Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ, ২০১৭

প্রকাশ : বুধবার, ১৩ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১২ জুলাই, ২০১৬ ২৩:৩৯
রাজমহলের রাজা মফিজার
শিক্ষক নিয়োগে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য । সরকারি বেসরকারি সাহায্য সহযোগিতা লোপাট
মাহমুদ আজহার ও সরকার হায়দার, গাড়াতি (পঞ্চগড়) থেকে
রাজমহলের রাজা মফিজার
অন্যের জায়গা দখল করে নিজ নামে গড়ে তোলা হয়েছে কলেজ —বাংলাদেশ প্রতিদিন

মফিজার রহমান। পঞ্চগড় সদর থানার বিলুপ্ত গাড়াতি ছিটমহলের তিনিই এখন রাজা। ওই ছিটমহলের অধিবাসী কখনই ছিলেন না তিনি। ছিটমহলের বাইরে থেকেও স্কুল-কলেজ এবং মাদ্রাসা— সবকিছুরই নিয়ন্ত্রক এই মফিজার। তার ভাই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতা। তারই ছত্রছায়ায় গাড়াতিতে চলছে মফিজারের শাসন। সরকারি-বেসরকারি সব অনুদানও লোপাটের অভিযোগ মফিজার পরিবারের বিরুদ্ধে। ছিটমহলের সব উন্নয়নের ঠিকাদারি নিয়েছেন তার ভাই যুবলীগ নেতা মখলেছার রহমান। একটি হত্যা মামলার প্রধান আসামি হয়েও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। মফিজার ও তার ভগ্নিপতি মুসলেম উদ্দিনও ওই হত্যা মামলার আসামি। তারা সবাই প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছেন। যদিও ওই মামলার শেষের দিকের চার আসামি জেলহাজতের ঘানি টানছেন। বিলুপ্ত গাড়াতি ছিটমহলবাসীর হাজারো অভিযোগ মফিজার পরিবারের বিরুদ্ধে। অবশ্য প্রকাশ্যে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। গতকাল দিনভর গাড়াতিতে সরেজমিন ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। জানা যায়, গাড়াতিতে ৭টি ছিটমহল রয়েছে। সেখানে জনসংখ্যা ২০৮১। মোট আয়তন এক হাজার একশ সতের একর। পরিবার মোট ৪২২টি। এর মধ্যে ৮১ জন হিন্দু। অধিকাংশই কৃষির সঙ্গে জড়িত। ছিটমহল থাকায় দীর্ঘদিন তারা মৌলিক নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পর এই ছিটমহলের নতুন নাম দেওয়া হয়েছে রাজমহল। দেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে বিলুপ্ত ৩৬টি ছিটমহলের মধ্যে এটি অন্যতম বৃহৎ। সেখানে উন্নয়ন কার্যক্রমও চলছে ধীরগতিতে। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ছিটমহলে প্রবেশের প্রথমই পূর্ব বাগানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আলিম মাদ্রাসা। তিন বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত ২০১৫ সালে ওই মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মফিজার রহমান। যদিও জমির মালিক ছিটমহলের সৈয়দ জামান ও আলী পরিবারের সদস্যরা। ওই মাদ্রাসায় চাকরি দেওয়া ও প্রতিষ্ঠাতার প্রলোভন দেখিয়ে তিন একর জমি মফিজারের নামে লিখে দেওয়া হয়। কিন্তু শিক্ষক নিয়োগে ওই দুই পরিবারের কাউকেই চাকরি দেওয়া হয়নি। এখন জমি দাতারা জমি ফেরত চেয়েও পাচ্ছেন না। ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ করা হয়েছে মফিজারের ভাই মোজাম্মেলকে। এ নিয়েও রাজমহলে নানা সমালোচনার ঝড় বইছে। গাড়াতির মূল সড়ক ধরে একটু ভিতরে রাজমহল উচ্চবিদ্যালয়। ওই প্রতিষ্ঠানেরও সভাপতি মফিজার। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এম এইচ বাবুল খানের তিন বিঘা জমি তিনশ টাকার স্ট্যাম্পে লিখে নেওয়া হয়। পরে ওই জমি মফিজারের নামে রেজিস্ট্রি করে দিতে বাবুলকে চাপ প্রয়োগ করা হয়। বাবুল খান এতে রাজি হননি। আইনিভাবে মোকাবিলা করে বাবুল তার জমি ফেরত নেন। পরে অন্যত্র স্কুল করেন মফিজার। সেখানেও জমি দাতাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই অভিযোগ পাওয়া গেছে মফিজার রহমান কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও। নিজের নামের কলেজের নিজেই সভাপতি। সেখানেও জমি দাতাদের সঙ্গে ছলনার আশ্রয়ের অভিযোগ মফিজারের বিরুদ্ধে। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করায় জমি দাতা স্বপন কলেজ মাঠে তার দেড় বিঘা জমিতে রোপা চাষ করেছেন। আরেক জমি দাতা শাহাবুদ্দিনও সাড়ে চার বিঘা জমি ফেরত নেওয়ার চিন্তা করছেন। তার অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের জমির পরিবর্তে অনত্র তাকে জমি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কথা রাখেননি মফিজার। তাই জমি ফেরত নেওয়ার কথাও ভাবছেন তিনি। এ ছাড়া দাতা হিসেবে আধা বিঘা জমিও দিয়েছেন শাহাবুদ্দিন। সেখানেও মফিজার যথাযথভাবে তাকে রাখেননি। অভিযোগ রয়েছে, মফিজার তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসহ অন্তত ৬০ জন স্টাফ নিয়োগ দিয়েছেন নিজের মতো করে। শিক্ষক নিয়োগবিধিও মানেননি তিনি। ম্যানেজিং কমিটিও করেছেন রাতের অন্ধকারে। নিয়োগবাণিজ্য করেছেন প্রায় তিন কোটি টাকা। সব টাকাই নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করেছেন। এ নিয়ে কেউ অভিযোগ করতে চাইলে তাদের ওপর নামছে নানা খড়গ।

হুদুপাড়া গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী সনাতনধর্মী বিজয় বর্মণ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, তার কাছ থেকেও তিন বিঘা জমি নিয়েছেন মফিজার। সেখানে গাড়াতি পুলিশ ফাঁড়ি কেন্দ্র করার কথা ছিল। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, ছেলে ও বউমাকে স্কুলে চাকরি দেওয়া হবে। কিন্তু জমি দেওয়া হলেও কোনো কিছুই পাননি বিজয় বর্মণ। চাকরির জন্য বার বার বলা হলেও এ নিয়ে এখন আর কোনো কথাই বলেন না মফিজার। জানা যায়, রাজমহলের উন্নয়নে নানা অনুদানও তসরুপ করছে মফিজার পরিবার। টিউবওয়েল, সেলাই মেশিন, বাইসাইকেল, শীতের কম্বলসহ আর্থিক অনুদানও নিজের পরিবার ও অনুসারীদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিচ্ছেন মফিজার। অথচ কাগজে-কলমে লিস্ট করা হয় গাড়াতি ছিটমহলবাসীর নামে।

বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর অভিযোগ, ছিটের অধিবাসী না হয়েও ক্ষমতার দাপটে অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় মফিজার ছিটমহলের চেয়ারম্যান হন। এরপর থেকেই তার প্রভাব বাড়তে থাকে। ছিটের অধিবাসীদের ব্যবহার করে বনে যান ছিটমহল স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা। যদিও নিজের স্বার্থকেই তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন।   এলাকাবাসীর অভিযোগ, চেয়ারম্যান হওয়ার আগে তিনি জামায়াতের রাজনীতি করতেন। এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তিনি দল বদল করেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান। যদিও আওয়ামী লীগে তার কোনো পদ-পদবি নেই। কিন্তু তার বড় ভাই মখলেছার রহমান পঞ্চগড় জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক থাকায় তার বিরুদ্ধে কেউ প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে সাহস পান না। এ ছাড়া স্থানীয় প্রভাবশালী এক সংসদ সদস্যের অনুকম্পাও পান তিনি। পঞ্চগড় সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লায়লা মুনতাজেরি দীনা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ছিটমহলে একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের ব্যাপারে সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সেখানে নিয়োগ প্রক্রিয়া কীভাবে হচ্ছে, তাও আমাদের জানা নেই। এটা কেউ ব্যক্তি বিশেষ করে থাকলে নিজ দায়িত্বেই করছেন। নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রসঙ্গে মফিজার রহমান বলেন, সবই মিথ্যা। শিক্ষক নিয়োগ প্রসঙ্গে বলেন, কেউ প্রমাণ দিতে পারবে না। আমি ছিটমহলবাসীর স্বার্থে নিজের জমি বিক্রি করে আন্দোলন করেছি। বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ করেছি। কারও কাছ থেকে কোনো অনুদান নিইনি। সরকারি-বেসরকারি অনুদান লোপাট প্রসঙ্গে বলেন, যেসব অনুদান আসছে, সবগুলোই লিস্ট করে ছিটমহলবাসীকে দেওয়া হচ্ছে। এক সময়ে জামায়াতের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা প্রসঙ্গে মফিজার বলেন, এটাও অপপ্রচার। কিছু গণমাধ্যম লিখেছে, আমি নাকি ছিটমহলে জঙ্গি প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এটারও কোনো ভিত্তি নেই।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow