Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ২০ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, রবিবার, ২০ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১৭:৫৮ অনলাইন ভার্সন
আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২১:৩৮
রোগী হয়রানি
বাংলাদেশি রোগীর প্রসঙ্গ তুলে হাসপাতালগুলোকে মমতার হুশিয়ারি
দীপক দেবনাথ, কলকাতা:
বাংলাদেশি রোগীর প্রসঙ্গ তুলে হাসপাতালগুলোকে মমতার হুশিয়ারি
ফাইল ছবি

পশ্চিমবঙ্গের বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিং হোমগুলোতে চিকিৎসা করতে আসা সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিত্তবান এমনকি বিদেশি রোগীদেরকেও প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। চিকিৎসায় গাফিলতি, অহেতুক বিল বাড়িয়ে দেখানো, অকারণে ব্যয়বহুল পরীক্ষা, এক ওষুধ বার বার দেওয়া, রোগীর পরিবারকে কেস ডায়েরি বা কেস সামারি না দেওয়া, রুপি পরিশোধ না করলে লাশ আটকে রাখা- এমন একের পর এক অভিযোগ উঠেছে কলকাতা শহরের নামিদামী বেসরকারি হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে।

এবার সেই বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে কড়া বার্তা দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।

বুধবার কলকাতার টাউন হলে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর প্রতিনিধি, রাজ্যের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, প্রধান সচিবসহ অন্যান্য সচিব ও রাজ্য মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখান থেকেই এই কড়া বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর।

এদিন মুখ্যমন্ত্রী বলেন ‘গতকালই আমার সঙ্গে বাংলাদেশের একজনের কথা হচ্ছিল। তার বাবা হাসপাতালে ভর্তি আছেন। আমি বললাম এখন কেমন আছেন? তিনি আমাকে বললেন, এখন তো চিন্তা করছি বিশ লাখ রুপি বিল হয়ে গেছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম আপনার সরকার কি এই বিল মেটাবে? তিনি বললেন না, আমাকে ব্যক্তিগতভাবে মেটাতে হবে। এবার আপনারাই বলুন তিনি এই বিল কোথা থেকে মেটাবেন। মমতা আরও বলেন, ‘উনি আমায় অভিযোগের সুরে বলেছেন যে তাদের কাছ থেকে চিকিৎসা বাবদ এত বেশি চার্জ নেওয়া হচ্ছে, এত চাপ দেওয়া হচ্ছে যে তারা বাংলাদেশের রোগীদের বলে দেবেন তারা যেন এখানে চিকিৎসা করাতে না আসেন’। যাই হোক আমি তাকে আশ্বস্ত করি যে সরকারের তরফে একটা বৈঠক করে এই সমস্যা মেটানোর প্রচেষ্টা করা হবে।
 
উল্লেখ্য, গত প্রায় একমাস ধরে কলকাতার ইএমবাইপাশের ধারে একটি বেসরকারি হাসপাতালে (অ্যাপোলো) ভর্তি রয়েছেন কলকাতাস্থ বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার জকি আহাদের বাবা নূর আল আহাদ। এদিন সেই প্রসঙ্গ তুলে অ্যাপোলো হাসপাতালের নাম নিয়েই মমতা এই বার্তা দেন। তিনি বলেন, আপনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগটা সবচেয়ে বেশি। যদিও অ্যাপোলো হাসপাতালের কর্মকর্তা রানা দাশগুপ্ত সাফাই দিয়েছেন প্রোটোকল মানতে গিয়ে খরচ বেড়েছে।

বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে একহাত নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী এদিন বলেন, ‘আপনাদের মনে রাখতে হবে বাংলাদেশ থেকে অনেক রোগী এখানে চিকিৎসা করাতে আসেন এবং প্রায় প্রতিটি নার্সিং হোমে ভর্তি হন। ঠিক এভাবেই নেপাল, ভুটান, বিহার, ত্রিপুরা, ওড়িষ্যার পাশপাশি রাজ্যের অন্য জায়গা থেকেও রোগীরা আমাদের রাজ্যে চিকিৎসা করাতে আসছেন। তাই আমি হাসপাতালগুলোকে বলবো আপনারা সেবা করুন, সেবা কখনও বিক্রি হয় না। ইঁট-কাঠের ব্যবসা চালানো আর মানুষের জীবন বাঁচানো এক নয়, দুইটির মধ্যে অনেক তফাৎ। একশত শতাংশ লাভ করা যাবে না। একটা হাসপাতালে ভাল ডাক্তার পেলে মানুষ মনে করেন যে তার রোগ অর্ধেক ভালো হয়ে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উঠছে। কোথাও কোথাও রোগীর প্রতি অবহেলা করা হচ্ছে, বেশি চার্জ নেওয়া হয়েছে। এমনকি এও অভিযোগ উঠেছে যে বিল পরিশোধ না করায় রোগীর লাশ আটকে রাখা হচ্ছে। অনেকে ঘটি বাটি বিক্রি করেও সেই লাশ হাতে পান না।

নাম করেই মুখ্যমন্ত্রী এদিন বলেন, এই ধরনের অভিযোগ উঠছে কলকাতার অ্যাপোলো, রুবি, সিএমআরআই সহ কয়েকটি হাসপাতালের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের অনেকেই এই হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে চিকিৎসা বিল বাড়িয়ে দেখানোর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিল বাড়াতে অপ্রয়োজনেও আইসিইউতে ভর্তি করা হচ্ছে। অকারণে ব্যয়বহুল পরীক্ষা করতে বলা হচ্ছে। এক ওষুধ বার বার দেওয়া হচ্ছে। জ্বর, পেট খারপ হলেও একগুচ্ছ টেস্ট করতে বলা হচ্ছে। প্যাকেজের পর প্লাস প্যাকেজ নেওয়া হচ্ছে। এত পরীক্ষা কেন করাতে হবে? চিকিসকদেরও অনেক সময় বাধ্য করা হয় বেশি বিল করতে। এমনকি কেস ডায়েরি দেওয়া হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী একটি তথ্য তুলে ধরে বলেন, ‘৯৪২ টি হাসপাতালে রাজ্য সরকারের তরফে জরিপ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭০টিকে শোকজ করেছে, ৩৩ টির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে’।
মুখ্যমন্ত্রী এদিন বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে সরকার জমি দিলেও রোগীরা তার সুফল পাচ্ছেন না। স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্পের আওতায় আসতে চাইছে না কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল। সুচিকিৎসা পরিসেবা দিতে এই হাসপাতালগুলোতে ই-প্রেসক্রিপশন বাধ্যতামূলক করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ইমাজেন্সির ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া, সাধারণ মানুষের জন্য বাজেট হাসপাতাল তৈরি করা, ন্যায্য মূল্যের দোকান করার কথা বলেন তিনি।

তিনি বলেন, হাসপাতাল ও নার্সিং হোমগুলোকে কড়া নজরদারির মধ্যে রাখতে একজন বিচারপতির নেতৃত্বে ‘হেলথ রেগুলেটরি কমিশন’ গঠন করা হবে। আগামী ৩ মার্চ এই সম্পর্কিত বিল আনা হবে বলেও জানান তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন সমাজের বিশিষ্টরা।
নাম করেই এদিন পিয়ারলেস হাসপাতালের বিরুদ্ধে ভেন্টিলেশনের সমস্যা রয়েছে বলে মানুষের অভিযোগের কথা তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। শিশুপাচার ও কিডনি চক্র চালাতে দেওয়া হবে না বলে মেডিকা হাসপাতালকে কড়া বার্তা দেন মমতা। তবে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফে আশ্বাস দেওয়া হয়।   সিএমআরআই হাসপাতালের তরফে বিল কমানোর ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
এদিন রোগীর পরিজনদেরও বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, চিকিৎসা নিয়ে অনেকের অনেক ক্ষোভ থাকতে পারে, তাই বলে আইনও হাতে নেওয়া উচিত নয়।


বিডি-প্রতিদিন/এস আহমেদ

আপনার মন্তব্য

up-arrow