Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : সোমবার, ১৮ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৭ জুলাই, ২০১৬ ২৩:০৯
খাল নয় যেন মৃত্যুকূপ
সাঈদুর রহমান রিমন
খাল নয় যেন মৃত্যুকূপ

রাজধানীর বিভিন্ন খাল, খোলা নর্দমা, অরক্ষিত নলকূপ, স্যুয়ারেজ লাইন, ডোবা-নালা নগর শিশুদের জন্য মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শাহজাহানপুরে অরক্ষিত নলকূপের পাইপে পড়ে শিশু জিহাদের মর্মান্তিক মৃত্যু, শ্যামপুরে নর্দমার বিষজলে শিশু নিরবের প্রাণহানিতেই শেষ হয়নি মৃত্যুর মিছিল।

গত বুধবার রাজধানীর মহাখালী তালতলার নালায় পড়ে করুণ মৃত্যু ঘটেছে ছয় বছরের শিশু সানজিদার। দুপুরে নালার পাড়ে খেলতে গিয়ে সানজিদা পানিতে পড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা দীর্ঘ ১৯ ঘণ্টা পর তার মৃতদেহ উদ্ধার করে। প্রতি বছরই শিশুরা সামান্য অসাবধানতায় মর্মান্তিকভাবে জীবন হারায়। তবুও মৃত্যুফাঁদগুলো কোনোভাবেই বিপদমুক্ত করার উদ্যোগ নেয় না কেউ।

নানা অব্যবস্থাপনা, দায়িত্বহীনতা, অসচেতনতায় শিশুদের জন্য ঢাকা ক্রমেই অনিরাপদ বাসস্থানে  পরিণত হতে চলেছে। যেখানে-সেখানে জলাবদ্ধতা, হাজারীবাগের বিষাক্ত ট্যানারি পল্লী, পুরান ঢাকার যত্রতত্র কেমিক্যাল কারখানা ও গুদাম, ক্ষতিকর সিসাযুক্ত ধোঁয়া-ধুলার নগরীতে সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে না আগামী প্রজন্ম। পরিবেশ বিপন্নতার বেহাল পরিস্থিতি ছাড়াও রাজধানীর পদে পদে পাতা আছে মৃত্যুফাঁদ। মহল্লার অলিগলি পর্যায়েও ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল, খোলা ড্রেন, গভীর-অগভীর খানাখন্দ, গর্ত, নিরাপত্তা বেষ্টনীবিহীন নির্মাণ কর্মকাণ্ড, নর্দমা-খালগুলো শিশুদের জন্য তো বটেই, বড়দের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকা ওয়াসা, তিতাস গ্যাস ও দুই সিটি করপোরেশনের আওতায় থাকা এসব মৃত্যুফাঁদ ওতপেতে আছে রাজধানীর রাস্তাঘাট, অলিগলির কোণে কোণে। শিশুদের জীবন কেড়ে নেওয়ার মতো অরক্ষিত পাইপের দেখা পাওয়া গেছে সচিবালয়ের কোণে। এ ছাড়া নূর হোসেন স্কয়ার সংলগ্ন সচিবালয়ের উত্তর-পূর্ব কোণে ফুটপাথের ওপর একটি মোটা আকৃতির পাইপ খোলা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। রাজধানীতে গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য ওয়াসার কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অবৈধভাবে গভীর নলকূপ স্থাপনকালে এ ধরনের মৃত্যুফাঁদ গড়ে ওঠে। গোপীবাগসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে স্যুয়ারেজ লাইন পরিষ্কার কিংবা গ্যাসলাইন মেরামত কাজ করতে গিয়ে অন্তত ১৩ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। জানা যায়, রাজধানীর আন্ডারগ্রাউন্ড লাইনগুলোতে ময়লা-আবর্জনা জমে বিষাক্ত গ্যাস  তৈরি হয়। সেসব স্থানে ওয়াসা, সিটি করপোরেশন, তিতাস গ্যাস ও বিটিসিএল কর্তৃপক্ষ আনাড়ি শ্রমিকদের নামিয়ে নানা রকম কর্মকাণ্ড চালিয়ে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজে শ্রমিকদের নিযুক্ত করা হলেও সতর্কতামূলক অক্সিজেন মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, হেলমেট পর্যন্ত সরবরাহ করা হয় না। ফলে প্রায়ই মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে। ওয়াসার কথিত বক্স কালভার্টগুলোও সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত। ফকিরাপুল-বাংলাদেশ ব্যাংক-মানিকনগর হয়ে যে বক্স কালভার্টটি বাসাবো কদমতলী পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে, এর অনেক স্থান বক্স কালভার্ট নির্মাণহীন অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। নগরীর ভাটারা থানার অদূরে ক্যামব্রিয়ান কলেজের ঠিক পেছনের ব্যস্ততম রাস্তার ওপরই বিপজ্জনক খোলা নর্দমা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বাসিন্দাদের আতঙ্কের কারণ হয়ে আছে। ভাটারার জে ব্লক, নূরেরচালা, খিলবাড়িরটেক, শাহজাদপুরের একাংশে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ড্রেন, নর্দমা, খোলা স্যুয়ারেজ ও ম্যানহোলের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। সরেজমিন দেখা যায়, রাজধানীর ওয়ারীর বলদা গার্ডেনের সামনের সড়কটির বেহাল অবস্থা। সেখানেও ম্যানহোলের ঢাকনা ভেঙে পড়ে আছে অনেক দিন ধরে। বলদা গার্ডেনে প্রবেশের মূল ফটকের ঠিক সামনে সিমেন্টের ম্যানহোলের একটি অংশ ভাঙা। বের হয়ে আছে বেশ কয়েকটি রড। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার এক কর্মকর্তা বলেন, মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজে ভারী ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার হওয়ায় এসব যন্ত্রের চাপ বক্স ড্রেনগুলো সহ্য করতে পারছে না। সেগুলো ভেঙে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কাজ করতে গিয়ে কোনো ড্রেন, ম্যানহোল বা ড্রেনবক্স ভেঙে ফেললে সেগুলো মেরামত করে দেবে, নইলে ক্ষতিপূরণ দেবে। আমরা সেটা মেরামত করব। কিন্তু বর্তমানে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এলজিইডি কোনো ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না। রাজধানীর ইস্কাটনে ইস্পাহানি মহিলা কলেজের বিপরীতে শামসুদ্দীন ম্যানশনের পাশের মূল সড়ক সংলগ্ন গলির ঠিক মাথায় দেখা যায় আনুমানিক চার থেকে পাঁচ ফুট গভীরের একটি গর্ত। গর্তটির ভিতরে ময়লা ও নোংরা পানি। গর্তের পাশ দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে পথ চলে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। মৌচাক মার্কেটের পাশেই গোল্ডেন টাওয়ারের সামনে প্রায় চার মাস ধরে খোলা অবস্থায় আছে আরেকটি গর্ত। ডিএসসিসি ও ঢাকা ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, শুধু ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও ঢাকা ওয়াসার মোট ৩২ হাজার ৫৯৮টি ম্যানহোল রয়েছে। এর মধ্যে ডিএসসিসির ১৪ হাজার ২৪০টি ও ওয়াসার ১৮ হাজার ৩৫৮টি ম্যানহোল রয়েছে। ডিএসসিসির খাতাপত্রে মাত্র ৩৪টি ও ওয়াসার রেকর্ডে মাত্র ৫৭টি ম্যানহোলের কভার নেই বলে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু ওই হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। সরেজমিন দেখা গেছে, অন্তত অর্ধেক ম্যানহোলই পড়ে আছে ঢাকনাবিহীন অবস্থায়। ডিসিসি ও ওয়াসা ছাড়াও বাংলাদেশ টেলি কমিউনিকেশন কোম্পানি (বিটিসিএল) ও তিতাস গ্যাস কোম্পানির ম্যানহোল রয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নানা সংযোগ লাইন নির্মাণকালেও বিভিন্ন স্থানে ম্যানহোল  তৈরি হয়েছে। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, নগরীর ফকিরাপুল, মতিঝিল, নয়াপল্টন, পুরানা পল্টন, মালিবাগ, মগবাজার, রামপুরা, বাড্ডা, বাসাবো, গোড়ান, তালতলা, শান্তিনগর, মোহাম্মদপুর, আজিমপুর, রাজারবাগ, মুগদা, জুরাইন, গোপীবাগ, শহীদবাগ, কদমতলা, সবুজবাগ, লালবাগ, শহীদনগর, ইসলামবাগ, চকবাজার, নয়াবাজার, সূত্রাপুরসহ পুরান ঢাকার সরু অলিগলির অধিকাংশ রাস্তার ম্যানহোলে ঢাকনা নেই। তা ছাড়া রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান ও ধানমন্ডির রাস্তাগুলোর অধিকাংশে ম্যানহোলেরও ঢাকনা নেই। সেখানকার বাসিন্দারা নিজ উদ্যোগে লাঠির মাথায় লাল কাপড় খণ্ড লাগিয়ে ম্যানহোলগুলোতে টানিয়ে রাখেন। ড্রেন, খোলা নর্দমা, ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল কিংবা গভীর পাইপ-ই শুধু যে শিশুসহ পথচারীদের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে তা নয়, মৃত্যুর হাতছানি আছে আরও অনেক। বাসাবাড়ির বারান্দা বা ঠিক গেটের সামনেই বিপজ্জনকভাবে ঝুলে থাকে বৈদ্যুতিক তার, জনবহুল রাস্তার মাঝেই খোলা আছে জোড়াতালির বিদ্যুৎ সংযোগ, ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল— এমন হাজারো বিপদ যেন পদে পদে।

up-arrow