Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২৩:২৪

মুহূর্তে ভবনটি হয়ে ওঠে মৃত্যুপুরী

মাহবুব মমতাজী

মুহূর্তে ভবনটি হয়ে ওঠে মৃত্যুপুরী

পুরান ঢাকার চকবাজার। মুঘল আমল থেকেই কোলাহলপূর্ণ এলাকাটি। এখানকার ব্যস্ততম তিন সড়ক- নন্দ কুমার দত্ত, হায়দার বক্স আর উর্দু রোড। আবাসিক-বাণিজ্যিক সব মিলে ভরপুর থাকে সড়কগুলো। মেয়েদের ব্যাগ, জামা-কাপড়ের নানা ডিজাইন ও কারচুপির কাজের সরঞ্জামের পাইকারি দোকানগুলোও এখানে। দিনের মতো রাতের কিছু সময় পর্যন্ত যানবাহনের ভিড় লেগেই থাকে। অন্যদিনের মতো এ রাতেও চাপ পরোটা আর শর্মা খেতে ভিড় জমে রাজমহল হোটেলে। এশার নামাজ শেষে বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিতে রহমতগঞ্জ যাচ্ছিলেন ৬৫ বছরের জয়নাল আবেদীন। দোকান বন্ধ শেষে বাবা আর চাচার সঙ্গে মায়ের কোলে ফেরা হয়নি ৩ বছরের শিশু আরাফাতের। বাকিটা ইতিহাস। ট্র্যাজেডি। ওদের জীবন ঘড়ির কাঁটার রাত ১১টা পর্যন্ত আর গড়ায়নি। এরপর আশপাশের লোকারণ্য ভবনগুলো ৪ ঘণ্টায় মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়ে যায়। ঘটনাস্থল চকবাজার চুরিহাট্টা জামে মসজিদ মোড়। যেন চোখের পলকে ঝড়ে যায় তরতাজা অনেক মানুষের প্রাণ। বুধবার রাতের আগুনে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় ৬৭টি পোড়া লাশ। নিখোঁজ আরও অনেকে। এদের লাশ স্বজনদের কেউ পেয়েছেন, কেউ খুঁজছেন, কেউ অপেক্ষায় আঙ্গার লাশ শনাক্তে। আবার কাঁদতে কাঁদতে কারও কারও চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। পুরান ঢাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাে  এমন হাজারো স্বজনের বিলাপ আর কান্নায় গতকাল ভারি হয়ে যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) মর্গ। নিমতলীর পর প্রায় ১০ বছরের মাথায় আরেকটি ট্র্যাজেডির জন্ম হলো এখানে। এবারের চুরিহাট্টা ট্র্যাজেডিতেও দেখতে হলো মানুষের মৃত্যু মিছিল। আগুনের ভয়াবহতার কথা ফের মনে করিয়ে দিল পুরান ঢাকাবাসীকে। তাদের প্রশ্ন- আর কত লাশ দেখতে হবে তাদের? তবুও কি দাহ্য ও কেমিক্যাল গোডাউন অপসারণে কর্তৃপক্ষের ঘুম ভাঙবে না?

পুড়ে যাওয়া ওয়াহিদ ম্যানসনের তিনতলার একটি ঘরে গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, একপাশে সোফা। শৌখিন কাভারে ঢাকা ছিল বুধবারও। আরামদায়ক করতে কুশনও ছিল কয়েকটা। এখন সব পুড়ে ছাই। রয়ে গেছে কেবল কাঠামোর কিছু অংশ। আরেক পাশে রাখা ডাইনিং টেবিল। পুড়ে কয়লা হওয়া টেবিল দেখলে মনে হবে কেউ খেতে বসেছিল হয়তো। এখনো প্লেট সাজানো, তবে কয়লা হয়ে গেছে সেটাও। দেয়াল থেকে খসে পড়েছে টাইলস। মুখ হা করে বেরিয়ে এসেছে ভিতরের কনক্রিট। দেয়াল ভেঙে পড়েছে বিভিন্ন দিকের। ভবনের কয়েকটি রান্নাঘরের হাঁড়ি চুলাতেই ছিল তখনও। রান্নাঘরের মেঝেতে টিফিনবাটিসহ ক্যারিয়ার, ছড়ানো-ছিটানো সংসার। সব সরিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা খুঁটিয়ে দেখেন চারপাশ। পাশে রাজমহল হোটেলের তন্তু রুটির চুলা, কড়াই, পরোটার খামির। সবই আছে যার যার পাত্রে। নেই কারিগর। হোটেল কাঠামো ঠিক থাকলেও পুড়ে যায় সাইনবোর্ড ও সামনের অংশ। খাবার টেবিল ও ক্যাশ কাউন্টারগুলো সুনসান নীরবে পড়ে ছিল। কেউ নেই। কোলাহলের স্থানটিতে মুহূর্তেই বিধ্বস্তের ছাপ।

১৪ নম্বর নন্দকুমার দত্ত রোডে আসিকিনি স্কোয়ার মার্কেটের সামনে কথা হয় নাসরিন আক্তারের সঙ্গে। শোকে কাতর নাসরিন মা শিরিন আক্তারকে নিয়ে রাত থেকে করছেন ছোটাছুটি। যাচ্ছেন ঢামেক বার্ন ইউনিটে, কখনো জরুরি বিভাগে, কোথাও বাবা জয়নালের সন্ধান না পেয়ে সারা রাত খুঁজেছেন স্যার সলিমুল্লাহ মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজে। সকালে ফিরে আসেন ঢামেক মর্গে। সেখানেও অসংখ্য মানুষের ভিড়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসেন চকে। এখানে অপলক দৃষ্টিতে ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে। বাবার ছবি হাতে নিয়ে অন্তত বাবার লাশটি ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা তার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, তার বাবা রাতে এশার নামাজ পড়েছেন। নামাজ শেষে কোরআন তেলওয়াত করেন। এরপর তার এক বন্ধুর সঙ্গে রহমতগঞ্জে চা খাওয়ার কথা বলে আজগর লেনের বাসা থেকে বের হন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে বাসা থেকে বিকট আওয়াজ শুনতে পান। এ ঘটনার পর থেকে তার বাবার কোনো সন্ধান পাননি তারা। একই সময়ে মিডওয়ে সিকিউরিটিজ ভবনের পাশে থাকা কাপড়ের দোকান বন্ধ করে রহমতগঞ্জের বাসায় ফিরছিলেন ৩২ বছর বয়সী মোহাম্মদ আলী। সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই অপু, দিপু ও ৩ বছরের শিশু সন্তান আরাফাত।

পথে যখন তারা চুরিহাট্টা মসজিদের কাছে তখন পরিচিত একজনের ফোন পেয়ে দিপু পেছনের দিকে ফিরে যান। ফিরে আসার মিনিট তিনেক পর বিকট শব্দে বিস্ফোরণ শুনতে পায় দিপু। দিপু জানান, ততক্ষণে আগুনের লেলিহানে সব শেষ হয়ে যায়। স্বামী আর সন্তানকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে আছেন ৭ মাসের গর্ভবতী ভাবী ইতি। দুপুরে ঢামেক মর্গে দেখা যায় দুই ভাই আর ভাইয়ের ছেলের মৃত্যুর শোকে বার বার মূর্ছা যান মর্জিনা বেগম।


আপনার মন্তব্য