Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : ২৩ জুন, ২০১৮ ১৯:০৮ অনলাইন ভার্সন
বেনজির ভুট্টো কেন গোপনে সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন?
অনলাইন ডেস্ক
বেনজির ভুট্টো কেন গোপনে সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন?
bd-pratidin

প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সন্তানের জন্ম দিয়ে বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন। বৃহস্পতিবার ফুটফুটে এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন তিনি। এরপর সদ্যোজাত সন্তানকে কোলে নিয়ে স্বামীর সঙ্গে ছবি পোস্ট দেন ইনস্টাগ্রামে।

তিনি হচ্ছেন দ্বিতীয় সরকার প্রধান যিনি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সন্তানের মা হলেন। এ ঘটনার সাথে সাথে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় আসছেন পাকিস্তানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর নাম, যিনি প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন।

এখানে কিছু কাকতালীয় বিষয় রয়েছে। জাসিন্ডা যেদিন সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, অর্থাৎ ২১ শে জুন বেনজিরেরও জন্মদিন। ৬৫ বছর আগে এ দিনটিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি।

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ৩৭ বছর বয়সে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। বেনজিরও ৩৭ বছর বয়সে অর্থাৎ ১৯৯০ সালে তার কন্যা বখতাওয়ার ভুট্টো জারদারিকে জন্ম দিয়েছিলেন।

বখতাওয়ার বৃহস্পতিবার এক টুইট বার্তায় নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে লিখেছেন, বেনজির ভুট্টো দেখিয়েছিলেন যে আপনি একই সাথে মা হতে পারেন এবং প্রধানমন্ত্রীও থাকতে পারেন।

জাসিন্ডা সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার ছয় মাস আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তিনি সন্তানসম্ভবা। তিনি এরই মধ্যে ছয় সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়েছেন এবং তার সহকারীর কাছে সাময়িক সময়ের জন্য দায়িত্ব হস্তান্তর করেন।

কিন্তু বেনজির তার গর্ভবতী হবার বিষয়টিকে গোপন রেখেছিলেন এবং ডাক্তারের পরামর্শে দ্রুত কাজে ফিরে আসেন। তার সন্তানসম্ভবা হবার বিষয়টি শুধু যে দেশবাসীর কাছে গোপন রাখা হয়েছিল তা নয়, তার মন্ত্রী পরিষদের সদস্যরাও এ বিষয়ে কিছু জানতেন না।

বেনজিরের মন্ত্রী পরিষদের এক সদস্য জাবেদ জব্বার পরবর্তীতে বলেছিলেন, আমাদের মন্ত্রী পরিষদের কোনো সদস্যই জানতেন না যে প্রধানমন্ত্রী সন্তানের জন্ম দিতে যাচ্ছেন। আকস্মিকভাবে আমরা জানতে পারলাম যে তিনি শুধু গণতন্ত্রের জন্ম দেননি, একই সাথে তিনি সন্তানেরও জন্ম দিয়েছেন।

বেনজির সে সময় উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির ভেতরে ছিলেন। যখন বখতাওয়ারের জন্ম হয় সে সময় সেনা-সমর্থিত একটি ডানপন্থী রাজনৈতিক জোট সরকারকে ঘিরে ধরেছিল। তিনি তখন একটি অনাস্থা ভোটে টিকে গিয়েছিলেন। এ অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা (আইএসআই) বেনজিরের দল থেকে অর্থের বিনিময়ে এমপিদের ভাগিয়ে নেবার চেষ্টা করেছিল।

পাকিস্তানে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রেসিডেন্টের যে একক ক্ষমতা ছিল, তা বাতিল করতে সংগ্রাম করছিলেন বেনজির। এই সংগ্রাম মিডনাইট জ্যাকেল নামে পরিচিত। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত সফল হননি।

সে জন্য বেনজির সন্তানসম্ভবা হওয়ার বিষয়টি জনসমক্ষে প্রকাশ করেননি এবং মাতৃত্বকালীন কোনো ছুটিও নেননি। বেনজির তাঁর ব্যক্তিগত গাইনোকলজিস্টকে দিয়ে অস্ত্রোপচার করান এবং সন্তানের জন্মের পর চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে দ্রুত কাজে যোগ দেন।

পরবর্তীতে বেনজির সে সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, পরেরদিন আমি কাজে ফিরেছিলাম। সরকারি কাগজপত্র পড়েছি ও সরকারি ফাইলে স্বাক্ষর করেছি। পরে আমি জানতে পারলাম যে ইতিহাসে আমিই হচ্ছি একমাত্র প্রধানমন্ত্রী যে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সন্তানের জন্ম দিয়েছে। এটি নারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে যে একজন নারী নেতৃত্বের সর্বোচ্চ অবস্থানে থেকে এবং নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সে সন্তানের জন্ম যেমন দিতে পারে তেমনি কাজও করতে পারে।

পাকিস্তানের রাজনীতিতে যত অনিশ্চয়তা এবং বিপদ আছে সেটি নিউজিল্যান্ডের রাজনীতিতে নেই। বখতাওয়ারকে জন্মদানের কয়েকমাস পরে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট গুলাম ইসহাক খান বেনজির ভুট্টোর সরকারকে বরখাস্ত করেছিল। এরপর একটি কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে বেনজির ভুট্টোর প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে।

তৎকালীন বিরোধী নেতা সৈয়দা আবিদা হুসাইন বেনজিরকে ‘লোভী’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, বেনজির দেশের সেবা না করে বরং ‘মাতৃত্ব, পরিবার ও গ্ল্যামারের’ দিকে বেশি মনোযোগী ছিলেন।

বেনজিরের অপর দুই সন্তানের জন্মও একইভাবে গোপনীয়তার ভেতর দিয়ে হয়েছিল। ১৯৮৮ সালে সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং সে বছর নভেম্বর মাসে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে। বেনজির তখন সন্তানসম্ভবা ছিলেন এবং তার গর্ভে তখন ছিল বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি।

একটা কথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত রয়েছে যে গোয়েন্দা রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে জেনারেল জিয়া নভেম্বর মাসের শেষের দিকে নির্বাচন ঘোষণা করেছিলেন। কারণ গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়েছিল, নভেম্বর মাসে বেনজিরের সন্তান জন্মদানের সময় ঘনিয়ে আসবে এবং সেজন্য তিনি ভালোমতো নির্বাচনী প্রচার করতে পারবেন না।

কিন্তু বিলাওয়ালের জন্মের খবর আসে সেপ্টেম্বর মাসে এবং নির্বাচনী প্রচারে তখন সেটি গতির সঞ্চার করে। বলা হয়ে থাকে, বেনজির ইচ্ছাকৃতভাবে সন্তানের জন্মদানের সময় সম্পর্কে ভুল তথ্য প্রচার করেছিলেন। সূত্র: বিবিসি

বিডি প্রতিদিন/২৩ জুন ২০১৮/আরাফাত

আপনার মন্তব্য

এই পাতার আরো খবর
up-arrow