Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শুক্রবার, ২২ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২১ জুলাই, ২০১৬ ২৩:৩৩
দক্ষিণ এশিয়ায় স্যানিটেশন ব্যবস্থায় নেতৃত্বে বাংলাদেশ
ভারত, পাকিস্তান নেপালের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশে স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় খোলা আকাশের নিচে বা খোলা স্থানে মলত্যাগ করার হার অনেকাংশে কমে এসেছে। বর্তমানে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র এক শতাংশ, যাদের বাড়িতে টয়লেট ব্যবহার করার সুযোগ নেই তারাই খোলা স্থানে মলত্যাগ করছেন। সেই হিসাবে দেশের প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার মানুষ এখনো খোলা স্থানে মলত্যাগ করছেন। স্থানীয় সরকার বিভাগের স্যানিটেশনবিষয়ক কনফারেন্সের ষষ্ঠ দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশের অংশের তথ্যে এসব জানা যায়। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন— ভারত, পাকিস্তান ও নেপাল এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। সেই হিসেবে স্যানিটেশন ব্যবস্থায় দক্ষিণ এশিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। সরকারি জরিপ বলছে, ২০০৩ সালে খোলা স্থানে মলত্যাগের হার ছিল ৪২ শতাংশ। এখন তা কমে মাত্র এক শতাংশে নেমে এসেছে। যা কিনা দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। ভারতে এখনো প্রায় ৫৯৫ মিলিয়ন মানুষ যা দেশটির মোট জনসংখ্যার অর্ধেক টয়লেট ব্যবহার করেন না। পাকিস্তানে ৪১ মিলিয়ন মানুষ যা দেশটির মোট জনসংখ্যার ২১ শতাংশ মলত্যাগে টয়লেট ব্যবহার করেন না এবং নেপালে ১৫.৫ মিলিয়ন মানুষ যা দেশটির মোট জনসংখ্যার ৫৪ শতাংশ টয়লেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত। একমাত্র শ্রীলঙ্কা এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো ভালো অবস্থানে রয়েছে। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকার শুধু পলিসি তৈরি ও প্রতিশ্রুতি দেয়নি। এর বাস্তবায়নে বাজেট বরাদ্দও বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশ বিশ্বের ১৯২টি দেশের সঙ্গে ২০৩০ সালে এ খাতে স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য কাজ করছে। কিশোরগঞ্জের গোবোরিয়া গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ্ব রোকেয়া বেগম তার জন্মের পর ৫০ বছরে কখনো বাড়ির ভেতর টয়লেট ব্যবহার করেননি। মলত্যাগ করার জন্য তাকে দিনের আলো নেভার অপেক্ষায় থাকতে হতো। রোদ-বৃষ্টি কিংবা অসুস্থ হলেও মলত্যাগের জন্য রোকেয়াকে বাড়ির পাশের ক্ষেত বা জঙ্গলে যেতে হতো। কিন্তু সরকারের গৃহীত উদ্যোগে রোকেয়ার বাড়িতে এখন ছোট্ট একটি টয়লেট আছে। বাংলাদেশের গরিব পরিবারগুলো যেখানে আগে রাস্তার পাশে কিংবা খোলা স্থানে মলত্যাগ করত তা এখন আর করে না। স্থানীয় সরকারের গৃহীত উদ্যোগের ফলে এই দৃশ্যের পরিবর্তন হয়েছে। গরিব মানুষগুলোর বাড়িতে স্যানিটারি ব্যবস্থা করায় তারা এখন মলত্যাগের জন্য আর বাইরে যান না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) অর্জনের জন্য পুরো দেশকেই স্যানিটেশন ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। ফলে দেশজুড়ে রোকেয়ার মতো লাখ লাখ মানুষ যারা স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে রেখে খোলা আকাশের নিচে মলত্যাগ করতেন তাদের আর মলত্যাগের জন্য রাতের অপেক্ষা করতে হয় না। তারা আরও জানান, খোলা স্থানে মলত্যাগের ফলে পরিবেশ দূষণ যেমন— পানিদূষণ হয় এবং নানান রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। বিশেষ করে বিশুদ্ধ খাবার ও পানির অভাবে বাংলাদেশে ডায়রিয়ায় প্রতি বছর এক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের এক জরিপে জানা যায়, ২০০৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ ৭ শতাংশ কমেছে। যা নির্দেশ করে স্যানিটেশন ব্যবস্থা আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। এ ছাড়া বাড়ির ভেতর একটি স্যানিটেশন টয়লেট থাকার মাধ্যমে একজন মানুষের সামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। এমনকি স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারের বাজেটও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে পানি ও স্যানিটেশন খাতে যেখানে বরাদ্দ ছিল ২৮.২৪ বিলিয়ন টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১.১৩ বিলিয়ন টাকা। এ ছাড়া দাতা সংস্থা, এনজিও ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে মিলে শক্তিশালী স্যানিটেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলাদেশ সরকারও বেশ উদ্যোগী। বিশেষ করে ইউনিসেফ, ডিএফআইডি, ডব্লিউএইচও, বিশ্ব ব্যাংক, ওয়াটার এইড বাংলাদেশ ও ব্র্যাকের সঙ্গে স্থানীয় সরকার বিভাগ বিভিন্ন পানি ও স্যানিটেশন প্রকল্পে কাজ করছে। যদিও বাংলাদেশ স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে দক্ষিণ এশিয়ার রোল মডেল কিন্তু শতভাগ স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা একটি চ্যালেঞ্জ। কারণ কিছু এলাকায় পানি স্বল্পতা, দুর্গম এলাকা যেমন পাহাড়ি এলাকা, চর ও চা বাগানে স্যানিটেশন ব্যবস্থা পৌঁছানো দুষ্কর। এসব এলাকায় মাত্র ৩৫.৮ শতাংশ পরিবার স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন করেছে। একইভাবে শহরে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কঠিন। তবে সরকার দুর্গম ও অবহেলিত অঞ্চলের মানুষের জন্য স্যানিটেশন সুবিধা পৌঁছে দিতে ১৪৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকার প্রকল্প নিয়েছে। দেশের ৬৪ জেলায় জাতীয় স্যানিটেশন (তৃতীয় পর্যায়) নামের এ প্রকল্পটি ২০১৯ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow