Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ মার্চ, ২০১৯ ২২:২৯

একান্ত আলাপচারিতায় প্রণব মুখার্জি

হাসিনা ও রেহানা আমার পরিবারের সদস্য

সেপ্টেম্বরে ঢাকা এলে হাওরে যাব

নঈম নিজাম, দিল্লি থেকে ফিরে

হাসিনা ও রেহানা আমার পরিবারের সদস্য

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বলেছেন, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা আমার পরিবারের সদস্য। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের নিষ্ঠুর রাজনীতির পর আমাদের বন্ধনটা সেভাবে তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনার সন্তানদের এখানকার  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সময় স্থানীয় গার্ডিয়ান ছিলেন আমার স্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশে গেলে সবসময় জামাই আদরটাই পাই। বাংলাদেশের মানুষের আমার জন্য এই ভালোবাসা সবসময় দেখেছি। তিনি বলেন, আগামী সেপ্টেম্বরে আবার বাংলাদেশে যাব। এবার গেলে সিলেট যাব হাওর দেখতে।

গত ৭ মার্চ সন্ধ্যায় দিল্লিতে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দীর্ঘসময় কথা হয়। প্রণব মুখার্জির সঙ্গে এই  আলাপচারিতায় ছিল তাঁর আবার বাংলাদেশে আসা, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেক কিছুই। যতবারই তাঁর সঙ্গে বসেছিলাম তিনি কথা বলেন মন খুলে। তাঁর মধ্যে রয়েছে মানুষকে আপন করে নেওয়ার জাদুকরী এক ক্ষমতা। প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। আগামীকাল ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। আগামী বছর বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। আলাপে আড্ডায় মুক্তিযুদ্ধ আর বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই তিনি বেশি কথা বলেন। 

রাজাজি রোডের এই বাড়িতে এর আগেও এসেছিলাম। তখন মাত্র রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে তিনি সবেমাত্র এই বাড়িতে উঠেছিলেন।  রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে বের হওয়ার ৭ দিন পর আমাকে দেখে বলেছিলেন, বাড়িটি এখনো গোছগাছ  করা হয়নি। তার মাঝে উঠে পড়া। এই বাড়িতে এর আগে রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ার পর থাকতেন এপিজি আবদুল কালাম। হাঁটাহাঁটি করা যাবে। সবচেয়ে বড় বিষয়, পড়ালেখা করে সময় কাটাব। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে গ্রেটার কৈলাশ এলাকায় প্রণব মুখার্জির বাড়িতেও গিয়েছিলাম। এরপর রাষ্ট্রপতি ভবনেও যাওয়া হয় কয়েকবার। শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি সময় দিয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে অসাধারণ এক মানুষ। কোনো অহংকার নেই। সবসময় হাসিখুশি। প্রচুর বই পড়েন। লেখালেখিও করেন। সবচেয়ে বড় বিষয়, বাংলাদেশের জন্য রয়েছে তাঁর অপরিসীম দরদ। সবসময় মঙ্গল চান বাংলাদেশের। এবারও আলাপচারিতার শুরুতে শরীর কেমন জানতে চাই। তিনি বললেন, ভালো আছি। এরপর বললেন, আত্মজীবনীর নতুন অধ্যায় নিয়ে ব্যস্ত। আমি আলাপচারিতা শুরুই করেছিলাম, নতুন বইতে কী কী থাকছে? জবাবে তিনি বলেন, নতুন বইতে থাকবে রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়ের বিভিন্ন ঘটনাবলির আরও বিস্তারিত। আমার কাছে জানতে চান, বাংলাদেশের খোঁজখবর। আমি বললাম, বাংলাদেশের মানুষ আপনাকে ভালোবাসে। এই ভালোবাসা দুভাবে আপনি পেয়েছেন, এক. বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের নড়াইলের জামাই হিসেবে। মানুষ মনে করে আমাদের মেয়ের জামাই ভারতের রাজনীতিজুড়ে সুবিশাল অবস্থানে। তিনি হাসলেন। বললেন, আসলে ঠিকই বলেছ। বাংলাদেশে গেলে জামাই আদরটাই পাই। সর্বশেষ যখন আমার স্ত্রীকে নিয়ে নড়াইল গিয়েছিলাম মানুষের উচ্ছ্বাস দেখেছি।

আবার কখন যাবেন বাংলাদেশে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগামী সেপ্টেম্বর মাসে যাওয়ার পরিকল্পনা করছি। এখন পর্যন্ত সেভাবে সবকিছু ঠিকঠাক আছে। তবে এবার আর ঢাকায় বসে থাকব না।

- কোথায় যাবেন?

- ঢাকার কাজগুলো শেষ করে সিলেট যাব হাওর দেখতে। হাওরের গল্প সুরঞ্জিত সবসময় করত। আমাকে নেওয়ার জন্য অনেকবার আমন্ত্রণও জানিয়েছিল। সুরঞ্জিতের আমন্ত্রণ রক্ষা হয়নি। ও চলে গেল। হাওর সম্পর্কে শুনেছি, জানি।

হাওর নিয়ে আমার অভিজ্ঞতার কথা বললাম। সেপ্টেম্বর মাসের দিকে অতিথি পাখি আসে। শুরু হয় মাছ ধরার উৎসব। অসাধারণ। আর সিলেটের টি গার্ডেনেরও সুনাম রয়েছে। প্রণব মুখার্জি বললেন, অতিথি পাখির কথাও শুনেছি। মাছ পাওয়া যায়, জানি। সিলেটের চা বাগানের কথাও জানি। ঢাকায় কী অনুষ্ঠানে যাবেন? বললেন, আমন্ত্রণ আছে বেশ কয়েকটি। এখনো কোনোটাই চূড়ান্ত করিনি। সব কিছু ঠিকঠাক হতে সময় লাগবে আরও। বাংলাদেশ আমাকে টানে।

- আপনি বাংলাদেশে প্রথম কখন আসেন? জবাবে প্রণব মুখার্জি বললেন, ১৯৮০ সালের আগে বাংলাদেশে আসেননি। এবার আমি জানতে চাই অফিসিয়াল ট্যুর ছিল কি? জবাবে বললেন, হ্যাঁ, ওটাই আমার অফিসিয়াল ট্যুর ছিল। ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে আমরা ক্ষমতায় আসলাম। বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলাম ১৪ জানুয়ারি। ২৮ জানুয়ারি দিল্লিতে আন্তর্জাতিক এক সম্মেলন ছিল। ১২৭টি দেশ এতে অংশ নেয়। তার মাঝে ৮১টি দেশের হেড অব দ্য গভর্নমেন্ট ও হেড অব দ্য স্টেট উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ থেকে যোগ দেন জিয়াউর রহমান। এই কনফারেন্সে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে পরিচয় হয়। এরপর ঢাকা যাওয়ার আমন্ত্রণ পাই। আমি ঢাকায় যাই প্রথমবারের মতো। এরপর অনেকবার ঢাকা গেছি। শেখ হাসিনা প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর কমনওয়েলথ কনফারেন্স হয় ঢাকায়। কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট তিনজন রিসোর্স পারসনকে পাঠায় এই সম্মেলনে। আমি ছাড়া বাকি দুজন হলেন- একজন কানাডিয়ান এমপি, আরেকজন অস্ট্রেলিয়ান এমপি। শেখ হাসিনা যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সেই অনুষ্ঠানে।

- আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা তো পারিবারিক ও ব্যক্তিগত?

- অবশ্যই। শুরু থেকেই তারা আমাদের পরিবারের সদস্য, ওয়াজেদ সাহেব, রেহানা, হাসিনা সবাই। হাসিনার ছেলেমেয়ে এখানে ভর্তির সময় আমার স্ত্রী ছিলেন গার্ডিয়ান। আমার স্ত্রী তাদের দুই বোনকে অনেক পছন্দ করতেন। পারিবারিক সম্পর্কটা এখনো আছে। ওরা দুজনই অসাধারণ।

এরপর কথা হয় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। সেই অংশটুকু প্রকাশিত হবে আগামীকাল বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে। অন্যান্য প্রাসঙ্গিক গল্প উঠে আসে। এবার জানতে চাই, নতুন বই লেখার কাজ কি চলছে?

জবাবে তিনি বললেন, হুম কাজ করছি।

- এবারের বইতে কী রাখবেন?

- এবার থাকবে লাস্ট ইয়ার অব মাই প্রেসিডেন্সি। আগের ধারাবাহিকতা থাকবে। আমি শুরু করছি ১৯৬৯ সাল দিয়ে, যখন আমি পার্লামেন্টে প্রথম নির্বাচিত হই, আর শেষ ২০১৭ সালে। এই ৪৮ বছর চারটি ভাগে ভাগ করা। এর আগে তিনটি হয়ে গেছে। চতুর্থ শেষ ২০১৭ সাল পর্যন্ত। এখানে ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের অংশগুলো থাকবে।

- বাংলাদেশের বিষয়ে থাকবে তো?

- তা তো থাকবেই। রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমার প্রথম সফর বাংলাদেশ।

- আগের বইতে অনেক কিছু ছিল।

- আমি শুরু করেছি বাংলাদেশ দিয়ে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা, প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের প্রথম প্রেস কনফারেন্স, মুজিব নগরে করা সবকিছুই আছে। বাংলাদেশের সঙ্গে আমার সম্পর্কের বন্ধন ১৯৭১ সাল থেকেই সুগভীর।


আপনার মন্তব্য