Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ৬ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৬ জুন, ২০১৬ ০৩:৩৮
প্রশ্নবিদ্ধ স্থানীয় নির্বাচন
প্রাণ ঝরল ১৩৩ জনের • পঙ্গুত্ববরণ, গুলিবিদ্ধসহ আহত ১২ হাজার • বিতর্কিত নির্বাচন কমিশন
মাহমুদ আজহার ও গোলাম রাব্বানী

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের (ইউপি) ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ নজির ছিল ১৯৮৮ সালে। ওই নির্বাচনে ১০০ জন চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন।

প্রাণ ঝরেছিল ৮০ জনের। এর আগে ও পরে আরও সাতবার ইউপি নির্বাচন হয়। কিন্তু এবারের নির্বাচন অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করল। ছয় ধাপে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় প্রাণ হারালেন ১৩৩ জন। বিনা ভোটে নির্বাচিত হলেন ২২০ জন চেয়ারম্যান। নিহতের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থক। গুলিবিদ্ধ, পঙ্গুত্ব বরণসহ নানাভাবে আহত হয়েছেন ১০ হাজারের বেশি। উৎসবের ভোটে লাগল কলঙ্কের দাগ। তবে এর দায় নিচ্ছে না কেউ।

 

নির্বাচন কমিশন ২২ মার্চ থেকে শুরু করে গতকাল পর্যন্ত ছয় ধাপে মোট চার হাজার ৮৪টি ইউপিতে ভোট গ্রহণের আয়োজন করে। প্রথম ধাপে ৭১২, দ্বিতীয় ধাপে ৬৩৯, তৃতীয় ধাপে ৬১৫, চতুর্থ ধাপে ৭০৩, পঞ্চম ধাপে ৭১৭ এবং ষষ্ঠ ধাপে ৬৯৮ ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা বলছেন, রাজনৈতিক কারণে নয়, ব্যক্তিদ্বন্দ্বেই এ সহিংসতা বেড়েছে। সরকার এর দায় নেবে না। এত প্রাণহানি আর সহিংসতার পরও স্বস্তির ঢেঁকুর তুলছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তাদেরও গা-ছাড়া     ভাব। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেছেন, সামগ্রিকভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে। প্রাণহানির ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার হবে কি না তা নিয়েও রয়েছে যথেষ্ট সংশয়। স্থানীয় সরকার বিশ্লেষকরা বলছেন, দলীয় প্রতীকে হওয়ায় এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নজিরবিহীন মনোনয়ন-বাণিজ্য হয়েছে। অভ্যন্তরীণ কোন্দলও ছিল অনেক বেশি। নির্বাচন কমিশনের অদক্ষতা ছিল পদে পদে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ প্রকাশ্য প্রায়। নানাবিধ ত্রুটির কারণেই প্রাণহানি বেড়েছে। ঘটেছে সংঘাত-সহিংসতা। প্রাণ দিতে হয়েছে নারী, শিশু, বৃদ্ধ, হকারসহ মেধাবী শিক্ষার্থীদেরও। এবারের নির্বাচনকে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি সহিংস ও কলঙ্কিত নির্বাচন বলেও আখ্যায়িত করেছেন বিশ্লেষকরা। নির্বাচনের এমন চিত্রের কারণে বর্তমান নির্বাচন কশিমন হয়েছে প্রশ্নবিদ্ধ। ইসির একাধিক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে জানান, ইউপি নির্বাচনের সব ধরনের নেতিবাচক রেকর্ড ভঙ্গ করেছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন। ১৯৮৮ সালে একদিনে সারা দেশে নির্বাচন করায় সহিংসতা বেশি হয়েছিল। এবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সুবিধার্থে পাঁচ মাস ধরে ছয় ধাপে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপরও ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ নির্বাচনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে কমিশন। এটা ইতিহাসে কলঙ্কিত হয়ে থাকবে। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে মনোনয়ন-বাণিজ্য ছোলা কেনা-বেচার মতো হয়েছে। কোথাও কোথাও মৃত ব্যক্তিরাও ভোট দিয়েছেন! নির্বাচন কমিশন অন্তত আর কিছু করতে পারুক বা না পারুক, যারা মারা গেছেন তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করতে পারেন। এতগুলো মানুষ মারা যাওয়া কোনো খেলা কিংবা তামাশার বিষয় নয়। ’ সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘শুরু থেকেই নির্বাচন কমিশনের কঠোর হওয়া প্রয়োজন ছিল। কমিশন যথার্থ দৃঢ়তা দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ’ সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘সহিংসতার দায় যেমন স্থানীয় প্রশাসনের, তেমনই নির্বাচন কমিশনের ওপরও রয়েছে। তারা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। দায়সারাভাবে কাজ করেছে ইসি। তাদের কাছে যে ক্ষমতা ছিল, তা তারা ব্যবহার করেনি। এ ছাড়া চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের অনিয়ম-সংঘাত নতুন সমস্যার সৃষ্টি করেছে। অথচ নির্বাচন হচ্ছে সমস্যা সমাধানের পথ। কিন্তু বর্তমান নির্বাচন কমিশন তাদের অগাধ ক্ষমতার ব্যবহার না করে এ নির্বাচনকে কুলষিত করেছে। চরম সংকটের সৃষ্টি করেছে। এতে নির্বাচনী সংস্কৃতি নষ্ট হচ্ছে। গণতন্ত্রেও এর প্রভাব পড়েছে। সাধারণ মানুষ নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ’ স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারে প্রক্রিয়াগত ত্রুটি ছিল। তাই দলীয় প্রতীক ব্যবহারের কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। ইসির উচিত ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসা। তাদের সহযোগিতা ছাড়া এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, তা আগেই বোঝা উচিত ছিল। ’

সহিংসতায় রেকর্ড : এবারের নির্বাচনী সহিংসতায় ১৩৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ইসির নির্বাচনী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইতিহাসের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে এবারের সহিংসতা। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এর আগে সবচেয়ে বেশি সহিংসতা হয় ১৯৮৮ সালের ১০  ফেব্রুয়ারির ভোটে। ওই নির্বাচনে নিহতের সংখ্যা ৮০ ও আহত ৪৭৬ বলে উল্লেখ করা হয়। গণমাধ্যমে আহতের সংখ্যা পাঁচ সহস্রাধিক বলা হয়েছে। কিন্তু সেই ইতিহাস ছাড়িয়েছে এবারের সংঘাত-সহিংসতা।

up-arrow