Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : ১৭ জুলাই, ২০১৭ ১৫:১৫ অনলাইন ভার্সন
আপডেট :
২৫ জুলাই রাইসিনা হিলস ছাড়ছেন প্রণব মুখার্জি
দীপক দেবনাথ, কলকাতা
২৫ জুলাই রাইসিনা হিলস ছাড়ছেন প্রণব মুখার্জি

২০১২ সালের ২৫ জুলাই ভারতের ১৩তম রাষ্ট্রপতি পদে শপথ নিয়েছিলেন প্রণব মুখার্জি। এর পর গত পাঁচ বছর ধরে দেশটির সাংবিধান প্রধান হিসাবে রাইসিনা হিলসে কাটিয়েছেন দেশটির একমাত্র বাঙালি রাষ্ট্রপতি।

রাষ্ট্রপতি হিসাবে প্রণবের পর রাইসিনা হিলসে কে প্রবেশিধাকার পাবেন তা ঠিক করতে সোমবারই নির্বাচন হয়েছে ভারতে। ভোটগণনা আগামী ২০ জুলাই। সংখ্যার হিসাবে ওই পদের দৌড়ে এনডিএ শিবিরের প্রার্থী রামনাথ কোবিন্দ এগিয়ে রয়েছেন বলে খবর।

উজ্জ্বল রাজনৈতিক কর্মজীবনের পর ২০১২ সালে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত প্রগতিশীল জোট (ইউপিএ)। জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চা (এনডিএ) মনোনীত প্রার্থী পূর্ণ অ্যাজিটটক সাংমাকে হারিয়ে রাষ্ট্রপতি হন প্রণব। রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অত্যন্ত ভাল সম্পর্ক ছিল প্রণবের। এই পদে থাকাকালীন দুইটি সরকারের সঙ্গে সম্মানের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। ২০১২ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত কেন্দ্রে ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার। আজীবন জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য থাকলেও রাষ্ট্রপতি হিসাবে নিরপেক্ষভাবেই কংগ্রসের সঙ্গে সদভাব রেখে কাজ করেছিলেন। এরপর ২০১৪ সালের মে মাসে কেন্দ্রে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরও সেই সম্পর্কে চিড় ধরেনি, এনডিএ সরকারের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করে গিয়েছিলেন ভারতীয় রাজনীতির চাণক্য। সাংবিধানিক প্রধান ও প্রশাসনিক প্রধানের মধ্যে যে মতের অমিল হয়নি তা নয়। অতি সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠান থেকে রাষ্ট্রপতি জানান বিভিন্ন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার মধ্যে মতের অমিল থাকলেও সেটা তাদের নিজেদের মধ্যেই রেখেছিলেন, বাইরে প্রকাশ করতে দেননি। আর সেই কারণেই একে অপরের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা বেড়ে গিয়েছিল। সম্পর্কও মজবুত হয়েছিল। রাষ্ট্রপতির প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রীও বলেছিলেন, প্রণব দা সব সময় বাবার মতো তাঁকে খেয়াল রাখতেন।  

তবে মোদি সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করলেও এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে রাষ্ট্রপতি তার নিজস্ব অভিমত প্রকাশ করেননি। দেশজুড়ে অসহিষ্ণুতার পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে জাতীয় ঐক্য ও একতা বজায় রাখার আবেদন জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি হিসাবে তিনটি জিনিস মেনে চলতেন প্রণব-সংবিধান নীতি মেনে চলা, ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বৈচিত্রের গুরুত্ব এবং গণমাধ্যমের মুক্ত স্বাধীনতার গুরুত্বের অনুধাবন করা। নিজের বক্তব্যে বারবারই এই বিষয়গুলো তুলে ধরেছিলেন তিনি। মোদি সরকারের বিরোধিতা করে কংগ্রেসসহ বিরোধীরা যখন প্রতিনিয়ত সংসদের অধিবেশন ভণ্ডুল করে দিচ্ছিল সেসময়ও সংসদে দাঁড়িয়ে বিরোধীদের কাছে সংসদ সচল রাখার কড়া বার্তা দিয়েছিলেন প্রণব।

আসলে প্রণব মুখার্জি বুঝতেন তাকে কখন হস্তক্ষেপ করতে হবে, কখন নয়। নিজের এখতিয়ারের বাইরে না গিয়ে সরকারকেও সতর্ক করেছিলেন একাধিকবার। মোদি সরকারের বিভিন্ন অর্ডিন্যান্স নিয়ে কেন্দ্রকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, সাধারণ মানুষের আস্থা নিয়েই আইন প্রণয়ন করা উচিত। দেশটির ৬৬তম প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে সরকারকে এই বার্তা দেন প্রণব। ১৩০ কোটি মানুষের দেশে ঐক্যের মধ্যে বৈচিত্র্য বজায় রাখার আবেদন জানিয়ে অতি সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, ‘এটা আমাকে মুগ্ধ করে যখন আমি আমার চোখ বন্ধ করি এবং ভাবি যে এক প্রক্রিয়া, এক পতাকা এবং একমাত্র ভারতীয় পরিচয়ের দেশে ১৩০ কোটি মানুষ, ১০০টিরও বেশি ভাষা, ৭টি প্রধান ধর্ম, ৩টি প্রধান জাতিভুক্ত গোষ্ঠী পাশাপাশি সহবস্থান করছে’।

প্রণব মুখার্জি নিজেকে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে তিনি কখনওই ‘রাবার স্ট্যাম্প রাষ্ট্রপতি’ ছিলেন না। নিজের মেয়াদের প্রথম চার বছর ৩৭ জন দোষীর প্রাণভিক্ষা খারিজ করে দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিল মুম্বাই হামলার অন্যতম চক্রী আজমল কাসভ, সংসদ ভবনে হামলার সঙ্গে জড়িত আফজর গুরু এবং ১৯৯৩ সালে মুম্বাইয়ে সিরিয়াল বোমা বিস্ফোরণে দোষী সাব্যস্ত ইয়াকুব মেনন। রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য এই তিনজনকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল, অবশেষে তিনজনেরই ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলতে হয়েছিল।

এদিকে নতুন রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানাতে সাজ সাজ রব রাইসিনা হিলসে। ২৫ জুলাই নতুন রাষ্ট্রপতি শপথ নেবেন। সেই উপলক্ষ্যে সোমবার দিল্লির বিজয়চকে রিহার্সাল দেয় বিশেষ ঘোড়সওয়ার বাহিনী। ওইদিন তার বাড়ি থেকে রাষ্ট্রপতি ভবনের সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়ি বিশেষ সম্মানের সঙ্গে সংসদ ভবনে নিয়ে যাবে। এরপর সংসদের সেন্ট্রাল হলে শপথ নেবেন নতুন রাষ্ট্রপতি তাঁকে শপথ বাক্য পাঠ করাবেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জগদীশ সিং খেহর। এরপর প্রথা মাফিক নিজের উত্তরসূরিকে আসন ছেড়ে দেবেন বিদায় রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। এরপর নতুন রাষ্ট্রপতি রওনা দেবেন রাইসিনা হিলসে, আর সদ্য সাবেক হওয়া রাষ্ট্রপতি রওনা দেবেন দিল্লির ১০ নম্বর বাজাজি মার্গের বাসভবনে। তবে রাষ্ট্রপতিকে যেতে হবে একা। কারণ রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়েই ২০১৫ সালে দীর্ঘদিনের সঙ্গী ও সহধর্মিনী শুভ্রা মুখার্জিকে হারিয়েছেন প্রণব।  

বিডি-প্রতিদিন/১৭ জুলাই, ২০১৭/মাহবুব

আপনার মন্তব্য

up-arrow