Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ২১ জানুয়ারি, ২০১৭

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৬ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৫ জুলাই, ২০১৬ ২৩:৪০
বন্যায় পানিবন্দী লাখো মানুষ, জনপ্রতিনিধিদের খবর নেই
নিজস্ব প্রতিবেদক
বন্যায় পানিবন্দী লাখো মানুষ, জনপ্রতিনিধিদের খবর নেই
টানা বর্ষণে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে দেশের লাখ লাখ মানুষ। ছবিটি গতকাল জামালপুর ইসলামপুরের গুঠাইল প্রধান সড়ক এলাকা থেকে তোলা —বাংলাদেশ প্রতিদিন

উজানে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বন্যাকবলিত ১২ জেলায় লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছেন। তাদের অভিযোগ, এই দুঃসময়ে তারা দায়িত্বশীল মহলের তেমন কোনো সহায়তা পাচ্ছেন না। এমনকি জনপ্রতিনিধিদেরও খোঁজ মিলছে না। ফলে তাদের মানবেতর এবং অসহায় জীবনযাপন করতে হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, পানিপ্রবাহের ৯০টি পয়েন্টের মধ্যে ১৭টিতেই বিপদসীমার ওপর দিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা সংলগ্ন নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ জেলা এবং গঙ্গা-পদ্মা সংলগ্ন রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর জেলা, একই সঙ্গে সুরমা-কুশিয়ারা সংলগ্ন সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আবহাওয়া পূর্বাভাস সূত্র বলছে, শ্রাবণের ১০ দিন পার হয়েছে। বর্ষার এমন সময়ে দেশের সর্বত্র মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণ চলছে। এর মধ্যে দেশের উজানেও রয়েছে ভারি বর্ষণ। এর প্রভাবে এক সপ্তাহ ধরে দেশের উত্তরাঞ্চলে বন্যা শুরু হয়। আবহাওয়া অধিদফতরও বলছে, আরও অন্তত তিন দিন ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকবে। উজানেও বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী জানান, উজানের ঢলে বন্যার বিস্তার ঘটছে। এখন পর্যন্ত ১২টি জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, গঙ্গা-পদ্মা ও সুরমা-কুশিয়ারা নদ-নদীগুলোর পানি সমতলে বাড়ছে। ভারতের আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্যমতে, আরও দুই দিন উজানে বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে বুধবার পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে, তবে আজকের পর সুরমা-কুশিয়ারায় পানি কমতে পারে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা জানান, উত্তরের বন্যায় কয়েক লাখ লোক পানিবন্দী রয়েছেন। তাদের জন্য ত্রাণসহায়তা অব্যাহত রয়েছে। মাঠপর্যায়ের ক্ষয়-ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য্য নিচ্ছি আমরা। বিশুদ্ধ পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধসামগ্রী ও শুকনা খাবার সরবরাহের উদ্যোগ চলছে। এদিকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর অনুযায়ী, গতকাল সকালে ধরলা নদীর কুড়িগ্রাম, তিস্তা নদীর ডালিয়া, ঘাঘট নদীর গাইবান্ধা, ব্রহ্মপুত্রের চিলমারী, যমুনার বাহাদুরাবাদ, সারিয়াকান্দি, কাজিপুর ও সিরাজগঞ্জ, গুর নদীর সিংড়া, আত্রাই নদীর বাঘাবাড়ি, ধলেশ্বরীর এলাসিন, পদ্মার গোয়ালন্দ ও সুরেশ্বর, সুরমা নদীর কানাইঘাট ও সুনামগঞ্জ এবং কংস নদীর জারিয়াজঞ্জাইল ও তিতাস নদীর ব্রাহ্মণবাড়িয়া পয়েন্টে বন্যার পানি বিপদসীমার ২ সেন্টিমিটার থেকে ১০৩ সেন্টিমটার পর্যন্ত ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। লালমনিরহাট : ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে তিস্তা ও ধরলা। কয়েক দিনের ভারি বর্ষণের সঙ্গে উজানের ঢলে তিস্তা বিপদসীমার ২২ সেন্টিমিটার ও ধরলা বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভারত থেকে আরও তীব্রগতির ঢল বাংলাদেশ অংশে প্রবেশ করায় এই দুই অববাহিকায় রেড অ্যালার্ট জারি করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ধরলার প্রবল স্রোতে জেলা কুলাঘাট পয়েন্টে ৩০০ মিটার বেড়িবাঁধ ধসে গিয়ে ১১টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন চরের লাখো মানুষ। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, তিস্তা ব্যারাজের উত্তরে ফ্লাডফিউজ এলাকায় টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে লালঝাণ্ডা। উজানের তীব্র পানিরপ্রবাহে তিস্তা ব্যারাজের ফ্লাডফিউজটি বিধ্বস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে ফ্লাডফিউজের ওপর দিয়ে যানবাহনসহ সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নীলফামারী : তিস্তায় বিলীন হওয়া শত শত পরিবার ঠিকানা খুঁজে না পাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছে। দিনযাপনে আশ্রয় নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) গাইডবাঁধ, গ্রোয়েনবাঁধ ও সিলট্রাবে কেউবা আবার খোলা আকাশের নিচে। উজানের ঢল আর ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে ফুলেফেঁপে তিস্তা রাক্ষুসে নদীতে পরিণত হয়েছে। গিলে খাচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম আবাদি জমি, বসতভিটা আর নতুন নতুন এলাকা। বিলীন হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি ক্লিনিক। ডিমলা উপজেলার ছয়টি ও জলঢাকা উপজেলার ১টি মিলে সাতটি ইউনিয়নের প্রায় ২৫ হাজার মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে রয়েছেন এক মাস ধরে। বন্যায় সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন ডিমলা উপজেলা টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের চার হাজার পরিবার। এরই মধ্যে ছয়শ পরিবারের সর্বস্ব বিলীন হয়ে গেছে নদীগর্ভে।   সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, চরখড়িবাড়ী গ্রামের দুলাল খাঁর ছেলে ইব্রাহিম খাঁ (৫৬), আবদুল গফুর (৪৮), আজগর আলীর স্ত্রী বছিরন নেছা (৮৭), মৃত. ইদ্রিস আলীর স্ত্রী আলেয়া বেগম (৭৬), শাহার আলীর স্ত্রী রূপজান খাতুন (৫৫), মোহাম্মদ আলীর ছেলে রফিকুল ইসলাম (৪৫), গোলাপ খাঁর ছেলে শাহার আলী (৬০), টেপাখড়িবাড়ী ঝিঞ্জিরপাড়ার মৃত. ছলিমুদ্দিনের ছেলে কাশেম আলী (৯০), আফছার আলীসহ (৬৫) পাঁচ শতাধিক মানুষ নদীর ভাঙনের শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের সহায়তায় জনপ্রতিনিধিদের খোঁজ মেলেনি। দায়িত্বশীল কোনো মহলও এগিয়ে আসেনি। অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজাউল করিম দাবি করেন, নদী ভাঙনের শিকার মানুষেরা যেন কোনো ক্ষতির সম্মুখীন না হন- সে বিষয়ে সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের পাশে রয়েছেন। কুড়িগ্রাম : নাগেশ্বরী উপজেলাধীন ভিতরবন্দ ইউনিয়নে বসবাসরত মানুষের মধ্যে প্রায় ৮৫ ভাগই এখন পানিবন্দী হয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন। এ ইউনিয়নের চলাচলরত রাস্তা-ঘাটসহ কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী রুটে প্রায় ১ কিলোমিটার রাস্তা এখন পানির নিচে। ভিতরবন্দ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলহাজ আমিনুল হক খন্দকার (বাচ্চু) জানান, সরকারি অনুদান মাত্র ২ টন চাল ও পাঁচ হাজার টাকা পেয়েছি যা খুবই সামান্য। অন্যদিকে বন্যার্তরা অভিযোগ করেছেন, তারা প্রয়োজনীয় কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাচ্ছেন না। যাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছিলেন তাদেরও পাশে পাওয়া যাচ্ছে না। গাইবান্ধা : ফুলছড়ি, সাঘাটা, সুন্দরগঞ্জ এবং গাইবান্ধা সদরের দুই সপ্তাহ ধরে পানিবন্দী থাকা ২ লক্ষাধিক মানুষের দুর্ভোগে চরম আকার ধারণ করেছে। বন্যাকবলিত অনেক মানুষ গবাদি পশুসহ বাঁধ ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। মানুষের খাবার সংকট এবং গবাদি পশুর খাদ্য সংকটের পাশাপাশি দিনভর বৃষ্টিতে তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। ঘাঘট নদীর গাইবান্ধা শহররক্ষা বাঁধের গোদারহাট, কুঠিপাড়া পয়েন্টে কিছু অংশ ধ্বসে যাওয়ায় বাঁধটিও হুমকির মুখে পড়েছে। তা রক্ষার চেষ্টায় পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ করছে বলে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকাশ কৃষ্ণ সরকার জানিয়েছেন। সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জের অন্তত ছয়টি উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ গত ছয় দিন ধরে পানিবন্দী রয়েছেন। তারা সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে ত্রাণ সহায়তা পাননি। দায়িত্বশীল কোনো মহল থেকেই তাদের খোঁজ নেওয়া হয়নি। এদিকে গতকালও জেলা সদরের সঙ্গে সড়কপথে যোগাযোগ বন্ধ ছিলে জেলার তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও দোয়ারাবাজার উপজেলার। সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারাবাজার ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকগুলোতে পাহাড়ি ঢলে পানির চাপ বেশি থাকায় এসব এলাকায় বন্যার কারণে মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। খাদ্য ও পানীয় জল সংকট দেখা দিয়েছে সব খানেই। সুনামগঞ্জ শহরতলির পূর্ব ইব্রাহিমপুর গ্রামের পানিবন্দী শতাধিক পরিবারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, তাদের কাছে পৌঁছায়নি সরকারি কোনো ত্রাণ সহায়তা। গ্রামের হারুন রশিদের স্ত্রী লতিফুন নেছা জানান, ছয় দিন হয় কোমর পানিতে বসবাস করছেন তার পরিবারের সাত সদস্য। এ সময়ের মধ্যে জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতার হাত বাড়ানো হয়নি।

up-arrow