Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৭ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ৬ জুন, ২০১৬ ২৩:৩৯
সাইবার অপরাধীদের ভয়ঙ্কর নেটওয়ার্ক
প্রলোভনের ফাঁদ চারদিকে বাদ যাচ্ছেন না ভিআইপিরাও
সাখাওয়াত কাওসার
সাইবার অপরাধীদের ভয়ঙ্কর নেটওয়ার্ক

ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে সাইবার অপরাধীরা। বিভিন্ন প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে সর্বস্ব হাতিয়ে নিচ্ছে সহজ-সরল সাধারণ মানুষের। সাইবার অপরাধীদের কবল থেকে বাদ যাচ্ছেন না খোদ ভিআইপি, ভিভিআইপি কিংবা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। সামাজিকভাবে হেয়-প্রতিপন্ন হচ্ছেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। সাইবার অপরাধীদের ঠেকাতে সরকার ২০১৫ সালে ডিজিটাল সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট প্রণয়ন করলেও তা বাস্তবে খুব একটা কাজে আসছে না। অপরাধীদের ধরতে গলদঘর্ম হতে হচ্ছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি সাইবার অপরাধ দমনে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবল ও সচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প  নেই। প্রয়োজন হলে আইনের সংস্কার, এমনকি আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে হলেও যথাযথ কর্তৃপক্ষের উচিত হবে সক্ষমতা বাড়িয়ে ভয়ঙ্কর এ সমস্যা মোকাবিলা করা। সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এখনো যুগোপযুগী হয়ে উঠেনি উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিয়া রহমান বলেন, প্রযুক্তি এবং সক্ষমতার দিক থেকে ওইসব প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো অনেক পিছিয়ে। তবে প্রয়োজন হলে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে দক্ষ জনবল এই ক্ষেত্রে যুক্ত করা উচিত। কারণ ভৌগোলিক দিক থেকে এবং নানা কারণে বাংলাদেশ অপরাধীদের কাছে অনেক পছন্দের। এ জন্য এ বিষয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর জন্য সরকারের পাশাপাশি সুশীল সমাজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসার পরামর্শ দেন তিনি। জানা গেছে, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এমপি ফেসবুকে কোনো আইডি পরিচালনা না করলেও তার পাঁচটি আইডির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে। গত মঙ্গলবার বিকাল সোয়া ৫টা পর্যন্ত ‘মতিয়া  চৌধুরী’ নামের পেজে লাইক দিয়েছেন ২৮২ জন। আর ‘গধঃরধ ঈযড়ফিযঁৎু মতিয়া চৌধুরী’ নামের অপর পেজে ৩ হাজার ৬০৮ জন এবং ‘Matia Chowdhury নামের  পেজে লাইক পড়েছে ৪ হাজার ৮৪৯টি। তিনটি ফেসবুক পেজেই আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরীর পরিচয়ে ঘরে লেখা আছে  ‘Matia Chowdhury।  কৃষিমন্ত্রী নিজের ভুয়া  ফেসবুক আইডিগুলো বন্ধ করতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যানকেও জানিয়েছেন বলে গত মঙ্গলবার কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। এমন ঘটনায় রাজধানীর রমনা মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ জানান, ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে সাইবার অপরাধ। তবে এসব অপরাধ দমনে র‌্যাব সদস্যরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেকগুলো চাঞ্চল্যকর এবং স্পর্শকাতর মামলার রহস্য উন্মোচন করে অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডির অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক মো. শাহ্ আলম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সাইবার অপরাধটি অন্যান্য অপরাধের চেয়ে নতুন। প্রতিদিনই নতুন নতুন অপরাধের শিকার হচ্ছেন ভুক্তভোগীরা, নতুনভাবে কাজ করতে হচ্ছে পুলিশকে। ক্রমান্বয়ে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশ সদস্যরাও দক্ষ হয়ে উঠছেন। তবে ভুক্তভোগীদের উচিত হবে প্রতারণার বিষয়টি লুকিয়ে না রেখে পুলিশের সহায়তা নেওয়া। একই সঙ্গে কোনো ধরনের লোভনীয় প্রস্তাব এলেও তা পুলিশকে অবহিত করা। সম্প্রতি কুয়েতের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান টেক্সমার্ট থেকে বাংলাদেশের গ্লোব সফট্ ড্রিকস লি. এর নাম করে গত ৪ মে দুপুর ১২টা ৫৮ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে ১৯,১০০ ডলার হাতিয়ে নেয় দেশি-বিদেশি প্রতারক চক্র। তবে গ্লোব সফট্ ড্রিংকস বিষয়টি টের পাওয়ার পর ২৮ মে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় একটি মামলা করে। পরে নবগঠিত কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের একটি দল এ ঘটনায় জড়িত থাকার অপরাধে গিনি বিসাও এবং বাংলাদেশি খোরশেদ বাবুকে গ্রেফতার করে। ইতিমধ্যে তাদের কাছ থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা উদ্ধার করে। ওই সিন্ডিকেটের আরও কয়েকজন বিদেশি নাগরিককে খুঁজছে পুলিশ। কাউন্টার টেরোরিজমের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার গোলাম কিবরিয়া বলেন, আমাদের ধারণা প্রতারক চক্র গ্লোব সফট্ ড্রিংকসের ই-মেইল অ্যাকাউন্ট হ্যাক করেই এই অপরাধটি করেছে। অথবা ওই ই-মেইল অ্যাকাউন্ট ক্লোন করে ডলারগুলো হাতিয়ে নিয়েছে। তবে গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে এখনো পর্যন্ত প্রকৃত তথ্য আদায় করা সম্ভব হয়নি। অপরাধীরা বাংলাদেশি নাগরিক খোরশেদ বাবুর ব্র্যাক ব্যাংকের দক্ষিণখান ব্রাঞ্চের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করিয়েছিল। সাইবার অপরাধীর সঙ্গে জড়িত এমন অনেকের সঙ্গেই কথা বলেছেন এ প্রতিবেদক। তাদের অনেকে শুরুতে আউটসোর্সিংয়ের সঙ্গে জড়িত থাকলেও একপর‌্যায়ে আর্থিক লোভ সামলাতে না পেরে সাইবার অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাইবার অপরাধীরা কোনো টার্গেটকৃত ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নিতে প্রথমত ফেসবুকে কিংবা বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন ধরনের লিংক দেয়। এর বাইরে টার্গেটকৃত ব্যক্তির ই-মেইলে বিভিন্ন সময় এসব লিংক পাঠায় সাইবার অপরাধীরা। সম্প্রতি অনলাইনভিত্তিক কেনাকাটা জমজমাট হওয়ার কারণে অনলাইন কেনাকাটার বিভিন্ন ওয়েবসাইট খোলে সাইবার অপরাধীরা। পাঠানো লিংকে ক্লিক করলে মুহূর্তেই টার্গেটকৃত ব্যক্তির সব ধরনের তথ্য চলে যায় অপরাধীদের কাছে। অপরাধীরা হাতিয়ে নিচ্ছে তার ডেবিট কিংবা ক্রেডিট কার্ডের অর্থ। আবার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ফেসবুক, ই-মেইল কিংবা বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাকাউন্ট হ্যাক কিংবা ক্লোন অ্যাকাউন্ট তৈরি করে বিভিন্ন স্ট্যাটাসের মাধ্যমে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে। আবার অনেক ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে হ্যাকাররা বিভিন্ন অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে ব্যবহারকারীর কাছ থেকে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি ফেসবুসে কিছু কিছু লিংক পাঠিয়ে সাইবার সিন্ডিকেট অফার দিচ্ছে ক্লিক করলেই তার স্ট্যাটাসে বিভিন্ন অঙ্কের লাইকদাতা হবে কিংবা তার বিভিন্ন অঙ্কের ফলোয়ার হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এমন চটকদার অফারে বিমোহিত হয়ে মুহূর্তেই তাতে ক্লিক করছেন।

অনেক সময় বিভিন্ন অ্যাপস ডাউনলোড করতে গিয়ে সাইবার অপরাধীদের শিকার হচ্ছেন অনেক সাধারণ মানুষ। সাইনআপ করতে গেলেই বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন চলে আসছে তার কম্পিউটারের মনিটরে। পছন্দের অ্যাপস ডাউনলোডের জন্য বাধ্য হয়েই তারা ওইসব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। অনেক অ্যাপসের জন্য ভোক্তা প্রাপ্তবয়স্ক কিনা তা যাচাইয়ের জন্য নাম-ঠিকানা, ই-মেইল, পাসওয়ার্ড চাওয়া হয়। অনেক সময় অর্থ খরচ করে অ্যাপস ডাউনলোড করার সময় নাম-ঠিকানা, ই-মেইল, পাসওয়ার্ডের বাইরে ওই ব্যক্তি তার ডেবিট কিংবা ক্রেডিট কার্ডের নম্বরও দিয়ে দিচ্ছেন। এভাবেই সর্বনাশ হচ্ছে। গচ্ছিত অর্থের পুরোটাই ফাঁকা করে দিচ্ছে ব্যালেন্স ট্রান্সফার করে কিংবা বিভিন্ন অনলাইন থেকে কেনাকাটা করছে সাইবার ক্রিমিনাল সিন্ডিকেট। এর বাইরে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে অপরাধীরা ভুয়া ডেবিট এবং ক্রেডিট কার্ড বানিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে গ্রাহকের কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। অন্যদিকে, সম্প্রতি একটি চক্র টার্গেটকৃত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির পর আকর্ষণীয় গিফট পাঠানোর নাম করে বিভিন্ন কৌশলে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। লোভে পড়ে ভুক্তভোগীরা প্রতারকদের চটকদারি কথা বিশ্বাস করে বিভিন্ন দফায় বিপুল পরিমাণ টাকা পরিশোধ করে যাচ্ছে। সম্প্রতি খোদ হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট দম্পতি প্রতারকদের বিভিন্ন দফায় সাড়ে ১৪ লাখ টাকা দেওয়ার পর প্রতারণা বুঝতে পেরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দ্বারস্থ হয়েছিল। প্রতারক চক্র ওই দম্পতির সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলে ফাঁদে ফেলেছিল। এ ব্যাপারে ডিবির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. শাহ্জাহান বলেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরের সচেতন মানুষদের এমন কর্মকাণ্ডে আমরা মাঝে মাঝেই বিস্মিত হই। হাইকোর্টের দম্পতির ঘটনায় ইতিমধ্যে দুজন বিদেশি নাগরিকসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।




up-arrow