Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ২০ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৯ জুলাই, ২০১৬ ২৩:২২
হুমায়ূনতীর্থে ফুলেল শ্রদ্ধা
নিজস্ব প্রতিবেদক ও গাজীপুর প্রতিনিধি নুহাশপল্লী (গাজীপুর) থেকে
হুমায়ূনতীর্থে ফুলেল শ্রদ্ধা
নুহাশপল্লীতে গতকাল বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি হুমায়ূন আহমেদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় দুই শিশুপুত্র নিষাদ ও নিনিত

নুহাশপল্লীর চারদিকে যেন বিষাদের কালো রেখা। চার বছর পেরিয়ে গেছে অথচ প্রিয় লেখক হারানোর বেদনায় আজও প্রকৃতিতে বেদনার ছাপ। সকাল থেকে আকাশে বৃষ্টি। সেই দিনের মতো, যেদিন তিনি চিরবিদায় নিয়েছিলেন পৃথিবী থেকে। চারদিকে হিমু, মিসির আলী, শুভ্র আর রূপাদের ভিড়। প্রিয় লীলাবতী দিঘির স্বচ্ছ জল, ভূতবিলাস, বৃষ্টিবিলাস, ঔষধি বাগান, লিচুতলা সবকিছু সেই আগের মতোই আছে। শুধু নেই হুমায়ূন আহমেদ। বৃষ্টিমুখর মঙ্গলবার নন্দিত এই কথাসাহিত্যিকের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী পালন করছেন তার পরিবার, প্রকাশক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, ভক্তরা। নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সংগঠন লেখকের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী পালন করেছে। নুহাশপল্লীর সমাধিস্থল ফুলে ফুলে ভরে ওঠে হিমু, মিসির আলী, শুভ্র ও রূপাদের শ্রদ্ধায়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাজীপুরের পিরুজালী গ্রামের নুহাশপল্লীতে বাড়তে থাকে ভক্তের ভিড়। সকাল থেকেই তার সমাধিস্থল ঘিরে চলতে থাকে বিশেষ দোয়া প্রার্থনা, কোরআন পাঠ। প্রথমে হুমায়ূন আহমেদের ভাই জনপ্রিয় লেখক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, লেখক ও কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব, বোন সুফিয়া হায়দার, মমতাজ শহীদ ও রোখসানা আহমেদ  সন্তানদের নিয়ে কবর জিয়ারত করেন। ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘সকাল থেকে টিপ টিপ বৃষ্টি হচ্ছে, আমি খুব খুশি হয়েছি কারণ হুমায়ূন ছিলেন বৃষ্টিপ্রিয় মানুষ। ’ তিনি বলেন, তার,যে অভাব, সে অভাব পূরণ করা তো সম্ভব না। তিনি যেভাবে এদেশের একেবারে সবধরণের মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করতে পেরেছেন আমার মনে হয় না আর কেউ এভাবে তার মতন করে পেরেছেন । কবর জিয়ারত শেষে আহসান হাবীব সাংবাদিকদের বলেন, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে নুহাশপলস্নী ছাড়াও অন্যত্র পারিবারিকভাবে মিউজিয়াম করার ইচ্ছা আছে। তার যত স্মৃতি আছে যাতে ধরে রাখা যায়। নুহাশ পলস্নী তো আছেই, এর বাইরে যদি কোথাও করা যায় এরকম পরিকল্পনা আমাদের আছে। পরে হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন দুই পুত্র নিষাদ ও নিনিতকে নিয়ে সমাধিস্থলে  দোয়া করেন। সবার সঙ্গে নিষাদ ও নিনিত এ সময় বাবার সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। শাওন এ সময় সাংবাদিকদের বলেন, হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্নের মধ্যে ছিল সামগ্রিক বাংলাদেশ, তারপর ছিল নিজস্ব স্বপ্ন। সবচেয়ে বেশি মিস করি সেই বলিষ্ঠ কণ্ঠ। ’  হুমায়ূন স্মৃতি জাদুঘর সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, প্রাথমিকভাবে হুমায়ূন স্মৃতি জাদুঘরের স্থান ঠিক করা হয়েছে নুহাশপল্লীতে; যাতে ভক্তরা নুহাশে এসেই তার ব্যবহৃত প্রিয় জিনিসগুলো দেখতে পারেন, খুব সহজে জানতে পারেন প্রিয় লেখক সম্পর্কে। আবেগী কণ্ঠে বলেন, সবখানেই হুমায়ূন আহমেদের উপস্থিতি টের পাই। সবখানেই হুমায়ূন আছেন, থাকবেন।   ট্রাস্ট্রের ব্যাপারে শাওন বলেন,  ট্রাস্টের কাজের অগ্রগতি কিছুটা হয়েছে। সম্পন্ন হলে সবাইকে জানাব। আমার  চেষ্টা থাকবে হুমায়ূন আহমেদের সমস্ত কিছু যেন একটা ট্রাস্টের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আমি মনে করি, হুমায়ূন আহমেদ  দেশের সবার এবং পরিবারের সবার।   সেটা যদি একটি ট্রাস্ট গঠন করে হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্নগুলি পূরণের জন্য যদি চেষ্টা করে যাই তাহলে অনেক সহজ হবে। যে কাজটি একা আমার বা আমার ছোট ছোট দুটি সন্তানকে নিয়ে সম্ভব হবে না। পরিবারের  লোকজন এবং হুমায়ূন আহমেদকে যারা ভালবাসেন  সেসব শ্রদ্ধেয়জনদের নিয়ে যদি  ট্রাস্ট গঠন করি তবে তা সহজ হয়ে ওঠবে। শাওন বলেন, হুমায়ূন আহমেদ আমাদের দেশের জন্য এবং বাংলা ভাষাভাষি মানুষের জন্য সম্পদ।   বাবার কবরে ফুলেল শুভেচ্ছার পর নিষাদ ও নিনিত দুটি খেজুর গাছ রোপণ করে। এ সময় শাওনের পাশে ছিলেন তার বাবা মোহাম্মদ আলী, মা তহুরা আলী। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ভক্তদের সংগঠন ‘হিমু পরিবার’ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। এর মধ্যে ছিল সকালে হুমায়ূন আহমেদের সমাধিতে হলুদ পাঞ্জাবি ও নীল শাড়ি পরে শ্রদ্ধা নিবেদন, ক্যান্সার সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ, সেমিনার, রক্তদান, হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল এবং আলোচনা সভা। এ ছাড়াও নুহাশপল্লী ও আশপাশের এলাকায় রক্তদান কর্মসূচি আয়োজন করে হিমু পরিবার। নুহাশপল্লীর ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম বুলবুল জানান, হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এলাকার প্রায় ৫০০ এতিমকে তার প্রিয় খাবার ভাত, গরুর মাংস, খেসারির ডাল দিয়ে দুপুরে আপ্যায়ন করা হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০১২ সালের ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ২৪ জুলাই তার লাশ নিজের গড়া নুহাশ পলস্নীর লিচুতলায় দাফন করা হয়। জনপ্রিয় এই লেখক ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর  নেত্রকোণার কুতুবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow