রহস্যময় তাণ্ডবে ওরা কারা|212156|Bangladesh Pratidin
logo
আপডেট : ৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০
রহস্যময় তাণ্ডবে ওরা কারা
দিনভর ভাঙচুর, চিহ্নিত কিছু জঙ্গি ছিল তৎপর
নিজস্ব প্রতিবেদক

রহস্যময় তাণ্ডবে ওরা কারা

তুচ্ছ ঘটনাকে পুঁজি করে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় পরিকল্পিতভাবে নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। পাশাপাশি সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ তাণ্ডব ছড়িয়ে দিয়ে অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরির চেষ্টা করা হয়। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশ—পুসাব নামে একটি ভুঁইফোড় সংগঠনের নাম দিয়ে এ তত্পরতা চালানো হয়। র‌্যাব-পুলিশের চেষ্টায় তাদের এ চক্রান্ত নস্যাৎ হয়। বুধবার রাত থেকে দফায় দফায় জঙ্গি কায়দায় এ তাণ্ডব চলে। গতকাল সকাল থেকেই তারা লাঠিসোঁটা নিয়ে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ব্যাংক, বাণিজ্যিক অফিসসহ বিভিন্ন ভবনে হামলা চালিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করে। ভাঙচুর করে সাধারণ মানুষের গাড়ি। নারকীয় তাণ্ডবে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ আর র‌্যাব তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলে তারাও হামলার শিকার হয়। এ সময় মুখে কাপড় বাঁধা একটি বড় গ্রুপকে ব্যাপক তত্পর দেখা যায়। জঙ্গি উসকানির মতো বক্তৃতা দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত করারও চেষ্টা করে তারা। পুলিশ-র‌্যাব তত্পর না হলে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হতো। নর্থ সাউথের প্রক্টর বেলাল হোসেন বলেন, ‘সব ছেলেমেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর ঢুকিয়ে দিয়েছি। বাইরে যারা আছে তাদের দায়িত্ব নিতে আমরা রাজি না। কোনো মিছিল হবে না। ভিসি স্যার বলেছেন, আগামীকাল সব পরীক্ষা বন্ধ।’ ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, ‘গত রাতে সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখানে হাতাহাতি হয়েছে। একে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে। বসুন্ধরার অফিসসহ বেশকিছু সম্পত্তি বিনষ্ট হয়েছে। এটি একটি আবাসিক এলাকা। এখানে কাউকে অরাজকতা করতে দেওয়া হবে না। আমরা সারা দিন ধৈর্য ধরে তাদের শান্ত করার চেষ্টা করেছি। বিকালে তারা আবার আমাদের ওপর হামলা চালায়। আমরা চাই ছাত্ররা আইন মান্য করে ক্যাম্পাসের মধ্যেই থাকবেন।’ হামলাকারীদের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন আমরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করছি। হামলাকারীদের বিভিন্নভাবে দেখা গেছে। তারা ছাত্র কিনা, কেন হামলা, সব বিষয়ই খতিয়ে দেখা হবে। এখানে আমাদের বিভিন্ন সূত্র আছে। কেউ অপরাধ করলে ছাড় দেওয়া হবে না। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

যেভাবে ঘটনার শুরু : রাজধানীর এক প্রান্তে শান্ত-নিরাপদ সম্ভ্রান্ত বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা। এলাকাবাসীর নিরাপত্তার স্বার্থে রাত ১২টা বাজলেই বসুন্ধরার প্রায় সব প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বুধবার মধ্যরাতের পর বসুন্ধরা এলাকায় অবস্থিত এ্যাপোলো হসপিটালস গেট দিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করলে শাহরিয়ার হাসনাত তপুর সঙ্গে নিরাপত্তায় নিয়োজিত আনসার সদস্যদের বিরোধ বাধে। এই মারামারিতে জড়িয়ে তারা দুজনই আহত হন। পরে হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় দুজনকে। যদিও কারও আঘাতই গুরুতর ছিল না বলে জানিয়েছেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। তপুর বিষয়ে চিকিৎসক ডা. নাজনীন বলেন, ‘অর্গান ড্যামেজ নেই। কোনো ফ্রাকচার নেই। এখন আপাতত যেটা আছে, তা হলো মাসকুলেটাল পেইন।’ প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক সূত্র জানায়, তপু আর আনসার সদস্য যখন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন, তখন হাসপাতালের সামনে জড়ো হওয়া তরুণরা মোবাইল ফোনে বিভিন্ন স্থানে কথা বলতে থাকে। তারা নানা ধরনের গুজব ছড়াতে থাকে ফেসবুকে। এরা গুজব ছড়িয়ে দেয় যে, বসুন্ধরা গ্রুপের নিরাপত্তাকর্মীর রডের আঘাতে আহত হয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যলয়ের ছাত্র তপু মৃত্যুশয্যায়। ওই সময়ই ফেসবুকে পুসাব নামের সংগঠন থেকে শিক্ষার্থীদের একজোট হওয়ার জন্য অনুরোধ জানাতে থাকে। তারা এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে রাস্তায় নামার আহ্বান জানায়। মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে যোগাযোগ করে দলে দলে ঢুকে পড়ে নিরিবিলি এই আবাসিক এলাকায়। মোবাইল ফোন ও ফেসবুকে রাতেই নানাভাবে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা করে শিক্ষার্থীদের। অল্প সময়ের মধ্যেই ছাত্রদের আড়ালে শতাধিক জঙ্গি সমবেত হয়ে হামলা চালায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বিভিন্ন স্থাপনায়। তারা লাঠিসোঁটা, রড, হকিস্টিক নিয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স-টুতে ঢুকে পড়ে। সেখানে এলোপাতাড়ি ভাঙচুর চালায়। সিঁড়ি বেয়ে তারা তিন তলায় উঠে নির্বিচারে ভাঙচুর করে আসবাবপত্র। ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক রিকশাচালক জানান, বয়সে তরুণ এই হামলাকারীরা ব্যাপক ভাঙচুর চালায় বসুন্ধরা এলাকার বিস্তীর্ণ সড়কের ফুটপাথ আর ডিভাইডারে। সংবাদ পেয়ে র‌্যাব ও পুলিশের বিপুলসংখ্যক সদস্য মধ্যরাতেই ঘটনাস্থলে ছুটে যান। চরম ধৈর্যের সঙ্গে তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালান। এক রাউন্ড গুলি বা টিয়ার শেল না ছুড়ে, একবারও লাঠিচার্জ না করে তারা ওই তরুণদের শান্ত করে বাড়ি ফিরে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন। কিন্তু তরুণদের হামলার শিকার হন তারাও। এ সময় সমাবেশে পুলিশ কর্মকর্তা ও নর্থ সাউথের একজন ছাত্র বক্তব্য দেন। পুলিশের সামনে তাদের কর্তব্যকাজের জন্য তারা দুঃখ প্রকাশ করেন। তারা ক্ষমা চান। পুলিশ তাদের আশ্বস্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, জঙ্গি অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী তাদের সঙ্গে যোগ দিলেও রাত ৩টার দিকে তারা বিষয়টা বুঝতে পারেন। রাত সাড়ে ৩টার দিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকেই বাড়ি ফিরতে থাকেন। তবু ফেসবুকে চলতে থাকে অপপ্রচার। রাত ৪টার দিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালায়েন্স নামের ভুঁইফোড় এক সংগঠনের নাম দিয়ে এনএসইউ শিক্ষার্থী তপুর ওপর হামলার অপপ্রচারে চাঙা হয়ে ওঠে তরুণরা। নানা ধরনের উসকানিমূলক প্রোপাগান্ডা চালিয়ে তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সকালে আবারও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সমবেত হওয়ার আহ্বান জানাতে থাকে। ফেসবুকে-মেসেঞ্জারে সকাল অবধি চলে তাদের উসকানিমূলক কার্যক্রম। চেহারা আড়াল করতে কালো কাপড় মুখে বাঁধাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান প্রচার করতে থাকে তারা।

হামলার আগে ও পরে বিভিন্ন সময় সাধারণ ছাত্রদের খেপিয়ে তুলতে ছাত্ররূপী জঙ্গিরা সাধারণ ছাত্রদের জন্য বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে। সমবেত ছাত্রদের উদ্দেশ করে তারা বলতে থাকে, ‘রক্ত কি খেলে না? কতক্ষণ আর আমরা চুপ করে থাকব?’ প্রত্যুত্তরে কয়েকজন বলতে থাকে, ‘অবশ্যই।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত এসব উসকানিমূলক শব্দ ব্যবহার করে থাকে হিযবুত তাহ্রীরের জঙ্গিরা। মধ্যরাতে ভিডিও কনফারেন্সও করে তারা। এরা প্রত্যেকেই উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামার আহ্বান জানায়। এদের একজন শাহজাদা। এই শাহজাদা এর আগে হিযবুত তাহ্রীরের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি ভিডিও লাইভে বলেন, ‘ইনশা আল্লাহ কোনোভাবে ছাড় দেওয়া হবে না। এটা কোন ধরনের বিহ্যাভ, কোন ধরনের আচরণ। আমাদের সবাইকে সকাল ১০টার মধ্যে এনএসইউতে থাকতে হবে। ইনশা আল্লাহ আমরা সবাই ১০টার মধ্যে এনএসইউতে থাকব। আপনারা আপনাদের প্রত্যেক ফ্রেন্ডের সঙ্গে এ বিষয়টা শেয়ার করেন। আমার ভিডিও শেয়ার করার দরকার নাই। ইভেন আইইউবির (ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি) কোনো ছেলেপেলে থাকে, তারাও যেন অংশ নেয়।’ হিযবুতের এই সদস্যের সঙ্গে তার আরও কিছু সঙ্গী উসকানিতে জড়িয়ে পড়ে। উসকানিদাতাদের মধ্যে আরও যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন— আসিফ মাহতাব, হাজ্জাজ আহমেদ অয়ন, ইমরান হোসেন, মো. শহিদ প্রিজনার, শাহজাদা, এস এম রিয়াত শাহরিয়ার অর্ণব ও তুহিন তুষার।

একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা জঙ্গিরা সাধারণ ছাত্রদের অনুভূতিকে পুঁজি করে ভয়ঙ্কর তাণ্ডব চালানোর চেষ্টা করেছিল। এ কারণে আগে থেকেই তারা ফেসবুকের পেজ খুলে ছাত্রদের উত্তেজিত করে হামলার দিকে ঠেলে দিয়েছিল। গত তিন বছরের বিভিন্ন সময় গ্রেফতার দেশের শীর্ষ জঙ্গিদের বেশির ভাগই নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের। বহুল আলোচিত নৃশংস হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলাকারীদেরও অনেকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান ছাত্র। ব্লগার খুনেও রয়েছে তাদের নাম। জঙ্গি তত্পরতার অভিযোগে নর্থ সাউথ থেকে বহিষ্কৃত কিছু সাবেক ছাত্রও মুখোশ পরে এতে অংশ নেয়। গতকাল সকাল ১০টার পর থেকে আবারও সমবেত হতে থাকে ওরা। নেমে পড়ে ভাঙচুরের চেষ্টায়। হামলা চালায় বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের বসুন্ধরা শাখায়। ভাঙচুরের এ চেষ্টায় অবশ্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের তারা সম্পৃক্ত করতে পারেনি। দুপুর ১২টার দিকে দুর্বৃত্তরা ভাঙচুর করে বসুন্ধরা গ্রুপের করপোরেট অফিস। এ সময় খুব তত্পর ছিল পাঁচ-ছয় জন তরুণ, যাদের মুখে বাঁধা ছিল কালো ও কমলা রঙের কাপড় আর রুমাল। নিজেদের নিরাপদ রাখতে তারা পরিচয় গোপন করার এই কৌশল নেয়।

সিসি ক্যামেরায় ধারণকৃত ফুটেজে দেখা যায়, ফেসবুকে আপলোড করা বেশকিছু পোস্ট মুছে ফেলে ওই দুর্বৃত্তরা সেখানেই বলতে থাকে, নিরাপত্তার স্বার্থে এগুলো মুছে ফেলা জরুরি। এত কিছুর পরও থেমে থাকেনি তারা। বিকালে আবারও হামলা চালায় পুলিশের ওপর। প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকে বলছেন, জঙ্গি কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীদের খেপিয়ে তুলতে এই তরুণদের ব্যবহার করা ভাষা আর শব্দ চয়নে স্পষ্ট হয় এদের মতাদর্শ।

বিকাল ৩টার দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা-সংলগ্ন যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক সার্জেন্ট সজীব বলেন, সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা প্রগতি সরণি অবরোধ করে রাখে ছাত্ররা। পরে নর্থ সাউথের প্রক্টর ও পুলিশ এসে ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের এখান থেকে উঠিয়ে দেন। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকার ভিতরে ছাত্ররা তখনো বিক্ষোভ করছিল। দিনভর তাদের তাণ্ডবের সময় পুলিশ-র‌্যাব সতর্ক ছিল। কারণ পুলিশের কাছে খবর ছিল, আন্দোলন সারা ঢাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এ কারণে দিনভর সতর্কতার সঙ্গে তারা সবকিছু সামাল দেন। পুলিশ জানায়, কিছু রহস্যময় চরিত্র ঘটনায় অংশ নেয়। এদের মুখে দাড়ি ছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল অস্থিতিশীলতা তৈরি করা।