Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২১ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২০ জুন, ২০১৬ ২৩:৩৯
কৃষি সংবাদ
কেঁচো সারে ভাগ্য বদল
জামান আখতার, চুয়াডাঙ্গা
কেঁচো সারে ভাগ্য বদল

দৌলাতদিয়াড় গ্রামের হতাশাগ্রস্ত যুবক মাফুজের ভাগ্য বদলে দিয়েছে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার। পুরো নাম মফিজুর রহমান মাফুজ (৩২)। তিনি শহরতলী দৌলাতদিয়াড় গ্রামের মৃত আবু বক্কর মোল্লার ছেলে।

মাফুজ জানান, ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার পুঁজি খাটিয়ে বর্তমানে তিনি ৮০/৮৫ লাখ টাকার মালিক। নিজের সাফল্য আর দেশের কৃষিকে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক থেকে মুক্ত করার প্রত্যয় নিয়ে তিনি কাজ করছেন। নিজের অতীতের কথা স্মরণ রেখে জেলার দরিদ্র কৃষকদেরকে বিনামূল্যে পরামর্শ ও ভার্মি কম্পোস্ট বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা করছেন তিনি। মাফুজ আরও জানান, ২০০২ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় তিনি এক বিষয়ে অকৃতকার্য হন। তারপর লেখাপড়ার প্রতি অনিহা সৃষ্টি হয়। তখন তিনি স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য গরু ও মুরগির খামার গড়ে তোলেন। কিন্তু ২০০৪ সালের মাঝামাঝি সময় অতিরিক্ত গরমে একদিনেই তার আড়াই হাজার মুরগি মারা যায়। গরুর খামারটিও নষ্ট হয়ে যায়। আবার হতাশ হয়ে পড়েন তিনি। প্রায় তিন বছর এভাবে থাকার পর নতুন উদ্যোমে ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য নামেন। এ সময় পরিচয় হয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামার বাড়ির প্রকল্প পরিচালক নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তাই পরামর্শে ২০০৭ সালের শুরুতে তিনি ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সারের উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেন। মাফুজ বলেন, ‘ভারত থেকে প্রতিটি তিন টাকা দরে ১ লাখ ২৫ হাজার অস্ট্রেলিয়ান কেঁচো কিনে শুরু করি ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের কাজ। সব রকম পরামর্শ ও দিক নির্দেশনা দেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রকল্প পরিচালক নজরুল ইসলাম।’ তিনি জানান, বর্তমানে ৫০ পয়সা পিস হিসেবে প্রায় ৫০ লাখ টাকার কেঁচোসহ মাফুজের পুঁজি ৮০ থেকে ৮৫ লাখ টাকা। এখন তিনি বাণিজ্যিকভাবে সার উৎপাদন করছেন। উৎপাদিত সারের নাম দিয়েছেন ‘মা এগ্রো ভার্মি কম্পোস্ট’। কেঁচো সার প্রস্তুত বিষয়ে মাফুজ বলেন, এলাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রথমে গোবর সংগ্রহ করতে হয়। এর গ্যাস দূর করার জন্য ৭-৮ দিন খোলা জায়গায় ফেলে রাখতে হয়। এরপর বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত ড্রেনের ভিতর গোবর ফেলে পরিমাণমত কেঁচো ছেড়ে দিতে হয়। দুই সপ্তাহ পর নেটে চালাই করে কেঁচো সার আলাদা করা হয়। তিনি জানান, বর্তমানে মাফুজের মা এগ্রো কেঁচো সার কারখানায় প্রতি ১৫ দিনে গড়ে প্রায় ১০ টন সার উৎপাদন হয়। যার বাজার মূল্য ১ লাখ টাকার উপরে। এছাড়া কেঁচো দ্রুত বংশবৃদ্ধি করায় সেই কেঁচো বিক্রি করেও বাড়তি আয় করা সম্ভব। মাফুজের উৎপাদিত সার নিজ জেলায় বিক্রির পাশাপাশি ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঝিনাইদহ, যশোর, কুষ্টিয়া ও মেহেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি হয়ে থাকে। মাফুজ বলেন, চুয়াডাঙ্গা জেলায় পান ও সবজির আবাদ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার সব ধরনের চাষের পাশাপাশি পান ও সবজি চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। এ কারণে জেলায় সারের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাছাড়া যেসব কৃষক এতোদিন কেঁচো সার না পাওয়ায় ব্যবহার করতে পারতেন না, এখন হাতের নাগালে এ সার পেয়ে দিন দিন এর ব্যবহারকারীর সংখ্যাও বাড়ছে।

মাফুজ আরও বলেন, ‘মা এগ্রো ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের পাশাপাশি জেলার প্রতিটি গ্রামের দরিদ্র কৃষক বিশেষ করে নারী কৃষকদের এ সার উৎপাদন বিষয়ে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। আমার লক্ষ্য দেশের কৃষিকে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক থেকে মুক্ত করা। আমি শুধু নিজ জেলাতেই নয়, এরই মধ্যে দেশের ৬১টি জেলাতে এ বিষয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।’ এই মফিজুর রহমান মাফুজ তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ চলতি বছর বঙ্গবীর ওসমানী পদকে ভূষিত হয়েছেন। জাতীয় পর্যায়ে স্বাধীনতা স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ পদক পান তিনি। এক সময়ের হতাশাগ্রস্ত মাফুজের প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ১৫ জন নারী শ্রমিকও কাজ করছেন।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow