Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : রবিবার, ২৪ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৩ জুলাই, ২০১৬ ২৩:২৬
গুলশান হামলায় ‘নেতিবাচক’ প্রভাব পোশাক খাতে
জিন্নাতুন নূর
গুলশান হামলায় ‘নেতিবাচক’ প্রভাব পোশাক খাতে

গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার ‘নেতিবাচক’ প্রভাব পড়েছে পোশাক খাতে। আন্তর্জাতিক বড় ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কয়েকটি এরই মধ্যে বাংলাদেশে তাদের কর্মকর্তাদের সফর স্থগিত করেছে। কেউ আবার বাংলাদেশে তাদের কর্মীদের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে। কেউ কর্মকর্তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে। তবে ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের অনেকেই বাংলাদেশে না এসে সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ে ক্রয়াদেশ ও আলোচনার জন্য বাংলাদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। আর পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র নেতারা বলছেন, গুলশান হামলায় নেতিবাচক প্রভাব অবশ্যই পোশাক খাতের ওপর পড়েছে। কিন্তু শিগগিরই বড় কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলে এবং ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে পারলে এ খাতে বিদেশি অর্ডার কমবে না বলে তারা আশাবাদী।

গুলশান ঘটনার পর জাপানের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান ইউনিকোলো কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের সফর স্থগিত করেছে। এর বাইরে এইচ অ্যান্ড এম বাংলাদেশে তাদের কর্মীদের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ইউরোপের বৃহৎ আরেকটি ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান এল কোর্তে ইংগেলস বাংলাদেশ থেকে তাদের আট বিদেশি কর্মকর্তাকে সরিয়ে নিয়েছে এবং তারা আগামী দুই মাস বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন। এ সাপেক্ষে এই কর্মকর্তাদের পুনরায় বাংলাদেশে পাঠাবেন কিনা তার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এমনকি বিক্রেতাদের সঙ্গে এই কোম্পানির প্রতিনিধিদের ঢাকায় যে মিটিং হওয়ার কথা ছিল তার স্থান পরিবর্তন করে এখন তা হংকংয়ে করা হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকার এক পোশাক কারখানার মালিক এই প্রতিবেদককে জানান, গুলশান হামলার ঘটনায় এরই মধ্যে তিনি ফ্রান্সের একটি ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান ‘সেলিও’-এর সাড়ে ৩০ লাখ টাকার অর্ডার হারিয়েছে। সেই মালিক আরও জানান, ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানটির ১৩ জুলাইয়ে বাংলাদেশে আসার কথা ছিল। তবে হামলার ঘটনায় তারা সফর বাতিল করে। কিন্তু তিনি ঢাকার বাইরে অন্য কোনো দেশে মিটিং করার জন্য ‘সেলিও’-কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করলেও তারা জানান, এরই মধ্যে তারা চীনা আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে অর্ডারটি দিয়ে দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, গুলশানের ঘটনায় নিহত ১৭ বিদেশির মধ্যে ৯ জন ইতালির নাগরিকই গার্মেন্ট ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ ছাড়া পোশাক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আছেন প্রায় ২০ হাজার নাগরিক, যার ১৫ হাজার নিয়মিত বাংলাদেশে আসা-যাওয়ার মধ্যে আছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মূলত জুলাই-আগস্টে ক্রেতাদের গ্রীষ্মকালীর ক্রয়াদেশ শুরু হয়। এ সময় মোট অর্ডারের ৬০ শতাংশ তারা বাংলাদেশে দিয়ে থাকেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির জন্য যদি ১৫ থেকে ২০ শতাংশ অর্ডার অন্য দেশে চলে যায় তবে তার পরিমাণ দাঁড়াবে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি ডলার। বাংলাদেশের বায়িং হাউস পরিচালনাকারী সংগঠন—বিজিবিএ’র নেতারা সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে আগামী মৌসুমে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি ডলার মূল্যের ক্রয়াদেশ হারাতে পারেন বলে আশঙ্কাও প্রকাশ করছেন। এ ছাড়াও বড়দিনের অর্ডার নেওয়ার সময় চলছে। বছরের এই সময় পোশাক মালিকরা সাধারণত অর্ডার নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির জন্য এবার বড়দিন উপলক্ষে বিক্রেতারা কাঙ্ক্ষিত অর্ডার পাবেন কিনা তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে পোশাক খাতে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও মিয়ানমারও বাংলাদেশের দামে পোশাক রপ্তানি করে বিদেশি বাজার দখল করতে চাইছে; যা বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য নেতিবাচক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখন পর্যন্ত বিদেশি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার মতো বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামীতে অর্ডার কমে গিয়ে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা আছে। এ ক্ষেত্রে যে ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলো বেশি অর্ডার দিত তারা হয়তো অর্ডার কমিয়ে দিতে পারে এই ভয় আছে। বিজিএমইএ’র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ফারুক হাসান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বিদেশি ক্রেতারা কিছুটা শঙ্কিত। আমরা পরিস্থিতি সামাল দিতে এরই মধ্যে ক্রেতা, অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সভুক্ত ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠান সবার সঙ্গে বৈঠক করেছি। স্বাভাবিকভাবেই বিদেশি ক্রেতারা ভীত হয়ে পড়েছেন, আমরা তাদের আস্থা তৈরিতে কাজ করছি। সরকারের সঙ্গে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের চেষ্টা করছি। এজন্য মন্ত্রী ও ক্রেতাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠকও করছি। যে ক্রেতারা বাংলাদেশে সফর নিয়ে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য সিঙ্গাপুর, হংকং ইত্যাদি দেশে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠিয়ে দিচ্ছি। এতে সাময়িকভাবে খরচ বৃদ্ধি পেলেও আমাদের ক্রয়াদেশ যাতে অন্য কোনো দেশে না যায় সেজন্য সচেতন আছি। এমনকি ক্রেতারা যাতে অন্য দেশে আলোচনার জন্য সহজে ভিসা পান তার জন্য অ্যাম্বাসিগুলোর সহায়তাও নিচ্ছি। ’ অবশ্য তিনি জাপানের ইউনিকোলোর প্রতিনিধিদের সফর বাতিল করার বিষয়টি স্বীকার করেন।

up-arrow