Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ৬ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৫ জুন, ২০১৬ ২৩:৫৮
নারায়ণগঞ্জে শিক্ষক লাঞ্ছনা
ধূম্রজাল কাটছে না, নানা প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক ও নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি

নারায়ণগঞ্জে শিক্ষক লাঞ্ছনা ইস্যু নিয়ে ধূম্রজাল তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকৃত ঘটনা উঠে আসেনি বলে অভিযোগ অনেকের। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক সত্যকে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে বলেও মনে করা হচ্ছে। তাদের ধারণা, শিক্ষক লাঞ্ছনার অভিযোগ তুলে ধর্ম অবমাননা ও ছাত্র নির্যাতনের ঘটনাকে আড়াল করা হচ্ছে। এমনকি এ বিষয়ে সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে ঘায়েল করতে একটি মহল তত্পর। ঘটনার পর শিক্ষক শ্যামলকান্তি ভক্ত ‘গণ্ডগোল’ মেটাতে এমপির কাছে এক কোটি টাকা দাবি করেন। সে ফোনালাপের অডিও ক্লিপ রয়েছে এখন অনেকের কাছে। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষক শ্যামলকান্তির আচরণ আগে থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ। অসংযত কথাবার্তার কারণে তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচিত। নারায়ণগঞ্জের অনেকেই বলছে, ধর্ম অবমাননা ও ছাত্র নির্যাতনের বিষয়ে শ্যামলকান্তির বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, সেটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। শুধু সংসদ সদস্যের আচরণ নিয়ে তদন্ত না করে, নিরপেক্ষভাবে ঘটনার আগের ও পরের নানা দিক বিশ্লেষণ করলে প্রকৃত চিত্র বের হবে। এ পর্যন্ত যেসব তথ্য প্রকাশ পেয়েছে এবং তদন্তে গুরুত্ব পেয়েছে তার অনেকটাই ধোঁয়াটে। অনেকেই বলছে, তথ্য- প্রমাণ সংগ্রহ করার পর ভিন্ন স্বার্থে রিপোর্ট পাল্টে ফেলা হয়েছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা যেসব সাক্ষ্য-প্রমাণ নিচ্ছেন, তা তদন্ত প্রতিবেদনে স্থান পাচ্ছে না। শিক্ষক লাঞ্ছনা নিয়ে সমালোচনার মুখে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম সেলিম ওসমান বিব্রত বোধ করছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সংসদ সদস্য হিসেবে একটি অপ্রীতিকর ঘটনা নিষ্পত্তি করতে গিয়ে এখন নিজেই সম্মানহানির শিকার। যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে তাতে অনেক কিছুই স্পষ্ট হয়নি। এ বিষয়ে হাইকোর্ট রুল দিয়েছে এবং তদন্তের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে। তাই এ বিষয়ে আগেই কিছু বলতে চাই না। এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিক্ষক শ্যামলকান্তি ভক্ত বলেন, ‘আমি এমন কোনো অপরাধ করিনি, যার কারণে গায়ে হাত তোলা হবে। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছে। ব্রেইন স্ট্রোকের কারণে এখন অনেক কিছু আমার মনে থাকে না। তবে এটা সত্য, এমপি স্যার আমাকে বাঁচাইছেন, উনি আমাকে অসম্মান করেন নাই। ঘটনার পরেও তার সঙ্গে আমি কথা বলেছি। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছি।’

চাপা পড়ছে ছাত্র নির্যাতন : বন্দরের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র রিফাত হোসেনকে নির্যাতনের বিষয় নিয়েই ঘটনার সূত্রপাত। শিক্ষার্থী রিফাত বলেছে, ‘তিনটা তদন্ত কমিটির লগে কতা কইছি, সবাইরে কইছি কেমনে হেড স্যারে আমারে জামার কলার ধইরা ঘুষাইছে, মাইরা অজ্ঞান করছে, জোর কইরা ট্যাবলেট খাওয়াইছিল, ক্লাসের সবাই আমারে ছুটি দিতে বলছিল, কিন্তু স্যারে আমারে যাইতে দেয় নাই। আবার আমাগো বাসায় গিয়া স্যার টেকাও সাধছে। কিন্তু এসব কথা কেউই প্রকাশ করতাছে না।’ এ ঘটনায় গঠিত প্রথম তদন্ত কমিটির প্রধান উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুরুল আমিন বলেন, ‘আমরা ছেলেটিকে মারধরের প্রমাণ পেয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের ওই কমিটি বাতিল হওয়ায় রিপোর্ট জমা দিতে পারিনি।’ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রধান মাউশির মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর ইউসুফ মিয়া বলেন, ‘ছাত্রকে আঘাত করেছিলেন, এটা ঠিক আছে। তবে আঘাতটা কতটা গুরুতর ছিল সেটা প্রমাণ করা কঠিন। ওই হেডমাস্টার নিজেই আমাদের বলেছেন, ক্লাস কন্ট্রোল করতে যতটুকু দরকার ততটুকুই করেছেন। ঘটনার কিছুটা হলেও ভিত্তি আছে।’

এক কোটি টাকা দাবি : প্রধান শিক্ষক শ্যামলকান্তি ‘গণ্ডগোল’ নিষ্পত্তির জন্য এমপি সেলিম ওসমানের কাছে এক কোটি টাকা দাবি করেছিলেন। গত ২১ মে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে সেলিম ওসমানের প্রেসসচিব বিশ্বজিৎ দাসের কাছে ফোন করে তিনি কথা বলেন। সে কথোপকথনের অডিও রেকর্ড পর্যালোচনা করে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি এমপির কাছে এ টাকা চাইলেও বোঝাতে পারেননি। সে কারণে পরে ফোন করে টাকার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন। ২১ মে সকাল ৮টা ৫৪ মিনিটে শিক্ষক শ্যামলকান্তি ফোন করেন সেলিম ওসমানের প্রেসসচিব বিশ্বজিৎ দাসকে। ফোনালাপে বলতে শোনা যায়, ‘আমি তো ফ্যাসাদ ফোসাদ, গণ্ডগোল-মণ্ডগোল চাই না। উনি তো আমাকে সহানুভূতি জানিয়েছিলেন। আমার তিনটি মেয়ের একটি প্রতিবন্ধী। তিনটি মেয়েই তো বিবাহযোগ্য। আমাদের হিন্দুদের মধ্যে বিয়ে দিতে গেলে তো ত্রিশের (৩০) নিচে হয় না। তো তিন ত্রিশে ৯০ আর ওর চিকিৎসার জন্য ১০। এডা হিসাব কইরা আমি চাচ্ছিলাম। আমি তখন বুঝাইয়া বলতে পারি নাই। এখন স্যারকে যদি বুঝাইয়া বলতে পারেন। আমি খুব নিডি মানুষ, এখন ফয়সালা করে দিতে বলেন একেবারে।’

এর আগে ১৯ মে সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে শিক্ষক শ্যামলকান্তি ভক্ত মোবাইলে ফোন করেন এমপি সেলিম ওসমানকে। স্ত্রী সবিতা রানীসহ তিনি কথা বলেন প্রায় ৩০ মিনিট। তাতে শ্যামলকান্তি ভক্ত বলেন, ‘স্যার, আপনি যাওয়ার পূর্বে আমাকে বেদম মারধর করা হয়। তারা দরজা ধাক্কাধাক্কি করছিল এবং বলছিল, হেডমাস্টারের লাশ চাই, নয়তো পদত্যাগ চাই।’ কথোপকথনের একপর্যায়ে সবিতা রানী বলেন, ‘আমার স্বামী বলেছে, আপনি না আসলে বাঁচত না। আর পাঁচ মিনিট পরে আসলে মারাই যাইত। এই কথাও বলছে। আপনে না থাকলে ওই দিন আরও বেশি সমস্যা হইয়া যাইত।’ সংসদ সদস্যদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এ দম্পতি তাদের নিরাপত্তাসহ দেখে রাখতে অনুরোধ করেন।

তদন্ত রিপোর্ট আড়ালে : শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের (মাউশি) তদন্ত কমিটির মূল ও প্রকৃত রিপোর্ট আড়াল করে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত কমিটির প্রধানের বক্তব্যসহ ভিডিও ও অডিও রেকর্ড প্রতিবেদনের হেফাজতে আছে। তাতে দেখা যায়, তদন্ত কমিটির প্রধান প্রফেসর ইউসুফ মিয়া বলছেন, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ২৬ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বললে ২০ জন শিক্ষার্থী প্রধান শিক্ষকের কটূক্তি শুনেছে বলে জানায়। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে বলা শিক্ষকের উক্তি অন্যরা হট্টগোলের কারণে শুনতে পায়নি বলে জানায়। কিন্তু দাখিল করা তদন্ত রিপোর্টের আলোকে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রধান শিক্ষক শ্যামলকান্তির বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে, সাম্প্রদায়িক বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কায় ধর্ম অবমাননা সংক্রান্ত বিষয়কে সামনে আনা হয়নি। প্রধান শিক্ষককে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া সঠিক ছিল কিনা, তদন্তে সে বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ওদিকে বন্দর উপজেলা কর্মকর্তা (ইউএনও) মৌসুমী হাবীবের নির্দেশে গঠিত প্রথম তদন্ত কমিটির সদস্যরাও শিক্ষার্থী নির্যাতন ও ধর্মসংক্রান্ত কটূক্তির বিষয়ে শিক্ষক শ্যামলকান্তির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য পেয়েছিল। এ কমিটির তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসেনি।

ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ : পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের একটি অভিযোগের তদন্তের পর গত ১১ মে বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে। তাতে মোর্শেদা আক্তার নামের একজন অতিরিক্ত শিক্ষকের কাছ থেকে এমপিওভুক্তির নামে প্রধান শিক্ষক শ্যামলকান্তির এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা গ্রহণের প্রমাণ মিলেছে বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া আরও কয়েকজনকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে তিনি অর্থ নিয়েছেন বলেও জানা গেছে। নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামলকান্তি ভক্তকে ১৩ মে স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের উপস্থিতিতে কান ধরে উঠবোস করানোসহ লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এ বিষয় নিয়ে দেশব্যাপী চাঞ্চল্য ও সমালোচনা তৈরি হয়।

up-arrow