Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : সোমবার, ২৭ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৬ জুন, ২০১৬ ২২:৫৯
অষ্টম কলাম
স্কুলছাত্রের ওপর পুলিশের নির্যাতন
ঘুষ লেনদেনের অডিও ফাঁস
নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর

পুলিশের নির্যাতনের শিকার হয়ে যশোরে দশম শ্রেণির স্কুলছাত্র  আইনুল হক রোহিত মানসিক ভারসাম্য হারাতে বসেছে। যশোর উপশহর বাদশাহ ফয়সাল ইসলামী ইনস্টিটিউটের ছাত্র রোহিতের স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, ইসলামী ব্যাংকের এক কর্মকর্তার মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগে উপশহর ফাঁড়ির পুলিশ রোহিতের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। পরে তার স্বজনদের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ আদায় করা হয়। এই ঘুষ লেনদেন-সংক্রান্ত কথাবার্তার একটি অডিও রেকর্ড গত শনিবার বাংলাদেশ প্রতিদিনের হাতে এসেছে। রেকর্ডটি নানাভাবে বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, কথোপকথনরতদের একজন উপশহর পুলিশ ক্যাম্পের অফিসার। রেকর্ডটিতে শোনা যায়, একপ্রান্ত থেকে বলা হচ্ছে- ‘আমরা ওর মায়ের গহনা বিক্রি করে অনেক কষ্ট করে ৪৮ হাজার টাকা জোগাড় করেছি। আর টাকা জোগাড় করতে পারছি না। আপনি দয়া করে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে একটা রফা করে দিন। ’ ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ওই পুলিশ কর্মকর্তা ফোনকারীকে ইফতারের পর থানায় আসতে বলেন। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে উপশহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই বিপ্লব এ ধরনের অভিযোগের কথা অস্বীকার করেন। যশোরের একজন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপারও দাবি করেছেন, এমন কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। রোহিতের পরিবার ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, উপশহর ডি-ব্লকের অস্থায়ী বাসিন্দা নাজিম উদ্দিনের একটি মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগে ভিডিও ফুটেজের সূত্র ধরে গত ৮ জুন দুপুরে উপশহর ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই বিপ্লব হোসেন দশম শ্রেণির ছাত্র রোহিতকে উপশহর এক নম্বর সেক্টরের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যান। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ওই ভিডিও ফুটেজে পাওয়া ছবির সঙ্গে রোহিতের চেহারার কোনো মিল নেই। রোহিতের পরিবারের অভিযোগ, ৮ জুন রাতে কোতোয়ালি থানায় রেখে রোহিতের ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। নির্যাতনের চিহ্ন তার সারা শরীরে ছিল। রোহিতের মা জুলি বেগম বলেন, ‘এসআই বিপ্লব আমার ছেলে রোহিতকে যেদিন ধরে থানায় নিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালান, সেদিন সে রোজা ছিল। কিন্তু নির্দয় পুলিশের তাতে মন গলেনি। রোহিতকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে পুলিশ মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দাবি করে। পরের দিন ৯ জুন ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দেওয়ায় রোহিতকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই টাকার লেনদেন হয় শহরের দড়াটানার বনফুল নামের একটি মিষ্টির দোকানে। ’ তিনি জানান, পরে ১৮ জুন ডিবি পুলিশের এক অফিসারও রোহিতকে এসপি অফিসে নিয়ে যান। সেখানেও ভিডিও ফুটেজ মিলিয়ে দেখা হয়। কিন্তু এবারও রোহিতের সঙ্গে মোটরসাইকেল চোরদের চেহারার মিল না পাওয়ায় এসপি অফিস থেকে রোহিতকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ২৪ জুন আবার উপশহর ফাঁড়ির এসআই বিপ্লব ভিডিও ফুটেজ মেলানোর কথা বলে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান রোহিতকে। রোহিতের মায়ের অভিযোগ, দফায় দফায় পুলিশের হয়রানি ও নির্যাতনে বর্তমানে রোহিত মানসিক ভারসাম্য হারাতে বসেছে। প্রায়ই সে একা একা বিড়বিড় করে বকে। এসব কারণে তার এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার বিষয়টিও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বর্তমান অবস্থায় রোহিতের পুরো পরিবার পুলিশের হয়রানি ও নির্যাতনের আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। রোহিতের বাবা সেন্টু শহরের একটি কাপড়ের দোকানে কাজ করে কোনো রকমে সংসার চালান। তার আশঙ্কা পুলিশের রোষে পড়ে রোহিতের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। এদিকে রোহিতের ওপর নির্যাতন ও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে উপশহর পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই বিপ্লব বলেন, ‘এসব মিথ্যা কথা। ’ যশোর কোতোয়ালি থানার ওসি মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘আমার কাছে এমন কোনো অভিযোগ কেউ করেনি। অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখা হবে। ’ প্রসঙ্গত, রোহিতকে নির্যাতন ও ঘুষ নেওয়া-সংক্রান্ত একটি খবর রবিবার যশোরের স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এ ব্যাপারে সহকারী পুলিশ সুপার (খ-সার্কেল) বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘এমন কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। ক্ষতিগ্রস্তরা পুলিশ সুপারের শরণাপন্ন হলে এবং ঘটনা প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

এই পাতার আরো খবর
up-arrow