিণত করেছিল। নিমতলীর দুই বোনসহ তিনটি মেয়েকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কন্যার স্নেহ দিয়ে বিয়ে দিয়েছিলেন। তাদের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু সেদিন রাষ্ট্র মানুষের জীবন বাঁচাতে পারেনি। তখনো তদন্ত কমিটি হয়েছে। উচ্চ আদালদের নির্দেশনা এসেছে। ফায়ার সার্ভিসের সুপারিশ এসেছে। কথা ছিল সব কেমিক্যাল গোডাউন সরিয়ে নেওয়ার। উচ্ছেদ অভিযানও শুরু হয়েছিল। কিন্তু রহস্যজনকভাবে তা থেমে যায়। আত্মবিস্মৃত জাতি আবার যার যার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেছে। যাদের জীবন সেদিন চিতার আগুনের মতো পুড়ে কয়লা হয়েছে তাদের স্বজনরাই কেবল মনে রেখেছেন- কী হারিয়েছেন। আমরা ঘটনার সঙ্গে প্রতিবাদী হই। শোকস্তব্ধ হই। তারপর বেমালুম সয়ে যাই। স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি ফাঁদ পেতে রাখা দুর্ঘটনার ভয়ঙ্কর আগুনের লেলিহান শিখা নিভিয়েই দেয় না, স্বজনদের জন্য লাশের চিহ্নটুকুও রাখে না। নিমতলীর সর্বগ্রাসী আগুনে ১১৭ জনের মর্মান্তিক হত্যাকাে র পর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল তা কেন থেমে গেল? রাষ্ট্র এভাবে অগ্নিকাে  একের পর এক পোড়া লাশের মিছিল, মানুষের আর্তনাদ, হাহাকার শুনেও ঘুমিয়ে থাকতে পারে না। জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ী সমাজের নেতাসহ প্রশাসনের দায়িত্বশীলরা একের পর এক লাশের মিছিলের দায় এড়াতে পারেন না। চুপচাপ দায়িত্বহীনের মতো বসে থাকতে পারেন না। অথচ রাষ্ট্র যেমন ঘুমিয়ে আছে, দায়িত্বশীলরা তেমনই বসে আছেন। নিমতলীর ঘটনায় কেমিক্যালের গোডাউনে আগুন যাওয়ার পর তা আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ছড়িয়েছিল। সেখান থেকে পদক্ষেপ গ্রহণে সফল হলে একুশের রাতে চকবাজারের এমন দাউ দাউ আগুনের মুখে এত মানুষের পুড়ে মরার মর্মান্তিক দৃশ্য ও নির্মমতা দেখতে হতো না। চকবাজারের ঘিঞ্জি গলির রাস্তা একটার সঙ্গে আরেকটা লেপ্টালেপ্টি করে তৈরি ভবন সেখানেও বসতি আর ব্যবসা একসঙ্গেই চলছিল। চুড়িহাট্টার শাহি মসজিদ বা পাঁচরাস্তার মোড়ে পিকআপ ভ্যানের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে সেখানকার বৈদ্যুতিক ছোট্ট ট্রান্সফরমারের বিস্ফোরণ ঘটায়। আর সেখান থেকেই পাশের ভবনের এসিতে আগুন ধরে চারদিক দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। সাতটি ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়লেও চারটি ভবনের পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। ১৪টি গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে সে আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যাওয়ার জায়গা নেই। তবু তারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন। পানি নেই। নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কারাগারের পুকুর থেকে পানি টেনে আগুন নেভানোর লড়াই করেছেন। বিমানবাহিনী ও পুলিশ পানি নিয়ে গেছে। হেলিকপ্টারে পানি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা হয়েছে। সেখানেও প্লাস্টিকের কাঁচামাল আগুনের তেজ বাড়িয়েছে। সেখানেও গোডাউন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্ঘুম রাত কাটিয়ে উদ্ধারকাজ তদারকি করলেও এত মানুষের জীবন রক্ষা করা যায়নি। দুই বছর আগে যে রিফাত স্বপ্ন নিয়ে ঘর বেঁধেছিলেন। অন্তঃসত্ত্বা বউটি আর বেরোতে পারছেন না। তাই ফেলে দিয়ে নিজেও পালাননি। দাউ দাউ আগুনে সহমরণেই গেছেন। নিমতলীর ঘটনা ঘটেছিল ২০১০ সালের ৩ জুন রাতে। আর চকবাজারের ভয়াবহতা দেশ দেখেছে ২০১৯ সালের একুশের রাতে। গোটা ঢাকা শহর এখন বোমার মধ্যে বাস করছে। যানজটে অচল নগরীর প্রায় সব পরিবহনেই সিএনজিচালিত গ্যাস ব্যবহৃত হচ্ছে। সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এটিও বন্ধ করে দেওয়া যায় কিনা। একই সঙ্গে পুরান ঢাকাকে পরিকল্পিতভাবে প্রশস্ত রাস্তাঘাটে নতুন করে কীভাবে ঢেলে সাজানো যায়, আর সেখান থেকে কেমিক্যালসহ প্লাস্টিকের কাঁচামাল বা যেসব জিনিস আগুন কাছে পেলে দাউ দাউ করে জ্বলে সেসব দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার কঠোর বাস্তবায়ন। একুশের রাতে শুধু প্রধানমন্ত্রীই নন, আমার মতো অসহায় সাধারণ মানুষও চরম অস্থিরতা নিয়ে, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে, বুকের ভিতর চাপা কান্না নিয়ে রাত জেগেছেন। আগুনে পোড়া এই লাশের মিছিল গোটা দেশকে শোকার্ত করেছে। জীবনের চেয়ে মূল্যবান কিছু মানুষের নেই। বেঁচে থাকার চেয়ে আনন্দের কিছু নেই। তাই মানুষের জীবন নিরাপদ রাখতে এই মৃত্যু উপত্যকার মুখে রাষ্ট্র ঘুমিয়ে থাকতে পারে না। ব্যবসায়ী নেতারা, জনপ্রতিনিধিরা এবং দায়িত্বশীল প্রশাসনকে বোবার ভূমিকায় বাংলাদেশ দেখতে চায় না। এমন আগুনের দাবানলে মানুষ পুড়ে কয়লা হওয়ার দৃশ্য দেশ দেখতে চায় না।


আপনার মন্তব্য