Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শুক্রবার, ১ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৩০ জুন, ২০১৬ ২৩:৫২
খুন গুম ধর্ষণ অপহরণ নিত্যদিনের ঘটনা
মানিক মুনতাসির, পার্বত্য এলাকা থেকে ফিরে
খুন গুম ধর্ষণ অপহরণ নিত্যদিনের ঘটনা

ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠছে পাহাড়ের জনপদ। শান্তিচুক্তির ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ফেরেনি। খুন-গুম, ধর্ষণ, অপহরণ যেন এ অঞ্চলের নিত্যদিনের ঘটনা। পুলিশ বলছে, থানায় মামলা করতে আসে না সাধারণ মানুষ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট এলাকায় এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, প্রত্যেকের তো প্রাণের ভয় রয়েছে। কেউ কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে প্রতিপক্ষ গ্রুপ তাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। পুলিশ ও সেনাবাহিনী শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। কিন্তু মানুষকে সার্বক্ষণিক পাহারা দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল পুলিশের নেই।

রাঙামাটি জেলার সবচেয়ে দুর্গম এলাকা বিলাইছড়ি। সেখানকার থানায় গত ৬ মাসে মাত্র তিনটি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে দুটি মারামারি আর একটি চাকমা মেয়েকে ধর্ষণ ও নির্যাতনের মামলা। অথচ ওই অঞ্চলে মাস তিনেক আগে বিলাইছড়ি থানার কাছাকাছি এক জঙ্গলে নাম পরিচয়হীন এক হতভাগ্যের লাশ পাওয়া যায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে না হয়েছে মামলা, না পাওয়া গেছে ওই লাশের পরিচয়। ওই থানার রেকর্ড অনুযায়ী ২০১৩ সালে মামলা হয়েছে ৫টি। ২০১৪ সালে মামলা হয়েছে ৮টি, ২০১৫ সালে ৬টি। আর চলতি বছর ২৩ জুন পর্যন্ত ৩টি মামলা হয়েছে। অথচ স্থানীয় বাসিন্দারা (পাহাড়ি কিংবা বাঙালি) বলেছেন, এ অঞ্চলে কৃষিকাজ, ব্যবসা, দোকান বা যে কোনো ধরনের লাভজনক কাজের কমিশন দিতে হয় জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সন্ত্রাসীদের। অন্যথায় ফোন করে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, বাজারে কোনো কৃষিপণ্য বিক্রি করতে নিলে সেখান থেকেও কমিশন দিতে হয় জেএসএসকে। সরেজমিনে জানা গেছে, এ অঞ্চলে চলতি বছরের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হচ্ছে চাকমা মেয়েটিকে ধর্ষণ ও নির্যাতন। তার অপরাধ ছিল একজন পাহাড়ি (উপজাতি) হয়ে একজন বাঙালি ছেলের দোকান থেকে জিনিসপত্র কেনা। গত ২৯ মে মেয়েটি শিহাব নামের এক বাঙালি দোকানদারের (মা টেলিকম) দোকান থেকে নিজের এসএসসি পাসের ট্রান্সক্রিপ্ট ওঠাতে যায় অনলাইনের মাধ্যমে। ওই সময় ৮ থেকে ১০ জন উপজাতি যুবক তাকে অস্ত্রের মুখে মা টেলিকম থেকে তুলে নিয়ে যায় পাশের এক জঙ্গলে। সেখানে প্রথমে শ্লীলতাহানি ও মারধর করা হয়। পরে তরুণীর চোখ বেঁধে উলঙ্গ অবস্থায় তার ছবি তোলা হয় এবং ধর্ষণ করা হয়। ওই ঘটনার কথা কাউকে বললে তাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে ভুক্তভোগীর মা গাছকাটাছড়া আর্মি ক্যাম্পে গিয়ে ঘটনার জন্য নালিশ করে ধর্ষকদের বিচার দাবি করেন। পরবর্তীতে সেনাবাহিনী তাকে বিলাইছড়ি থানায় পাঠিয়ে দেয়। এ ঘটনায় স্থানীয় উপজাতি যুবক পুলক চাকমা, নেলসন চাকমা, মানিক চাকমা, সুনিতিময় চাকমা, সৃজয় চাকমাসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার ওই তরুণী। এ ঘটনায় চারজনকে পুলিশ গ্রেফতারও করে। এরপর মামলার আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। আসামিরা একদিকে জামিনের জন্য চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে বলে ওই তরুণীর বাবা অভিযোগ করেছেন। সূত্র জানায়, রাঙামাটি, বান্দরবান আর খাগড়াছড়ির সাধারণ মানুষ এখন ইউপিডিএফ আর জেএসএসের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। তাদের ভয়ে ওই সব এলাকায় প্রতিনিয়ত পর্যটকের সংখ্যা কমছে। দিনের বেলায় তারা অস্ত্রের মহড়া প্রদর্শন করছে। প্রাণের ভয়ে থানায় অভিযোগও দেন না পাহাড়িরা। খুন, গুম, অপহরণ আর চাঁদাবাজদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ এসব অঞ্চলের মানুষ। পার্বত্য শান্তিচুক্তির ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘুরছে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা। সরেজমিন গিয়ে জানা গেছে, গত ১৫ এপ্রিল বান্দরবানের লামায় উপজাতি সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন তিন বাঙালি গরু ব্যবসায়ী। এ ঘটনায় তিন ত্রিপুরা এক সন্ত্রাসীকে অস্ত্রসহ আটক করা হয়। ১৩ জুন বোয়াংছড়ি উপজেলায় আক্তার (২০) নামে এক বাঙালি গৃহবধূকে প্রকাশ্যে দিবালোকে অস্ত্র ঠেকিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে এক উপজাতি সন্ত্রাসী। একই দিন অস্ত্রের মুখে অপহরণ হন বান্দরবানের আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক ইউপি সদস্য মংপ্রু মারমা। তিনি এখনো নিখোঁজ। তার পরিবারকেও নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এ ঘটনায় জেএসএসের ৩৬ জনকে আসামি করে মামলা করেছে পরিবার। ৩০ মে রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে জেএসএস কর্মীরা মুকুল কান্তি চাকমা নামে অবসরপ্রাপ্ত এক সেনা সার্জেন্টকে ডেকে নিয়ে আর ফেরত দেয়নি। তার পরিবার আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী গ্রুপের কাছে নানাভাবে ধরনা দিলেও মুকুল কান্তি চাকমার খোঁজ মেলেনি আজও। জানা গেছে, এর আগে গত বছর ৩১ ডিসেম্বর রাঙামাটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকা সাজেকে এক সেনা কর্মকর্তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে তার গাড়িতে আগুন দেয় উপজাতি সন্ত্রাসীরা। ওই সময় গাড়িতে তার পরিবারসহ ভ্রমণে ছিলেন সেই সেনা কর্মকর্তা। ২০১৫ সালের ১৫ আগস্ট রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় ৫ জেএসএস (সংস্কার) সন্ত্রাসী। উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র। একই বছরের ২৬ জুলাই রাঙামাটিতে জেএসএস-ইউপিডিএফ বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় ৩ জন এবং ২৬ জানুয়ারি খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে জেএসএস-ইউপিডিএফের আরেকটি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। এর বাইরে বিভিন্ন সময় উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি ভারী আগ্নেয়াস্ত্র।

রাঙামাটির বিলাইছড়ি এলাকার কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা অংচাখই কারবারি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, তাদের সব সময় প্রাণের ভয় নিয়ে দিন কাটাতে হয়। ইউপিডিএফ আর জেএসএসের সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে দিবালোকে মানুষ খুন করছে। আর প্রতিটি বাড়ি থেকে চাঁদাবাজি করছে। সাধারণ মানুষ এসব সন্ত্রাসীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ। বিলাইছড়ি থানার ওসি মো. মঞ্জুরুল আল মোল্লা বলেন, পুলিশ সাধ্যমতো চেষ্টা করছে সন্ত্রাসীদের দমনে। এদিকে গত ২২ জুন রাঙামাটি শহরের নিজ বাসভবনে পার্বত্য চট্টগ্রামের একমাত্র মহিলা এমপি ফিরোজা বেগম চিনু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, উপজাতীয় নেতারা সব সময়ই সরকারবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন। প্রথমত, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাজনের সময় ও পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তারা মূল স্রোতের বিরোধিতা করেছে। এখন তারা বাংলাদেশ সরকারের বিরোধিতা করছে। অর্থাৎ মূল স্রোতের বিপরীতে থাকাই তাদের স্বভাবগত অভ্যাস। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এই এমপি বলেন, সন্ত্রাসীরা এতটাই শক্তিশালী যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সঙ্গে পেরে উঠে না। এ জন্য দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে জেএসএসের সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমার রাঙামাটি শহর কল্যাণপুরস্থ বাসায় গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তিনি তখন ঢাকায় ছিলেন। পরবর্তীতে তার ব্যবহূত টেলিফোন নম্বরে ফোন করা হলে তার অফিস স্টাফ চিংকি চাকমা নামের এক তরুণী বলেন, স্যার এখন বাসায় নেই। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow