Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : রবিবার, ৩ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৩ জুলাই, ২০১৬ ০০:১০
কমান্ডো অভিযানের প্রশংসা করলেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা
জিন্নাতুন নূর

শুক্রবার গুলশানের একটি রেস্টুরেন্টে পুলিশসহ বিদেশিদের হত্যার ঘটনাটি জিহাদি মতাদর্শে দীক্ষিত উগ্রবাদী গোষ্ঠীর কাজ। তবে এই জঙ্গিবাদী শক্তির সঙ্গে কোনো আন্তর্জাতিক জঙ্গি শক্তির সম্পৃক্ততা নেই। ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশের লোকেরাই এই আক্রমণ করাচ্ছেন এবং তারাই এ কাজে অর্থায়ন করছেন। আর এ ধরনের হামলা বাংলাদেশে ঝুঁকির ক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা। তবে এ ঘটনায় আমাদের কমান্ডো বাহিনী খুব দ্রুত সুনিপুণ পরিকল্পনার মাধ্যমে যে অভিযান চালায় তা ছিল চমৎকার। এমনকি জঙ্গি তত্পরতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে এ ঘটনায় নতুন ডাইমেনশন তৈরি হয়েছে। গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে আলাপকালে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এসব কথা বলেন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে বাংলাদেশকে একটি ভীতিকর ও জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য। একইভাবে সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার জন্যও। এ হামলাটিকে আমি রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারছি না। আমি মনে করি দেশের লোকেরাই এ আক্রমণ করেছে, তারাই লক্ষ্যবস্তু দিয়ে দিচ্ছে এবং আদেশ দিয়ে মানুষ হত্যা করাচ্ছে। এখন এই পুরো গোষ্ঠীকে যদি আমরা সাধারণের সামনে উন্মোচন করতে না পারি তবে আগামী দিনে জঙ্গি তত্পরতা ঠেকানো যাবে না। তিনি বলেন, গুলশানের মতো এলাকায় নিশ্চয়ই কোনো নিরাপত্তা দুর্বলতা ছিল এবং সেখানে অভ্যন্তরীণ শক্তির সংযোগও ছিল। আমাদের এই নিরাপত্তা ছিদ্রগুলো চিহ্নিত করতে হবে। আর নতুন ঝুঁকি নতুনভাবে মোকাবিলা করতে হবে। আবদুর রশিদ আরও বলেন, আমরা জানতে পেরেছি যে, হামলাকারীরা গুলশানের রেস্তোরাঁয় ঢুকে শুরুতেই বিদেশিদের হত্যা করে ও তাদের গলা কাটে। তাদের হামলায় বর্বরতার মাত্রা বেশি ছিল। আমরা প্রথমে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে সমাধানে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হামলাকারীরা না মানলে আমাদের শক্তি প্রয়োগ করতে হয়। আর শক্তি প্রয়োগ করতে আমাদের দরকার স্পেশালাইজড ফোর্স। আর এই অভিযানেও ফোর্সের প্যারাকমান্ডো এলিমেন্টকে ব্যবহার করা হয়েছে। আর কমান্ডো ফোর্সও তাদের সক্ষমতার বড় ধরনের প্রকাশ ঘটিয়েছে। একই সঙ্গে র‌্যাব, সোয়াতও তাদের সক্ষমতার বড় স্বাক্ষর রেখেছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলে কোনো কিছু পাওয়া যায় না। একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ছিদ্র, দুর্বলতা ও সবলতা সব দিক থাকে। কিন্তু এটি সবার জানা থাকে না। আর দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে আমাদের অনেক কষ্ট পেতে হয়। আর হামলাকারীরা এই দুর্বলতা চিহ্নিত করতে পেরেছে বলেই গুলশানের মতো এলাকায় অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করতে পেরেছে। একই কারণে আমাদের চেয়ে উন্নত দেশেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে হামলাকারীরা আক্রমণ করছে। আমাদের এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার ছিদ্রগুলো খতিয়ে দেখে এর পুনর্বিন্যাস করতে হবে। তবে এই প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা আমাদের স্বস্তি নাও দিতে পারে। স্বস্তি তখনই মিলবে যখন এই জঙ্গি শক্তিকে আমরা উচ্ছেদ করতে পারব এবং এখানে আমাদের একটি আক্রমণাত্মক পরিকল্পনা থাকবে। একই সঙ্গে জঙ্গি সংগঠন, জঙ্গি  নেতৃত্ব ও জঙ্গি পৃষ্ঠপোষকদের ভেঙে দিতে হবে। এতে আক্রমণও কমে আসবে।

তবে আবদুর রশিদ মনে করেন, বাংলাদেশের সমাজে বিদেশিরা জেনারেল টার্গেট নয়। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ বিদেশি হত্যার পক্ষে নয়। জঙ্গিরাই বিদেশিদের টার্গেট করছে। এ জন্য আমাদের বিদেশিদের সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। একইভাবে তাদের আস্থা দিতে হবে যে, তারা ভবিষ্যতে আক্রমণের টার্গেট হবেন না।  

এই ইস্যুতে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল মোহাম্মাদ আলী শিকদার (অব.) বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শুক্রবারের ঘটনায় জঙ্গিদের নিয়ে সারা দেশে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। জঙ্গিদের মানবতা বা কোনো ধর্ম নেই। গুলশানে হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় যে নৃশংস হামলা তারা চালিয়েছে তা অপ্রত্যাশিত নয়। এবারের হামলায় তারা মৃত্যুপণ সংকল্প নিয়েই আক্রমণ চালিয়েছে। যদি তারা শুধুমাত্র কিছু লোককে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ চালাত তাহলে ৫ মিনিটের মধ্যেই হামলা চালিয়ে পালিয়ে যেতে পারত। কিন্তু তারা মানুষকে জিম্মি করে সরকারের কাছে কিছু দাবি-দাওয়া তুলে ধরে। জঙ্গি নেতা খালেদ সাইফুল্লাহর মুক্তি ও এ ঘটনার পর তারা যাতে নিরাপদে যেতে পারে তার দাবি জানিয়েছিল হামলাকারীরা। কিন্তু তারা আগেই পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা করে ত্রাস সৃষ্টি করে। হামলার পরও যখন তারা নিজেদের দাবি জানায় তখন তাতে হামলাকারীদের ঔদ্ধত্যই প্রকাশ পায়। তবে কমোন্ডো অভিযানের মাধ্যমে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী পেশাগত দক্ষতা দেখিয়েছে। পৃথিবীতে এত অল্প সময়ে এই ধরনের অভিযান খুব কমই হয়েছে। তবে এই অভিযানে মানুষের জীবন হারানোর ঘটনা খুবই দুঃখজনক। ইতিহাস দেখলে দেখা যাবে, অন্যান্য দেশে পরিচালিত কমান্ডো অভিযানের চেয়ে এই অভিযানে তুলনামূলক আমাদের কম ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমাদের কমান্ডোরা হামলাকারীদের হত্যা করে এই অভিযানের সফল সমাপ্তি টেনেছেন। তার মতে, এর থেকে দ্রুত কোনো অভিযান পরিচালনা সম্ভব নয়। যে কোনো অভিযানের আগে পরিকল্পনা করতে হয়। আর সেই অভিযানে যাতে সাধারণের কম ক্ষয়ক্ষতি হয় সেই বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমি মনে করি মাত্র ১০ ঘণ্টায় অভিযান পরিচালনা করা প্রশংসনীয়।

এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক আরও বলেন, বাংলাদেশের জঙ্গি ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত তত্পর আছে। আমরা লক্ষ্য করছি যে, একটি চক্র প্রতিবারই বাংলাদেশে কিছু হলেই এর সঙ্গে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সম্পৃক্ততা আছে বলে মন্তব্য করে।   এ ধরনের অভিযানে সময় বেশি লাগলেও যাতে সাধারণের কম ক্ষতি করে অভিযান পরিচালনা করা যায় তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। আর তাই আমার মতে মাত্র ১০ ঘণ্টায় এত বড় অভিযান পরিচালনা করা ‘মিরাকল’। মূলত পশ্চিমা বিশ্ব বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তাদের যে ভূরাজনীতি স্বার্থ আছে তা হাসিল করার জন্য এবং বাংলাদেশ সরকারকে চাপে ফেলার জন্য বার বার দেশে আইএস আছে বলে প্রচার করে। এ জন্য তারা কখনো সূক্ষভাবে, কখনো কূটনৈতিক ভাষায় আবার কখনো ছদ্মবেশে চাপ সৃষ্টি করে চলছে। আর যুক্তরাষ্ট্র আইএস দমন করতে গিয়ে আফগানিস্তান, সিরিয়া ও লিবিয়ায় কী ঘটিয়েছে আমরা তা-ও দেখেছি। স্পষ্টভাবে এই হামলাকারীরা সারা বিশ্বে সেনসেশন তৈরির জন্য গুলশানের মতো একটি রেস্টুরেন্টে যেখানে বিদেশিদের যাতায়াত বেশি সেখানে হামলা চালিয়েছে। তারা বিদেশি হত্যা করে সারা বিশ্বকে নিজেদের অস্তিত্ব জানাতে চায়। কারণ বিদেশি হত্যার ঘটনা ঘটলেই পশ্চিমা বিশ্ব প্রতিক্রিয়া দেখাবে আর এটি জেনেই হামলাকারীরা বিদেশিদের ওপর আক্রমণ চালায়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।  

তিনি বলেন, গুলশানের কূটনৈতিকপাড়ায় চলাচলে আমরা বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখতে পাই। কিন্তু একে আরও জোরদার করতে হবে। কারণ হামলাকারীরা যখন ব্যাগে এত অস্ত্র নিয়ে ঢুকলো তখন চেকপোস্টগুলোতে কেউ টের পেল না— এ বিষয়টি আমাদের গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে। এ জন্য নিরাপত্তা রক্ষায় জড়িতদের আরও সতর্ক হতে হবে। কোনো কিছু সন্দেহ হলেই পরীক্ষা করতে হবে। যদি চেকপোস্টে এই হামলাকারীদের ঠেকানো যেত তবে প্রাথমিকভাবে সেখানে কিছু গোলাগুলি হলেও এত বড় প্রাণহানি হতো না। এ ছাড়া এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে তার জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ঘটনার পরে দ্রুত সময়ে কীভাবে সেটি নিয়ন্ত্রণ করা যায় তাও আমাদের শিখতে হবে। আমি মনে করি, এলাকাভিত্তিক গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক আরও জোরদার করতে হবে। আর চেকপোস্টগুলোতে দায়িত্বপ্রাপ্তদের আরও সতর্ক হতে হবে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow