Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭
প্রকাশ : সোমবার, ১৮ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৭ জুলাই, ২০১৬ ২৩:১৭
গুলশান হামলা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
গোয়েন্দা রিপোর্ট আগেই আমাদের হাতে ছিল
নিজস্ব প্রতিবেদক

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, গুলশান এলাকায় কিছু হতে পারে এমন গোয়েন্দা রিপোর্ট আগে থেকেই আমাদের হাতে ছিল। রেস্টুরেন্টে জিম্মি ঘটনার পর আধা ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ বাহিনী উদ্ধার অভিযান চালাতে পারত। কিন্তু বিপথগামীদের অবস্থান জানতেই অপেক্ষা করতে হয়েছে। গতকাল রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও মালিকদের সঙ্গে ‘জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক’ এ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। এতে আরও বক্তব্য দেন শিক্ষা সচিব সোহরাব হোসাইন, র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক, ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম প্রমুখ। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ, নর্থ সাউথের উপাচার্য অধ্যাপক আতিকুল ইসলাম, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেন, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল মান্নান, চট্টগ্রামের পোর্ট সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এনামুল হক শামীম, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মেহেদী হাসান প্রামাণিক (অব.), স্কলাসটিকা স্কুলের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাওসার আহমেদ (অব.), ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাদেক খান, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ, কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসাইন প্রমুখ বক্তব্য দেন। বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এতে অংশ নেয়।

আসাদুজ্জামান খান আরও বলেন, এদেশের মানুষ জঙ্গিবাদ পছন্দ করে না। এর বিরুদ্ধে মানুষ অবস্থান নিয়েছে। জঙ্গিবাদ রোধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। স্কলাসটিকা ও নর্থ সাউথে পড়লেই আগে ভাবা হতো ভবিষ্যতে ভালো কিছু করবে। কিন্তু কিছু বিপথগামী তরুণের দিকে তাকিয়ে মাথা হেঁট হয়ে যায়। সবাইকে অনুরোধ জানাই আমাদের তরুণরা যাতে হারিয়ে না যায় সে ব্যবস্থা নিন। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নর্থ সাউথ উদ্যোগ নিয়েছে। আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। এদেশের মানুষ ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। গুলশানের হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে আমাদের হাতে আগে থেকেই গোয়েন্দা রিপোর্ট ছিল। রেস্টুরেন্টে জিম্মি ঘটনার পর আধা ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ বাহিনী উদ্ধার অভিযান চালাতে পারত। কিন্তু বিপথগামীরা কী অবস্থানে রয়েছে সেটি জানতেই অপেক্ষা করতে হয়েছে। এরপরেও সকালে মাত্র ১৩ মিনিটের কমান্ডো অভিযানে অপারেশন সফল হয়েছে। এদেশের মানুষ জঙ্গিবাদ পছন্দ করে না। এর বিরুদ্ধে মানুষ অবস্থান নিয়েছে। জঙ্গিদের জানাজাতেও অংশ নেয়নি কেউ। তরুণদের উদ্দেশে বলতে চাই, পরিবার-পরিজন থেকে শুরু করে বিপথগামীদের সবাই ঘৃণা করে। কেউ আশ্রয়-প্রশ্রয়ও দিতে চায় না। তোমরা কেউ বিপথগামীদের পথে হাঁটবে না। বিপথগামীরা যেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। এদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। মন্ত্রী বলেন, তারা কোথায় অবস্থান করছে তা সব জানা আছে আমাদের। আমরা কঠোর হতে চাই না। গুলশান ট্র্যাজেডি আমাদের নতুন অভিজ্ঞতা। জঙ্গিদের রোধ করতে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, জঙ্গিবাদ দমনে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠন করা হবে, যাতে জঙ্গিবাদে কেউ সম্পৃক্ত হতে না পারে। শিক্ষার্থীদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ভালো মানুষ হতে হবে। নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন এবং জনগণের প্রতি সহনশীল এমন মানুষ গড়ে তুলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানান মন্ত্রী। নাহিদ বলেন, মানুষ হত্যা গুনাহের কাজ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মালিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শিক্ষায় মুনাফার কোনো সুযোগ নেই। এটি সমাজসেবার অংশ। এমন উদ্দেশ্য থাকলে অন্য কোথায় গিয়ে বিনিয়োগ করুন। বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে হলে অবশ্যই আইন মেনে চলতে হবে। কিন্তু কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক এ আইন মানতে চান না। এভাবে আর ক্যাম্পাস সচল রাখা যাবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন নুরুল ইসলাম নাহিদ। সভার শুরুতে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে এতে বেশ কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এগুলোর মধ্যে শিক্ষক-ছাত্র সমন্বয়ে জঙ্গিবাদবিরোধী কমিটি গঠন, সহশিক্ষা কার্যক্রমের ব্যবস্থা করা, প্রতিষ্ঠানের স্থান চিহ্নিত করে নজরদারি বাড়ানো, মসজিদ-মাদ্রাসা নজরদারিতে রাখা, অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা, লাইব্রেরিতে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করে এমন বই আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা, বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী গবেষণা কার্যক্রম চালানো ইত্যাদি। ইউজিসি চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান বলেন, প্রচলিত ধারণা থেকে ভাবা হতো মাদ্রাসা থেকে পড়াশোনা করে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয় শিক্ষার্থীরা। কিন্তু বর্তমানে এটি প্রজন্মেও সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষক দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস পড়াচ্ছে উল্লেখ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, এদেশেই অনেক ইতিহাস পড়ানোর মতো পণ্ডিত রয়েছেন। তিনি বলেন, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস বাধ্যতামূলকভাবে পড়াতে হবে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আতিকুল ইসলাম বলেন, যারা জঙ্গিবাদে জড়াচ্ছেন তাদের প্রতি আমরা ঘৃণা ও নিন্দা জানাই। নর্থ সাউথ তাদের ‘ক্যান্সার’ অপারেশন করে ফেলবে। নিষিদ্ধ সংগঠনের বই থাকার অভিযোগের পর লাইব্রেরি ‘পরিষ্কার’ করা হয়েছে। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় সিসি ক্যামেরার আওতায় রয়েছে। প্রেয়ার রুম কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে রয়েছে। নর্থ সাউথ সরকারের সব সিদ্ধান্ত মেনে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সবার সহযোগিতায় আমরা সমস্যা সমাধান করব। সাম্প্রতিক ঘটনায় নর্থ সাউথ ইমেজ প্রবলেমে ভুগছে। জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র ও শিক্ষকের নাম এসেছে। জঙ্গিবাদকে জীবাণু উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে মাধ্যমেই তা এ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করুক না কেন এটি আমাদের প্রতিরোধ করতেই হবে। বাসায় গিয়ে সন্তানরা ইন্টারনেটে কোথায় সার্ফিং করছে সে ব্যাপারে অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে। র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, দেশের এ ক্রান্তিকালে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য। আগে দেখেছি প্রান্তিক সমাজ থেকে জঙ্গিবাদে আকর্ষণ ঘটত তরুণদের। অথচ এখন এর বিপরীত ঘটছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে কোন বিষয়কে ফোকাস করা হচ্ছে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, কীভাবে তরুণরা দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছে। জঙ্গিদের ইঞ্চি ইঞ্চি করে খুঁজে বের করতে হবে। তিনি বলেন, পেছন থেকে কারা খেলছেন, আমরা জানি। এই ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর স্বার্থে, ব্যক্তি স্বার্থে দানব নিয়ে  খেলছেন। দানবের হাতে আপনারা নিশ্চিহ্ন হবেন। সুফিদের দেশ, সাধকদের দেশ, বাউলদের দেশ, ফকিরের দেশ, সন্ন্যাসীদের দেশ, রবীন্দ্রনাথের দেশ, নজরুলের দেশ, বঙ্গবন্ধুর দেশে এগুলো (জঙ্গি তত্পরতা) হবে না। সুফি সাধকরা এদেশে ইসলাম প্রচার করে গেছেন। এদেশের মানুষ শান্তিপ্রিয়। বাংলাদেশের মানুষ ফিনিক্স পাখির মতো। অ্যাশ থেকে পুনর্জন্ম হয় তাদের। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কীভাবে শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, একজন শিক্ষক কীভাবে বিপথগামীদের বাড়িতে স্থান দেন? পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেন, বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সেখান থেকে বাংলাদেশও রেহাই পায়নি। দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে তারা। দেশের উন্নয়নে বাধার সৃষ্টি করছে। আর এতে তরুণদের ব্যবহার করছে তারা। আগে দেখা গেছে মাদ্রাসার ছাত্ররা জঙ্গিবাদে আসত এখন ইংলিশ মিডিয়াম ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এসব কাজে জড়িয়ে পড়ছে। জঙ্গিবাদ নিয়ে সরকার জিরো টলারেন্সে রয়েছে। নতুন করে জঙ্গিবাদে যাতে কাউকে রিক্রুট করতে না পারে সে ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি আমাদের সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।

up-arrow