Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২২:৫৯
হজের খুতবায় ধর্মীয় উগ্রতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান
অনলাইন ডেস্ক
হজের খুতবায় ধর্মীয় উগ্রতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান

পারস্পরিক মতপার্থক‌্য ভুলে মুসলিম বিশ্বের নেতাদের এক হওয়ার আহ্বান ধ্বনিত হল এবারের হজে। রবিবার হজের মূল অনুষ্ঠান মক্কার আরাফাতের ময়দানে খুৎবায় ধর্মীয় উগ্রতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

আরাফাত ময়দানে উপস্থিত কয়েক লাখ হাজির উদ্দেশে খুতবা প্রদান শুরু হয় রবিবার স্থানীয় দুপুর সোয়া ১২টায়। এবার নতুন খতিব শেখ আব্দুল রহমান আল-সুদাইস মসজিদে নামিরা থেকে খুতবা ও দোয়া-মুনাজাত পরিচালনা করেন।

সৌদির আরবের সামরিক-বেসামরিক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও আমন্ত্রিত বিশিষ্টজনরা মসজিদে উপস্থিত আছেন। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর খুতবা দিচ্ছেন নতুন খতিব। সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি শায়খ আবদুল আজিজ বিন আবদুল্লাহ আল শায়খ স্বাস্থ্যগত কারণে এবার খুতবা দেওয়া থেকে অবসর নিলে সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মসজিদের ইমাম ও শেখ আব্দুল রহমান আল-সুদাইসকে নতুন খতিব নির্বাচন করা হয়।

হজের খুতবার শুরুতে আল্লাহতায়ালার প্রশংসা, মহানবী (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করে গোটা বিশ্বের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়।

খুতবায় ধর্মীয় উগ্রতা ও উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান নতুন খতিব শেখ আব্দুল রহমান আল-সুদাইস। খুতবায় তিনি বলেন,''মুসলমানরা ভাই-ভাই। আমাদের সেভাবে চলতে হবে। ইসলাম মানবতার ধর্ম, সহানুভূতির ধর্ম। ইসলাম গ্রন্থিত হয়েছে ন্যায় বিচার দ্বারা, সততা দ্বারা ও ভালো ব্যবহার দ্বারা। এটা আমাদের মানতে হবে। আপনারা এটা মানবেন, আপনারা নিরাপদ ভূমিতে যেভাবে চলছেন হজ পরবর্তী জীবনে সেভাবেই চলবেন। ''

খুতবায় আরও বলা হয়, মুসলমানরা এক। একজনের থেকে আরেকজনকে আলাদা করার সুযোগ নেই। পরস্পরের প্রতি দয়া ও ভালবাসা প্রদর্শন করতে হবে। পরস্পরের মঙ্গল কামনা করতে হবে।

নির্যতিত ফিলিস্তিন, ইরাক, ইয়ামেনের মুসলমানদের জন্য দোয়া এবং মুক্তি কামনা করা হয় বয়ানে।

খুতবায় হজ, কুরবানি, হলক, কসর, মিনায় কংকর নিক্ষেপ, তাওয়াফে জিয়ারাতসহ হজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিষয়সহ ইসলামের প্রচার-প্রসার এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায় মুসলিম উম্মাহর আগামী দিনের করণীয় কী হবে, সে বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এরপর সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করা হবে।

গত বছর হজের খুতবায় গ্র্যান্ড মুফতি শায়খ আবদুল আজিজ বিন আবদুল্লাহ আল শায়খ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থান তুলে ধরেছিলেন।

এর আগে রবিবার ভোর থেকেই মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে পাপমুক্তির আকুল বাসনায় লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান সমবেত হন আরাফাতের ময়দানে। ‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্নি’মাতা লাকা ওয়ালমুল্ক, লা শারিকা লাকা’ ধ্বনিতে মুখরিত হয় পবিত্র আরাফাতের ময়দান।

সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করবেন হাজিরা। সৌদি আরবের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আজ হাজিরা দুপুরের পূর্বেই ঐতিহাসিক আরাফার ময়দানে অবস্থান নিতে লাব্বাইক ধ্বনিতে এসে পৌঁছছেন তারা। কেউ পাহাড়ের কাছে, কেউ সুবিধাজনক জায়গায় বসে ইবাদত করছেন।  

আরাফাতের ময়দানে খুতবার পর জোহর ও আসরের নামাজ আদায়, অতঃপর সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে মুজদালিফায় গিয়ে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করবেন তারা। রাতে সেখানে অবস্থান করবেন খোলা মাঠে। সেখান থেকে শয়তানের প্রতিকৃতিতে পাথর নিক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় পাথর সংগ্রহ করবেন হাজিরা।

এবার নজিরবিহীন নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে হজের আনুষ্ঠানিকতা চলছে। মূলত হজের অংশ হিসেবে হজযাত্রীরা ৭ থেকে ১২ জিলহজ মিনা,আরাফাত, মুজদালিফায় অবস্থান করবেন।

এদিকে, মিনায় (জামারাত) শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের সময় যাতে কোনও দুর্ঘটনা না ঘটে, সে জন্য এবার স্বতন্ত্র ব্যবস্থা নিয়েছে সৌদি হজ কর্তৃপক্ষ। হাজিদের ভাগ ভাগ করে জামারাতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে তারা। গত বছর মিনায় পাথর নিক্ষেপের সময় পদদলিত হয়ে বহু হাজির মৃত্যু হয়। সৌদি আরবের তরফ থেকে নিহতের সংখ্যা ৭ শতাধিক দাবি করা হলেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, বিভিন্ন বার্তা সংস্থা এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা দু সহস্রাধিক। ওই দুর্ঘটনার পরই হজে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নেয় সৌদি কর্তৃপক্ষ।

হাজিদের পরিচয় নিশ্চিতের জন্য এবার ইলেকট্রনিক ব্রেসলেটও সরবরাহ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রতিটি ব্রেসলেটে বারকোড রয়েছে এবং এটি অ্যাপসের মাধ্যমে স্মার্টফোনের সঙ্গে সংযুক্ত। এই ব্রেসলেটে হাজিদের ব্যক্তিগত এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য রয়েছে। সরকারি বার্তা সংস্থা সৌদি গেজেট জানিয়েছে, অবৈধ হজযাত্রীদের আটকাতে এক হাজার ২০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে যাতে হাজিদের নিরাপত্তায় দ্রুত তিন হাজার উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র স্থানান্তরে ১৭ হাজার কর্মী মোতায়েন করেছে বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ। হজের পাঁচদিন মক্কা ও পবিত্র স্থানগুলো পরিষ্কারের জন্য ২৬ হাজার কর্মীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হাজিদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য মক্কায় পর্যাপ্ত জনবল, ওষুধ ও যন্ত্রপাতিসহ আটটি হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া মিনা, আরাফাতের ময়দান ও মুজদালিফায় ২৫টি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশসহ ১৫০টিরও বেশি দেশ থেকে এবার ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ হজ পালন করছেন। চলতি বছর মোট এক লাখ এক হাজার চার জন বাংলাদেশি নাগরিক হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব গেছেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পাঁচ হাজার ১৮২ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গেছেন ৯৫ হাজার ৮২২ জন। ভিসাপ্রাপ্তদের মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনার ৪০১ জন বাংলাদেশি হজযাত্রী নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের হজের প্রথম ফ্লাইটটি (বিজি-১০১১) গত ৪ আগস্ট সকাল ৮টা ৫ মিনিটে সৌদি আরবের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে যায়। বিমানের হজ ফ্লাইট শেষ হয়েছে সোমবার। আর সাউদিয়া এয়ারলাইন্সের হজ ফ্লাইট শেষ হয়েছে মঙ্গলবার।


বিডি-প্রতিদিন/এস আহমেদ

আপনার মন্তব্য

সর্বশেষ খবর
up-arrow