Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৯:০৬
সিঙ্গুর থেকে টাটাদের শিল্প গড়ার ডাক মমতার
দীপক দেবনাথ, কলকাতা
সিঙ্গুর থেকে টাটাদের শিল্প গড়ার ডাক মমতার

যে সিঙ্গুর থেকে টাটাদের মুখ ফিরিয়ে নিতে হয়েছিল সেই সিঙ্গুরের মাটিতে দাঁড়িয়েই টাটাদের ফের শিল্প গড়ার বার্তা দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। বুধবার সিঙ্গুরের বিজয় উৎসব থেকে রাজ্যে কারখানা গড়ার জন্য টাটাদের প্রস্তাব দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘১ হাজার একর জমি নিয়ে জেদাজেদি করতে গিয়ে টাটা বাবুরা এখানে কারখনা করতে পারলো না। তবু আমরা বলছি, আমরা ওদের অনেক আমি শিল্পের সঙ্গে কাজ করি...। আপনাদের একমাস সময় দিলাম। আপনারা একটু ভাবুন। একমাসের মধ্যে আপনাদের ১ হাজার একর জমি দেবো। গোয়ালতোড়ে আমাদের ১ হাজার একর জমি আছে। এটা কারও কেড়ে নেওয়া জমি নয়, আমার সরকারের জমি, ল্যান্ড ব্যাঙ্কের জমি। যদি কেউ গাড়ি শিল্প গড়তে চায়- সে টাটাই হোক কিংবা বিএমডব্লিউ হোক বা অন্য কেউ হোক তাদের জন্য জমি রাখা থাকবে। যদি শিল্প করেন দয়া করে শিল্প মন্ত্রী অমিত মিত্র, মুখ্যসচিব বাসুদেব বন্দোপাদ্যায় কিংবা শিল্প সচিব কৃষ্ণ গুপ্তের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। তাতে আমরা খুব খুশি হবো। কিন্তু আমি লোকের জমি জোর করে কেড়ে নেওয়ার পক্ষে নই। আমাদের যে ল্যান্ড ব্যাঙ্কের জমি আছে সেখানে আপনারা শিল্প গড়ুন। গোয়ালতোড়ের পাশাপাশি পানাগড়ে, হাওড়াতে জমি রয়েছে। সেখানেও শিল্প গড়তে পারেন’।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন ‘আমরা কৃষিও চাই, শিল্পও চাই। কৃষি এবং শিল্প দুটোই আমাদের ভাই এবং বোন। কৃষি এবং শিল্প কারোর সঙ্গে কারোর প্রতিযোগিতা নয়, ঝগড়া নয়। কৃষক বাঁচাতে হবে, কৃষি জমি বাঁচাতে হবে, সবুজ বাঁচাতে হবে, নদী বাঁচাতে হবে আবার পুকরও বাঁচাতে হবে। তেমনি শিল্পও গড়তে হবে আমাদের নতুন প্রজন্মকে নিজেদের পায়ে দাঁড় করানোর জন্য। শিল্প আমরা করতে চাই। গত তিন বছর ধরে আমরা আমাদের শিল্প সম্মেলন ও বিশ্ব বাংলা সম্মেলন হচ্ছে। আমরা ল্যান্ড ব্যাঙ্ক তৈরি করেছি। ল্যান্ড ইউস পলিসি তৈরি করেছি, ল্যান্ড ম্যাপ তৈরি করেছি’।  

প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে সিন্দুর আন্দোলন এক উল্লেখযোগ্য বিষয়। ২০০৬ সালে সিঙ্গুরে টাটার ছোট গাড়ি (ন্যানো) কারখানার জন্য ৯৯৭ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার। অধিগ্রহণের বিরোধিতায় সেসময় আন্দোলনের ঝড় তুলেছিল তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। পরে সেই আন্দোলনকে হাতিয়ার করেই রাজ্যের ক্ষমতায় আসেন মমতা। ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসেই সিঙ্গুরের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বিধানসভায় ‘জমি পুনর্বাসন ও উন্নয়ন আইন-২০১১’ পাশ করিয়ে নেয় তৃণমূল সরকার। কিন্তু রাজ্য সরকারের সেই আইনের বিরোধিতা করে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় টাটারা। সিঙ্গল বেঞ্চে টাটাদের হার হলেও ডিভিশন বেঞ্চে জয় হয় তাদের। এর পর ২০০৮ সালে সুপ্রিম কোর্টে যায় রাজ্য সরকার। এরপর দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে সিঙ্গুর জটিলতার অবসান হয় গত ৩১ আগস্ট। শীর্ষ আদালতের তরফে বলা হয়, টাটারা যে জমি অধিগ্রহণ করেছিল তা অবৈধ। আগামী ১২ সপ্তাহের মধ্যে সমস্ত কৃৃষকদের জমি ফেরত দেওয়ারও নির্দেশ দেয় আদালত। এরপরই জমি ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে রাজ্য সরকার।  

সুপ্রিম কোর্টের সেই নির্দেশ মেনেই এদিন থেকেই সিঙ্গুরের ইচ্ছুক ও অনিচ্ছুক কৃষকদের জমি ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এদিন সুদ ছাড়া ৮০৬ টি ক্ষতিপূরণের চেক দেওয়ার পাশাপাশি ইচ্ছুক ও অনিচ্ছুক কৃষক মিলিয়ে মোট ৯১১৭ টি জমির পরচা তুলে দেওয়া হবে। এদিন বিকেলে মুখ্যমন্ত্রীর হাত দিয়েই প্রথম পরচা-ক্ষতিপূরণের চেক বিলি হয়। মঞ্চ থেকে প্রায় ৩০০ টির মতো চেক ও পরচা বিলি করার পর মঞ্চের নিচ থেকে ক্যাম্প অফিস থেকে বাকী চেক ও পরচা বিলি করা হয়। মুখ্যমন্ত্রীর পর এই পরচা-চেক বিলি করেন রাজ্য সরকারের দশ জন মন্ত্রী।  

এপ্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আদালতের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মানবো। এটাই আমরা চেয়েছিলাম। জমি ফেরত দেওয়া হোক। সেই কথা আজ আমরা রাখতে পেরেছি। এটা আজকে বড় জয়। কথা দিয়েছিলাম কথা রেখেছি। এটা মানুষের জয়, এটা মাটির জয় এটা সারা বিশ্বের জমির ইতিহাসে একটা ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত হয়ে থাকবে। এত তাড়াতাড়ি, দুই সপ্তাহের মধ্যে ৮০০ কৃষক পরিবারকে ক্ষতিপূরণের চেক ও তাদের জমির পরচা দেওয়া হচ্ছে’।  

জমি আন্দোলন প্রসঙ্গে মমতা বলেন, ‘সিঙ্গুর না হলে নন্দীগ্রাম হতো না। নন্দীগ্রাম না হলে নেতাই হতো না। ঐতিহাসিক আন্দোলনক কখনও ফিকে হয় না’।  

এদিনের জমির পরচা ও ক্ষতিপূরণের চেক বিলি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নতুন সাজে সেজে উঠেছিল সিঙ্গুর। দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের ধারে ২৮৮০ বর্গফুট এলাকা জুড়ে মূল মঞ্চ এবং ১৩৪৪ বর্গফুট এলাকা জুড়ে কৃষকদের মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। রাজ্যের প্রায় সব মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক, মুখ্যমসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি সহ সরকারি আধিকারিক উপস্থিত ছিলেন এদিনের চেক ও জমির কাগজ বিলি অনুষ্ঠানে। মেধা পাটকর, শিল্পী শুভাপ্রসন্ন সহ যারা সিঙ্গুর আন্দোলনের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত ছিলেন তারাও এদিনের সভায় উপস্থিত ছিলেন। টাটা কারখানার জন্য জমি দেওয়া ইচ্ছুক ও অনিচ্ছুক কৃষকদের পরিবারের সদস্যরাও হাজির ছিলেন এই অনুষ্ঠানে।  

 

বিডি-প্রতিদিন/ ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬/ আফরোজ

আপনার মন্তব্য

সর্বশেষ খবর
up-arrow