Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২২:০৩

অনিয়মিত হৃদস্পন্দন

অনিয়মিত হৃদস্পন্দন

হৃৎপিণ্ড এলোমেলোভাবে চলা বা থেমে যাওয়া অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের লক্ষণ। যদিও এটি কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে না, কিন্তু বেশকিছু অনিয়মিত হৃদস্পন্দন মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি করে যা মানুষের মৃত্যুর কারণও হতে পারে।

 

সুস্থ মানুষের হৃৎপিণ্ড স্বাভাবিক অবস্থায় সুন্দর একটি তালে চলে এই তালকে হৃদস্পন্দন বলে। যদি কোনো কারণে এই তালে বেতাল ঘটে বা হৃৎপিণ্ড এলোমেলোভাবে চলে অথবা থেমে থেমে কিংবা খুব দ্রুত বা খুব আস্তে চলে তাকে অনিয়মিত হৃদস্পন্দন বলে। অনেক অনিয়মিত হৃদস্পন্দন কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে না, কিন্তু বেশকিছু অনিয়মিত হৃদস্পন্দন মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি করে যা মানুষের মৃত্যুর কারণও হতে পারে। এক্ষেত্রে হৃৎপিণ্ড শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় রক্ত সঞ্চালনে ব্যর্থ হয়। রক্ত সঞ্চালনের ঘাটতির কারণে মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড নিজে এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নষ্ট হয়ে (মরে) যেতে পারে। হৃৎপিণ্ড একটি বায়োলজিক্যাল পাম্প, যাকে মেকানিক্যাল পাম্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। হৃৎপিণ্ড প্রতিবার সংকোচনের মাধ্যমে রক্তনালীতে রক্ত সঞ্চালন করে। হৃৎপিণ্ডের এই সংকোচনকেই হৃদস্পন্দন বলা হয়। প্রতিবার হৃৎপিণ্ড সংকোচন শুরু করার পূর্বে একটি বৈদ্যুতিক সংকেতের প্রয়োজন হয়। এই বৈদ্যুতিক সংকেত হৃৎপিণ্ডের একটি নির্দিষ্ট অংশ থেকে উৎপত্তি হয়ে থাকে যাকে পেসমেকার (চধপবসধশবৎ)  বলা হয়।

অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের প্রকারভেদ :

মূলত চার ধরনের অনিয়মিত হৃদস্পন্দনই বেশি দেখা যায়-

►  প্রি ম্যাচুর/ড্রপবিট, যা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এই ধরনের অনিয়মিত হৃদস্পন্দনে নাড়িতে হঠাৎ করে একটি বিট মিস হয়ে থাকে, অনেক সময় রোগী নিজেই এটা বুঝতে পারে। এটা প্রায় সময় ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হয় না, তবে যদি খুব বেশি ঘন ঘন হতে থাকে তাহলে এ থেকে বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ হতে পারে, যেমন- দুর্বল লাগা, মাথা ঘুরা, বুক ধড়ফড় করা ইত্যাদি। এতে রোগী উৎকণ্ঠিত এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতে পারে, অনেক সুস্থ সবল মানুষেরও এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। সাধারণভাবে দুশ্চিন্তা, অত্যধিক শারীরিক ও মানসিক চাপ, খুব বেশি কায়িকশ্রম, অতিমাত্রায় চা, কফি ও সিগারেট গ্রহণের জন্য এ ধরনের হৃদস্পন্দন দেখা দেয়।

► SVT (Superaventricular Tachycardia)- এক ধরনের অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, এক্ষেত্রে হঠাৎ হৃৎপিণ্ডের গতি বৃদ্ধি পায় বা হৃৎপিণ্ড খুব দ্রুতগতিতে চলতে থাকে, রোগীর বুক ধড়ফড় করা, মাথাঘোরা, শ্বাসকষ্ট, অস্থিরতা, শরীর ঘেমে যাওয়া, কখনো কখনো বুকের ব্যথা অনুভূত হওয়া, এমন কি খুব মারাত্মক অবস্থায় রোগী অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারে। কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই কিছুক্ষণ পর এসব উপসর্গ দূরীভূত হয়ে যায় এবং রোগী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। কখনো কখনো এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী এবং মারাত্মক হতে পারে তখন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। যাদের এ রোগের প্রবণতা আছে তারা কিছু দিন পর পর এ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। রোগীকে ঠাণ্ডা পানি খাওয়ানো, চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দেওয়া, গলায় আঙ্গুল দিয়ে বমি করার চেষ্টা করা, দম বন্ধ করে প্রস্রাব-পায়খানার মতো জোরে কোথ দেওয়া অনেককে এ ধরনের আক্রমণ থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারে।

► ভ্যানট্রিকোলার অনিয়মিত হৃদস্পন্দন দু-ধরনের হয়ে থাকে। ভ্যানট্রিকোলার টেকিকার্ডিয়া, ভ্যানট্রিকোলার ফিব্রিলেশন মারাত্বক ধরনের অনিয়মিত হৃদস্পন্দন যার ফলে মানুষ প্রায়ই মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। হার্ট এ্যটাক এ ধরনের অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের অন্যতম কারণ। কখনো কখনো খুব বেশি ভয় পাওয়া ইলেকট্রিক শক, হঠাৎ কোনো দুর্যোগে পতিত হওয়ার (ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড, বোমা বিস্ফোরণ দুর্ঘটনা ইত্যাদি) জন্য এ ধরনের অনিয়মিত হৃদস্পন্দন হতে পারে। এসব রোগীর হার্টের সংকোচন-প্রসারণ এত দ্রুত ও এলোমেলো হয় যে হৃৎপিণ্ড রক্ত সঞ্চালন করতে ব্যর্থ হয়। যার ফলে রোগীর খিঁচুনি হতে পারে, রোগী অজ্ঞান হয়ে পড়ে, সঠিক চিকিৎসা না পেলে রোগী অল্প কয়েক মিনিটের মধ্যে মৃত্যুবরণ করে। চিকিৎসা হিসাবে রোগীকে কার্ডিয়াক  মেসেজ বা নিয়মিত বুকে চাপ দেওয়া তার সঙ্গে কৃত্রিম উপায়ে শ্বাস নেওয়ার ব্যবস্থা করা (চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে C.P.R বলা হয়) এবং ইলেকট্রিক শক (ডিফিব্রিলেশন) এর মাধ্যমে চিকিৎসা প্রদান করা হয়। তার সঙ্গে চিকিৎসা হিসাবে ইনজেকশনের মাধ্যমে ওষুধপত্রও ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

► হৃৎপিণ্ডের গতি কমে যাওয়া হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বা নাড়ির গতি প্রতি মিনিটে ৬০ বার এর কমে আসাকে ব্রেডিকার্ডিয়া বলে। হার্ট এ্যাটাকের অন্যতম কারণ। অন্যান্য কারণের মধ্যে বয়োবৃদ্ধিজনিত কারণ, থাইরয়েড গ্লান্ডের সমস্যা, রক্তে লবণের মাত্রা অস্বাভাবিক হওয়া এবং বেশকিছু মেডিসিনের প্রভাবে এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। উপসর্গ হিসাবে খুব দুবর্লতা অনুভব হওয়া, মাথা ঘোরা, মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার উপক্রম, শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং ক্ষেত্রবিশেষে রোগীর খিঁচুনি ও মারাত্মক অবস্থায় রোগী অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে।

 

চিকিৎসা :

কারণ নির্ণয়পূর্বক চিকিৎসা করাই উত্তম। মেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসায় প্রায় ক্ষেত্রেই সুফল পাওয়া যায় তবে ক্ষেত্রবিশেষে পেসমেকার ও ঈজঞ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

লেখক-

ডা. এম. শমশের আলী,

কার্ডিওলজিস্ট,

সিনিয়র কনসালট্যান্ট (প্রা.),

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।


আপনার মন্তব্য