Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : রবিবার, ১৯ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৮ জুন, ২০১৬ ২২:৪৫
পরিবারের সাক্ষাৎ
মীর কাসেমের রিভিউ আবেদন এ সপ্তাহেই
আহমেদ আল আমীন

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধী মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড পুনর্বিবেচনা চেয়ে আসামিপক্ষের রিভিউ আবেদনের সব প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। শেষ মুহূর্তের যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা শেষে আজ বা আগামীকালের মধ্যেই সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ আবেদন দাখিল করার কথা রয়েছে। এ বিষয়ে আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মীর কাসেম আলীর রিভিউ আবেদনের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। রিভিউ আবেদনে তার খালাস চাওয়া হবে। শুনানিতেও সেভাবেই যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হবে। এদিকে আসামিপক্ষের অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, আজ বা আগামীকাল রিভিউ দায়ের করা না হলে ২১ জুনের মধ্যেই তা দাখিল করা হবে। ৮ মার্চ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে আপিল বিভাগ। বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য এই মীর কাসেম ১৯৭১ সালে ছিলেন স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের ঘাতক সংগঠন আলবদর বাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান। পরে ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রায়ের বিরুদ্ধে তিনি সুপ্রিমকোর্টে আপিল করেন। মীর কাসেম আলী এখন কাশিমপুর কারাগারে। গত ৬ জুন দুপুরে আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট বিচারপতিদের স্বাক্ষরের পর মীর কাসেম আলীর আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এরপর এ মামলার বিচারিক আদালত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিদের স্বাক্ষরের পর ওইদিনই লাল কাপড়ে মোড়ানো তার মৃত্যুপরোয়ানা কারাগারে পাঠানো হয়। ইতিমধ্যে সেই মৃত্যুপরোয়ানা তাকে পড়ে শোনানো হয়েছে। ১১ জুন কাশিমপুর কারাগারে আসামির ছেলেসহ পাঁচ আইনজীবী মীর কাসেমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎ শেষে আইনজীবীরা জানান, সাজা বহাল রেখে আপিল বিভাগ যে রায় দিয়েছে মীর কাসেম আলী তা পুনর্বিবেচনা চেয়ে আবেদন করবেন। এদিকে গতকাল স্ত্রী খন্দকার আয়েশা খাতুনসহ পরিবারের নয়জন সদস্য কারাগারে মীর কাসেমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সাক্ষাতে রিভিউ আবেদনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় রিভিউ আবেদনই বিচারিক প্রক্রিয়ার সর্বশেষ ধাপ। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে রিভিউ আবেদন করতে হবে। এ আবেদনের নিষ্পত্তির আগে দণ্ড কার্যকর করা যাবে না। রিভিউ নাকচ হলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারবেন মীর কাসেম। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০১২ সালের ১৭ জুন গ্রেফতার হন মীর কাসেম। পরে ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয় তাকে। ২০১৩ সালের ১৬ মে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয় ওই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর। ২০১৪ সালের নভেম্বরে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় বিচারিক আদালত। ট্রাইব্যুনালে মীর কাসেমের বিচার হয় ১৪ অভিযোগে। তবে বিচারিক ওই আদালতে প্রমাণিত হয় দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, ষষ্ঠ, সপ্তম, নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ ও চতুর্দশ; এই ১০টি অভিযোগ। এর মধ্যে একাদশ অভিযোগে সর্বসম্মতভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও দ্বাদশ অভিযোগে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয় মীর কাসেমকে। প্রমাণিত অন্য আট অভিযোগে মোট ৭২ বছরের দণ্ড পান তিনি। এই রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করলে আপিল বিভাগে চতুর্থ, ষষ্ঠ ও দ্বাদশ অভিযোগ থেকে খালাস পান মীর কাসেম। অন্য সাত অভিযোগ প্রমাণিত হয় আপিল বিভাগে। এসব অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া দণ্ড বহাল রাখে আপিল বিভাগ। দ্বিতীয় অভিযোগ, মীর কাসেমের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ১৯ নভেম্বর চাকতাই থেকে অপহরণ করে চট্টগ্রামের ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতন করা হয় লুত্ফর রহমান ফারুককে। তৃতীয় অভিযোগ, ২২ বা ২৩ নভেম্বর মীর কাসেমের নেতৃত্বে বাসা থেকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলে নির্যাতন করা হয় ডবলমুরিং থানা এলাকার কদমতলীর জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে। সপ্তম অভিযোগ, মীর কাসেমের নেতৃত্বে আলবদর সদস্যরা ডবলমুরিং থানা এলাকা থেকে সানাউল্লাহ চৌধুরীসহ দুজনকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে ডালিম হোটেলে। নবম অভিযোগ, ২৯ নভেম্বর মীর কাসেমের নেতৃত্বে সৈয়দ মো. এমরানসহ ছয়জনকে অপহরণ ও নির্যাতন। দশম অভিযোগ, ২৯ নভেম্বর মীর কাসেমের নির্দেশে মো. জাকারিয়াসহ চারজনকে অপহরণ ও নির্যাতন করে আলবদর সদস্যরা। একাদশ অভিযোগ, একাত্তরের ঈদুল ফিতরের পর যে কোনো একদিন মীর কাসেমের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিনকে অপহণের পর নির্যাতন করে আলবদর সদস্যরা। নির্যাতনে জসিমের মৃত্যু হলে আরও পাঁচ অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশসহ তার মৃতদেহ ফেলে দেওয়া হয় কর্ণফুলী নদীতে। চতুর্দশ অভিযোগ, নভেম্বরের শেষ দিকে মীর কাসেমের নেতৃত্বে আলবদর সদস্যরা নাসির উদ্দিন চৌধুরীকে অপহরণ ও নির্যাতন করে। একাদশ অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড ছাড়াও তৃতীয়, সপ্তম, নবম ও দশম অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয় মীর কাসেমকে। আর দ্বিতীয় অভিযোগে ২০ বছর এবং চতুর্দশ অভিযোগে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় বিচারিক আদালতে।

পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎ : মীর কাসেম আলীর সঙ্গে তার পরিবারের নয়জন সদস্য গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে দেখা করেছেন। গতকাল দুপুর পৌনে ১টার দিকে জেল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে তারা মীর কাসেমের সঙ্গে দেখা করেন। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার পার্ট-২-এর জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক জানান, মীর কাসেম আলীর পরিবারের নয়জন সদস্য তার সঙ্গে দেখা করতে দুপুরে কারাগারে আসেন। পরে সাক্ষাতের জন্য আবেদন করলে দুপুর পৌনে ১টার দিকে তাদের অনুমতি দেওয়া হয়। সাক্ষাত্প্রার্থীরা মীর কাসেম আলীর সঙ্গে প্রায় ৪০ মিনিট কথা বলে চলে যান। যারা দেখা করেছেন তারা হলেন মীর কাসেম আলীর স্ত্রী খন্দকার আয়েশা খাতুন, ছেলে মীর আহমদ বিন কাসেম, পুত্রবধূ সায়েদা ফাহমিদা আক্তার ও তাহমিনা আক্তার, মেয়ে তাহেরা তাসমিম, ভাগিনা রুমান পারভেজ ও আবদুল আল মাহাদী, ভাতিজা কে এম রশিদ উদ্দিন ও শুভ মজুমদার।

উল্লেখ্য, মীর কাসেম আলী কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসির কনডেম সেলে বন্দী রয়েছেন। ২০১২ সালে গ্রেফতারের পর ২০১৪ সালের আগ পর্যন্ত তিনি এ কারাগারে ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দীর মর্যাদায় ছিলেন। পরে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তির পর তাকে ফাঁসির কনডেম সেলে পাঠানো হয়। ৮ মার্চ আদালত মীর কাসেম আলীর ফাঁসির রায় বহালের আদেশ দেয়। ৭ জুন সকালে কারাগারের ফাঁসির সেলে তাকে মৃত্যু পরোয়ানা পড়ে শোনানো হয়।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow