Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২২:০০
শারদীয় আনন্দে...
শারদীয় আনন্দে...
পোশাক : রঙ বাংলাদেশ মডেল : মিষ্টি মারিয়া ও এমিল চৌধুরী, মেকওভার : ওমেন্স ওয়ার্ল্ড আলোকচিত্রী : মহসিন আব্বাস

আকাশের বুকে মুঠো মুঠো নীলের ছড়াছড়ি। সাদা মেঘের চিবুক ছুঁয়ে চলছে হাসি-আনন্দের নিরন্তর খেলা।

ঠিক তখনই প্রকৃতিতে শরতের আশীর্বাদী আমেজ। কাশফুলে একই আনন্দের রেশ। রক্তলাল জবা, শিউলি, মালতী কুয়াশার প্রথম শিশিরে স্নান সেরে তৈরি হচ্ছে অন্নপূর্ণা দেবী দুর্গা পূজার আসর সাজাতে। দেবী দুর্গাকে স্বাগত জানাতে শুধু প্রকৃতি সাজলেই চলবে না, তরুণ-তরুণীদের সাজপোশাক হওয়া চাই মনের মতো। আনন্দকে আরও আন্দোলিত করতেই যেন সব প্রস্তুতি। আরও জানাচ্ছেন— তানিয়া তুষ্টি

 

নারীতে শাড়িতে পূজা

সারদ ছোঁয়াই দুর্গাদেবীর আরাধনা। পূজার এই আনন্দের বন্যা এক নাগাড়ে চলতে থাকবে টানা পাঁচদিন। ষষ্ঠী থেকে শুরু করে দশমীর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে উৎসব। তবে নিজেদের তারুণ্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটে সাজসজ্জা দিয়ে। এ সময় মেয়েদের সাজে থাকা চাই বিশেষ বৈশিষ্ট্য। বাঙালিয়ানা সে সাজে বরাবরই প্রাধান্য পেয়েছে রাবীন্দ্রিক আবহ। কারণ, সাহিত্যের সঙ্গে কবিগুরুর পারিবারিক জীবনাচরণ বাঙালির সাজ পোশাকের জন্য হয়েছে অনুকরণীয়। তাই সনাতন ধর্মাবলম্বী বাঙালি মেয়ের কাছে যেন শাড়িই প্রথম পছন্দ। এ যেন নারীতে শাড়িতেই পূর্ণ পূজার আয়োজন। সৌন্দর্য সচেতন মেয়েরা এমন ভাবনায় পিছিয়ে নয় কখনো। তাই আসুন দেখে নেওয়া যাক এবারের পূজায় কোন দিন কী শাড়ি পরলে বেশি মানানসই লাগতে পারে।

 

ষষ্ঠীতে সুতিই ভালো

অঙ্গে প্রিন্টের সুতির শাড়ি জড়িয়ে দেওয়া হয় ঘটপূজা। শাড়িতে থাকতে পারে নানা নকশা। ভিন্নতা আনতে শাড়ির আঁচল ও কুচিতে থাকতে পারে একই ডিজাইন। জমিনের ডিজাইন হতে পারে একেবারেই সাদামাঠা। বিশেষ করে তাঁতের নানা ধরনের শাড়িতেই পেয়ে যাবেন মনের মতো ডিজাইন। বর্তমানে মেয়েদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে ফুলেল মোটিফ। এ ছাড়া প্রিন্ট, জ্যামিতিক নকশা, জামদানি প্রিন্ট ও স্ট্রাইপ। এবারের পূজার সুতির শাড়িতে শেডের ব্যবহারও বেশ চোখে পড়ছে। শাড়ির উপরে ও নিচে একই রঙের দুটি আলাদা শেড থাকতে পারে। প্রিন্টের শাড়িতে একটু জমকালোভাব আনতে চাইলে বেছে নিতে পারেন সুতার নকশা করা পাড়ের শাড়ি। ভিন্নতা চাইলে নিতে পারেন বাটিকের শাড়ি। একরঙা পাড় বা পাড় ছাড়া ভেজিটেবল ডাইয়ের বাটিক শাড়ি এ দিনে বেশ মানাবে। পাঁচশ’ থেকে এক হাজার দুইশত টাকার মধ্যেই পেয়ে যাবেন ষষ্ঠীর সুতি শাড়ি।

 

সপ্তমীতে হোক চওড়া পাড়ের শাড়ি

এই দিনে বেছে নিতে পারেন চওড়া পাড়ের একরঙা শাড়ি। শুধু পাড়-আঁচলেই নানান এক্সপেরিমেন্টে ভরা কাতান, সিল্ক, অ্যান্ডি, তসর, মসলিন কিংবা কোটার শাড়ি হতে পারে আপনার বাছাই করা শাড়ির একটি। এসব শাড়িতে নিজস্ব পাড় তো থাকছেই, কিছু শাড়িতে আবার লেসের ব্যবহারেও বাড়তি সৌন্দর্য যোগ করেছে। সিল্ক, তসর বা মসলিন শাড়িতে প্যাচওয়ার্ক বেশ চোখে পড়ে। পাড়ে সুতার কাজ ছাড়াও এমব্রয়ডারি, স্ক্রিন প্রিন্টের সঙ্গে হাতের কাজ, জরি, পুঁতি বা চুমকির কাজও রয়েছে। কোটার শাড়িতে আলগা পাড় বসিয়েও ডিজাইন হচ্ছে আজকাল। এ ধরনের পাড়ের শাড়িতে চওড়া লেসের ব্যবহার বেশ চোখে পড়ে। ডিজাইনে খানিকটা নতুনত্ব আনতে কিছু শাড়ির পাড়ে পছন্দসই পাইপিন ও আলাদাভাবে তৈরি অন্য রঙের পাড়ও বসানো হয়েছে। সপ্তমীর জন্য উজ্জ্বল যে কোনো একরঙা পাড়ের শাড়ি বেছে নিতে পারেন। উৎসবের আমেজ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে আপনার সাজ প্রস্তুতিও জমবে দারুণ। ডিজাইনভেদে এ ধরনের শাড়ির দাম পড়বে সাড়ে তিন হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।

 

অষ্টমীতে হারিয়ে যাব লাল-সাদাতে

পছন্দের বাছ-বিচারে রক্ষণশীলদের ধারণামতে, দুর্গাপূজার আসল সাজ লাল-সাদাতে আবদ্ধ। তাদের কাছে এটি ছাড়া সাজ পূর্ণই হয় না। অষ্টমীর দিন থাকে আবার কুমারী পূজা। তাই এই দিনে আপনিও হারাতে পারেন

লাল-সাদায়। শুধু পাড়েই নয়, আঁচলেও থাকবে লালের ছোঁয়া। বেছে নিতে পারেন জামদানি, সিল্ক বা গরদ শাড়ি। এসব শাড়িতে পাড় আর আঁচলটাই বেশি গুরুত্ব পাবে। জমিনে থাকতে পারে হালকা কাজ। গরদের শাড়িতে তেমন কোনো ডিজাইন হয় না। কাপড়টাই প্রধান আকর্ষণ। তবে সিল্কের শাড়িতে বেশ ডিজাইন-বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। পিওর ও অ্যান্ডি সিল্কের সাদা-লাল শাড়িতে থাকছে অ্যামব্রয়ডারি, ছোট বিটস, চুমকি ও অ্যাপ্লিকের কাজ। কটন ও হাফসিল্ক দুই ধরনের জামদানিই এখন বেশ চলছে। বেছে নিতে পারেন লাল-সাদা জামদানি। শাড়ি ও ডিজাইনভেদে অষ্টমীর শাড়ির জন্য আপনাকে খরচ করতে হবে ৫০০ থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

 

নবমীতে একটু ভারী শাড়ি

নবমীতে পূজা দেখা, বেড়ানো আর দাওয়াত, সবকিছুতেই জামদানি বা টাঙ্গাইল শাড়ি তুলনাহীন। জামদানি শাড়িতে  সোনালি বা রুপালি জরি সুতার কাজ আপনাকে দেবে গর্জিয়াস লুক। গতানুগতিক কটন জামদানির পাশাপাশি সিনথেটিক জামদানিও এখন বেশ চলছে। কিছু জামদানি শাড়ির পাড়ে এবার কোনো কাজ থাকছে না। বৈচিত্র্য আনতে শাড়ির পাড়ে  টেম্পলের কাজও করা হয়েছে। সূক্ষ্ম সুতার কাজ আর বাহারি ডিজাইনের টাঙ্গাইল শাড়ি আপনি অনায়াসে বেছে নিতে পারেন নবমীতে। টাঙ্গাইলের বিভিন্ন ডিজাইনের শাড়ির মধ্যে রয়েছে সুতি বালুচুরি, জুট সিল্ক, সুতি জামদানি, রেশম স্ট্রাইপ, টিস্যু জুট সিল্ক, সিল্ক কাঁথাস্টিচ, সফট সিল্কসহ বাহারি শাড়ি। কাজ ও মানভেদে জামদানির দাম পড়বে ৪ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা। আর টাঙ্গাইল শাড়ি ১ হাজার থেকে ১৮ হাজার ৫০০ টাকা।

 

দশমী হওয়া চাই জমকালো

পূজার শেষ দিনে গর্জিয়াস লুক তো চাই-ই। সেদিকে লক্ষ্য  রেখে বাজারে এসেছে চমৎকার নকশা করা শাড়ি। কোনোটিতে শুধু পাড় জুড়ে দিয়ে আবার কোনোটিতে পাড়ের সঙ্গে অ্যামব্রয়ডারি, সিকোয়েন্স, পুঁতি বা কারচুপির কাজ করা হয়েছে। জমকালো ভাব আনতে কিছু শাড়িতে ব্যবহার হয়েছে অ্যান্টিক ও জুয়েলারি স্টোন। শাড়িজুড়ে কারচুপি আর সিকোয়েন্সের কাজের সঙ্গে জুয়েলারি স্টোনের ব্যবহার শাড়িকে করেছে দারুণভাবে রাতের উৎসবে পরার উপযোগী। এ ছাড়া  বেছে নিতে পারেন ক্রেপ বা নেটের শাড়ি। দশমীর মূল আনুষ্ঠানিকতা রাতে। তাই বেছে নিন গাঢ় কোনো রং। তবে রং নির্বাচনের সময় অবশ্যই গায়ের রঙের বিষয়টি মাথায় রাখবেন। নকশাভেদে এ ধরনের শাড়ির দাম পড়বে ৬ হাজার  থেকে ২৫ হাজার টাকা। পূজার সাজে যে শাড়িই পরুন না কেন, গহনা বা সাজের দিকটা খুব খেয়াল রাখতে হবে। তবেই আপনার আসল সৌন্দর্য আর রুচির মসৃণ পরিচয় ফুটে উঠবে।

 

পূজায় পুরুষের সাজ

অন্নপূর্ণা দেবী মা দুর্গার আগমনে সবার মনেই বইছে আনন্দের  ঢেউ। প্রতি বছরের মতো এবারও আসছে শান্তির দূত হয়ে। এমন উৎসবের দিনে নিজেকে রঙিন সাজে উপস্থাপন করতে ব্যস্ত সবাই। সাজগোজের দিক থেকে মেয়েরা এগিয়ে থাকলেও  ছেলেদের আয়োজনের শেষ নেই। পূজায় এখনো পাঞ্জাবি আর ধুতির আবেদনটাই সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস তাই  ছেলেদের জন্য নিয়ে এসেছে বিভিন্ন স্টাইলের পাঞ্জাবি। তবে পাঞ্জাবির ক্ষেত্রে সাদা রংই তরুণদের বেশি পছন্দের। ধর্মীয় শুদ্ধতা নিজের এমন সাজের ভিতর দিয়ে প্রকাশ ঘটে সহজে। নিজের দৃষ্টির শান্তি ও মনকে প্রফুল্ল করে দেয়। অন্যান্য সময় হাল ফ্যাশনের ছোঁয়া থাকলেও অঞ্জলি দেওয়া বা মণ্ডপে ঘোরার সময় পাঞ্জাবি, ধুতির রাবীন্দ্রিক সাজ থাকা চাই। হালকা শীতের আবেশ ছড়ানো সন্ধ্যার সাজে সুতি বা সিল্কের পাঞ্জাবি বেশ মানাবে। অল্প কিছু অ্যামব্রয়ডারি কাজ থেকে শুরু করে এসব পাঞ্জাবি সেজেছে জরি, পুঁতি, লেস, জার্সির কাজে। পাঞ্জাবির সঙ্গে গলায় শোভা পেতে পারে মানানসই লাল বা সোনালি  দোপাট্টা। সাজগোজে প্রফুল্ল মন যদি সঙ্গে বিশেষ কোনো সঙ্গ পায় তবে দেবীময় সন্ধ্যা আরও তাত্পর্যপূর্ণ হয়।

পূজার বাজারে ছেলেদের যুগোপযোগী ধুতি আর পাঞ্জাবি পেয়ে যাবেন খুব সহজেই। পাঞ্জাবিতে রয়েছে কাপড়, কাট আর ডিজাইনের ভিন্নতা। সাদা বা অফহোয়াইটের ধুতিতেও পাবেন নানা ঢঙের আবির্ভাব। নিজেকে একটু ট্রেন্ডি আর ফ্যাশনসচেতন ভাবতে কার না ভালো লাগে। তাই নিজের  চেহারা আর রুচিকে প্রাধান্য দিতে বেছে নিতে পারেন পছন্দের  পোশাকটি।

পূজার পাঁচ দিনজুড়ে একই সাজ একঘেয়েমি এনে দিতে পারে। একটু ভিন্নতা আনতে আজকাল শার্ট, টি-শার্টের কদর বাড়ছে। সন্ধ্যার পর মণ্ডপে ঘোরা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডাবাজিতে এ ধরনের পোশাক বেশ আরামদায়ক। টি-শার্টের ক্ষেত্রেও পূজা উপলক্ষে বেশ নতুনত্ব নিয়ে এসেছেন ফ্যাশন হাউসগুলো। এখান থেকে পছন্দের পোশাকটি বেছে নিতে পারবেন সহজেই। এ ছাড়াও গুলিস্তান, পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার, ইসলামপুর ও বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসে পেয়ে যাবেন খদ্দরের   থেকে শুরু করে সিল্কের ধুতি-পাঞ্জাবি। তাই এবারের পূজায়  ছেলেদের পোশাক কেনার আগে অবশ্যই ভেবে নিন কোন ধরনের পোশাক আপনার সঙ্গে মানাবে। তারপর ঘটিয়ে ফেলুন সাধ আর সাধ্যের সমন্বয়।

পূজার আগে সাজের প্রস্তুতি

সব সাজের মূল ভিত্তি হয়ে থাকবে আপনার নিজস্ব সৌন্দর্য। চুল, ত্বক, হাত-পায়ে থাকা চাই উপযোগী সাজ। পূজার বাকি মাত্র কটা দিন। তাই এখন থেকেই শুরু হোক নিজের পরিচর্যা।

ঠিক এই সময়টাতে সৌন্দর্যসচেতন মেয়েরা তাদের চুলের যত্নটি সেরে নিতে পারেন। দিতে পারেন পছন্দের কোনো কাট, সঙ্গে নিউট্রিশন ট্রিটমেন্টটা করিয়ে নিলে চুল হবে ঝলমলে আর আকর্ষণীয়। যারা নিয়মিত ত্বকের যত্ন নেন তাদের কথা আলাদা। কিন্তু যাদের দুয়েক মাসেও পার্লারে একবার যাওয়া হয় না তারা অবশ্যই ফেসিয়ালটা করে নিন। পার্লারে ফেসিয়াল করলেও বাসায় এসে প্রতিদিনই ত্বকের পুষ্টি জোগাতে নানা ধরনের ফ্রুট মাস্ক বা হারবাল উপটান ব্যবহার করুন। এতে ত্বকের জেল্লা ধরে রাখে। তবে অবশ্যই ত্বক উপযোগী ক্রিম ব্যবহার করাটা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শীত আর গরমের টানাটানিতে আপনার ত্বকই পড়েছে টানাপড়েনে। এ সময় ত্বকের দরকার সঠিক আর্দ্রতা বজায় রাখা। হাত-পায়ের যত্নে  পেডিকিউর মেনিকিউরটা বাসায় নিজে নিজেও করতে পারেন। রূপসচেতনতায় ছেলেরাও বা পিছিয়ে থাকবে কেন? সচেতন  ছেলেরা তাদের ত্বকের যত্নে নিয়মিত ফেসিয়াল করতে ভুলে যান না। তবে নিতান্তই যারা এ ব্যাপারে উদাসীন, তারাও চায় উৎসবের এই দিনে নিজেকে একটু সুন্দর দেখাক। তাই আর দেরি না করে ফেসিয়ালটা সেরে নিতে পারেন। সারাদিন বাইরে বাইরে ঘুরতে ত্বকে মেখে নিন সানস্ক্রিন। চুলের কাটটা এবার পূজায় হোক না একটু আলাদা। ঠিকমতো শ্যাম্পু আর কন্ডিশনিংটা করিয়ে নিলে ঝলকানি দেবে আপনার চুলও। শুধু ত্বক চুল নয়, হাত-পায়েরও থাকা চাই যত্ন। রুচিশীল ব্যক্তিত্ব প্রকাশে এগুলোর ভূমিকা অনন্য।

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত
এই পাতার আরো খবর
up-arrow