Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৯ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ৮ জুন, ২০১৬ ২৩:০৫
গেন্ডারিয়ায় মাদকের উৎপাত চলছে দখলবাজি, খোঁড়াখুঁড়ি
শ্যামপুর টু লালবাগ ২
মাহবুব মমতাজী
গেন্ডারিয়ায় মাদকের উৎপাত চলছে দখলবাজি, খোঁড়াখুঁড়ি

অভিজাত জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল বলে ব্রিটিশ আমলে যাকে নাম দেওয়া হয়েছিল ‘গ্র্যান্ড এরিয়া’— লোকমুখে ঘুরতে ঘুরতে তারই নাম হয়ে যায় ‘গেন্ডারিয়া’। ইতিহাসের সেই সুনাম আর স্বকীয়তা এখন আর নেই। গেন্ডারিয়া থানা এলাকায় মাদকের উত্পাত দিন দিন বেড়েই চলেছে। থেমে নেই দখলবাজিও। মাসের পর মাস রাস্তার ম্যানহোল খুলে রাখা হলেও তা মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসী। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর কাজে নিয়োজিত করা হচ্ছে শিশু-কিশোরদের। জানা যায়, ৪০, ৪৫, ৪৭ ও ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত গেন্ডারিয়া থানা। এ চারটি ওয়ার্ড মিলে জনসংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজার ৫৪১। এখানে কলেজ আছে একটি। মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২১টি। প্রাথমিক বিদ্যালয় ১৫টি। উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে— ফজলুল হক মহিলা কলেজ, বাংলাদেশ ব্যাংক আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়, সদরুল হক মহিলা কলেজ, গেন্ডারিয়া উচ্চবিদ্যালয়, মনিজা রহমান উচ্চবিদ্যালয়, সরকারি নারিন্দা উচ্চবিদ্যালয়, লোহারপুল প্রাথমিক বিদ্যালয়, আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম প্রাথমিক বিদ্যালয়, কবি নজরুল প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফরিদাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সিরাজুল ইসলাম প্রাথমিক বিদ্যালয়। কে বি রোড, সতীশ সরকার রোড, ডিস্টিলারি রোড, রজনী চৌধুরী রোড ও এস কে দাশ লেন মিলে গেন্ডারিয়া এলাকার রয়েছে নানা ইতিহাস-ঐতিহ্য। পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ার দীননাথ সেন রোডটি বিখ্যাত মূলত সাধনা ঔষধালয়ের জন্য। সড়কটির খ্যাতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি। আর তাতে নতুন মাত্রা এনেছে সড়কের ১৭ নম্বর বাড়িতে গড়ে ওঠা ‘সীমান্ত গ্রন্থাগার’। যেখান থেকে এলাকার সাহিত্য-সংস্কৃতি ও প্রগতিশীল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ৬২ বছর ধরে সংগঠনটি আলো ছড়িয়ে আসছে। ইতিহাসে আছে— একদা ধোলাইখালের পূর্বপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় আখের (গেণ্ডারি) চাষ হতো। বিভিন্ন গাছগাছালিতে এলাকাটি ভরপুর ছিল। নিরিবিলি পরিবেশের কারণে সেখানে সাধক বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী তার আশ্রম গড়ে তোলেন। ১৮৮৫ সালের দিকে সেসব বনজঙ্গল পরিষ্কার করে গেন্ডারিয়ায় জনবসতি গড়ে তোলেন ঢাকার রেনেসাঁ-পুরুষ দীননাথ সেন ও বিচারপতি রজনী রায় চৌধুরী। ১৯১৪ সালে অধ্যক্ষ যোগেশচন্দ্র ঘোষ তার বিখ্যাত সাধনা ঔষধালয় গড়ে তোলেন গেন্ডারিয়ার দীননাথ সেন রোডে। ১৯২৪ সালে ব্রিটিশবিরোধী নেত্রী আশালতা সেন সেখানে গড়ে তোলেন গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি। এ এলাকায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম— কদম রসূল জামে মসজিদ, নূর মসজিদ, মুরগিটোলা জামে মসজিদ, ধূপখোলা জামে মসজিদ, শ্রীশ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম ও শিব মন্দির। কুটিরশিল্প, লৌহশিল্প, কলকারখানা, গার্মেন্টশিল্প ও ওষধশিল্পের সুনাম রয়েছে এ গেন্ডারিয়ার। সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ধরে রাখতে গড়ে তোলা হয়েছে জহির রায়হান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, গেন্ডারিয়ার জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য ডিআইটি ও নামাপাড় নামে দুটি পুকুর রয়েছে। এর মধ্যে ৩৬/৩৫ ডিআইটি প্লট (নতুন বাজার) রাস্তাসংলগ্ন চারপাশ দখলদার নানা সাইনবোর্ডে আঁটো হয়ে আসছে ডিআইটি পুকুর। আর এসব দখলে ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন, কার-মাইক্রো ও ট্রাকশ্রমিক এবং জলসাঘর নামে বিভিন্ন সংগঠন। তারা পুকুরের পাড় ভরাট করে নিজেদের কার্যালয় গড়ে তুলেছে। আর এসব ঘটনার পেছনে বিভিন্ন প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এ ছাড়াও গেন্ডারিয়া রেল স্টেশনের দক্ষিণ পাশের রেলের সরকারি জায়গা দখল করে ভাঙাড়ির দোকান, ঘর ও রিকশা-ভ্যানের গ্যারেজ গড়ে তোলা হয়েছে। রেললাইনের আশপাশ থেকে বস্তি তুলে দেওয়া হলেও রেলের জায়গা এখনো দখলমুক্ত হয়নি। অনুমোদন ছাড়াই সামান্য জায়গার মধ্যে উঁচু করা হচ্ছে বেগমগঞ্জ লেনে ১৭ নম্বর, ১৮/১-জ, ১৮/১-দ-বি, ১৯/৫/১, ১৯/সি-১-এর পাশের ভবনটি এবং ২৯ নম্বর বানিয়ানগর লেন ভবনগুলো। এসব ভবন প্রধান সড়কের পাশেই অবস্থিত। যেগুলোর নিচতলায় রয়েছে দোকান আর ওপরতলাগুলো আবাসিক এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

আরও জানা যায়, ১৭৭ নম্বর ডিআইটি রোড খোঁড়াখুঁড়ির পর ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে রাখা হয়েছে প্রায় আড়াই মাস ধরে। কবে সেসব ঢাকনা লাগানো হবে কেউ জানে না। রাস্তা মেরামতেরও কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ। তারা জানান, বর্ষায় এ রাস্তায় হাঁটুপানি হয়। এমনকি ভবনের নিচতলা পর্যন্ত পানিতে টইটম্বুর হয়ে যায়। জানা গেছে, ডিস্টিলারি কিংবা অ্যালবার্টের গলি হয়ে মানুষের চলাচলে কোনো স্বস্তি নেই। আশপাশের ময়লা-আবর্জনায় ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। ৯৪/৮ দীননাথ লেন ও ১ নম্বর নিকেতন গলিতে রাস্তার স্যুয়ারেজ লাইন মেরামতের জন্য রিং ফেলে রাখা হয়েছে দীর্ঘদিন। কিন্তু আজ পর্যন্ত কার্যক্রম শুরু হয়নি। ঢালকানগর বরফের গলিতে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট লোহার কারখানা আর অ্যামব্রয়ডারির কারখানা। যেখানে শিশু ও কিশোর শ্রমিকরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করছে। একই গলিতে গড়ে উঠেছে একটি বরফকল। আশপাশের দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা পানি দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বড় বড় বরফের বার। এসব বরফ রাজধানীর বিভিন্ন শরবত, লাচ্ছির দোকান এবং মাছের আড়তগুলোয় সরবরাহ করা হয়।

অভিযোগ পাওয়া যায়, ধূপখোলা মাঠের উত্তর পাশের গেটের ছাদে সন্ধ্যা নামলেই নিয়মিত গাঁজার আড্ডা বসে। অথচ এসব প্রতিরোধে কোনো পদক্ষেপ নেই। দয়াগঞ্জ রেলব্রিজ থেকে স্টেশন পর্যন্ত রেললাইনের ধারে প্রকাশ্যে চলে মাদক সেবন। এ ছাড়াও ওভারসিজ সিএনজি ফিলিং স্টেশনের পাশে হেরোইন, গাঁজা, ইয়াবা, প্যাথেডিনসহ বিভিন্ন মাদকের কেনাবেচা চলে। স্থানীয় বাসিন্দা কাজী সুলতান আহমেদ টোকন বলেন, ‘উঠতি বয়সী ছেলেদের মধ্যে মাদকের ব্যবহার যে হারে বাড়ছে তাতে আমরা এলাকাবাসী অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।’গেন্ডারিয়া থানার ৪০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মকবুল ইসলাম খান টিপু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এ এলাকাটি একসময় মাদকের ঘাঁটি ছিল। এখনো ভ্রাম্যমাণ অবস্থায় মাদক বিক্রি করা হয়। তবে আগের তুলনায় মাদক কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আর ইয়াবা সরবরাহ হয়ে থাকে ছোট পরিসরে। এটি বর্তমানে ঠেকানো কঠিন হয়ে গেছে।

জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মাদকের মোট ৪৫টি মামলা হয়েছে। আর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৯০ জনকে সাজা দেওয়া হয়েছে। গেন্ডারিয়া থানা পুলিশ মাদক স্পট থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থেকে টার্গেট করে, কোন কোন ব্যক্তি মাদক কিনে বের হচ্ছে। এ সময় তাদের তল্লাশি করে গাড়িতে তুলে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে অনেক সময় হয়রানির শিকার হয় সাধারণ পথচারীরাও। রাত ৯টার পরে দয়াগঞ্জ মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজির হাত থেকেও রক্ষা পায় না পণ্য বহনকারী ট্রাকগুলো। গেন্ডারিয়া রেলের জায়গা ও ডিআইটি পুকুরের পাড় দখলের বিষয়ে জানতে সেখানকার স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর নাসির আইমেদ ভূঁইয়ার সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি তা ধরেননি।




up-arrow