Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৪৮
সিন্ডিকেটে জিম্মি ঢাকা শিক্ষা বোর্ড
বাড়তি টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয় না
আকতারুজ্জামান

দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সিন্ডিকেটে জিম্মি ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। সেবা গ্রহণ করতে এসে প্রতিনিয়তই দুর্নীতি ও হয়রানির মুখোমুখি হচ্ছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকরা।

যে কোনো কাজের জন্য পদে পদে দিতে হয় বাড়তি টাকা। প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে অসাধুরা দুর্নীতি, অপকর্ম করলেও বোর্ড কর্তৃপক্ষকে তেমন কোনো ব্যবস্থাও নিতে দেখা যাচ্ছে না। এ ছাড়া বোর্ডের কর্মচারী ইউনিয়নের হাতে জিম্মি বোর্ড কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন নিয়োগে ও নিজেদের লোকদের চাকরি পাইয়ে দিতে এ সিন্ডিকেট সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত সোমবার শিক্ষা বোর্ডে গিয়ে দেখা যায়, জামালপুরের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আসেন নাম সংশোধনের জন্য। বোর্ডের গেটে পা দিতেই বোর্ডের এক এমএলএসএস অভিভাবককে ডেকে নেন। পরে আড়াই হাজার টাকার চুক্তিতে নাম সংশোধন করে দিতে চান। বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, নাম সংশোধনের ক্ষেত্রে এক থেকে দুই মাস সময় লেগে যায়। এজন্য মাসিক বৈঠকেও উপস্থিত থাকতে হয় সংশোধনের জন্য আবেদনকারী শিক্ষার্থীকে। কিন্তু চতুর্থ শ্রেণির এই কর্মচারী অভিভাবককে জানিয়ে দেন, বোর্ডের বৈঠকে উপস্থিত থাকতে হবে না। এজন্য বাড়তি আরও এক হাজার টাকা দিতে হবে। অথচ নিয়মানুসারে, নাম সংশোধনের জন্য মাত্র ৫০০ টাকা সোনালী ব্যাংকে জমা দিতে হয়। শিক্ষা বোর্ডের প্রধান ফটকেই টেবিল-চেয়ার নিয়ে বসে দেদার বাণিজ্য করে যাচ্ছে অসাধু কিছু সিন্ডিকেট। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ফাঁদে ফেলতে চমকপ্রদ নানা ব্যানারও সাঁটিয়েছে। এমনই একটি সিন্ডিকেটের নাম ‘পাবলিক হেল্প ডেস্ক’। হেল্প ডেস্কের নামে সাঁটানো ব্যানারে লেখা রয়েছে— ছাত্রছাত্রীদের তথ্য ও সেবা দিয়ে সময় বাঁচানোই আমাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এটি একটি সেবা কেন্দ্র। সনদপত্রে নাম সংশোধন, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন, এফিডেভিটও করে দেয় এই চক্রটি। আর বিনিময়ে সেবার নাম করে ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নেয় নির্ধারিত ফির পাঁচ/ছয়গুণ বেশি টাকা। ঢাকা বোর্ডের অধীনে শিক্ষার্থীদের যে কোনো সমস্যার সমাধান এই চক্রটি করে দেয় বলেও দাবি করেছে। গত সোমবার এক শিক্ষার্থী নাম সংশোধনের জন্য হেল্প ডেস্কের কাছে গেলে ওবায়দুল্লাহ নামে ডেস্কে বসা ব্যক্তি প্রাথমিকভাবেই আড়াই হাজার টাকা দাবি করেন। ওবায়দুল্লাহ শিক্ষার্থীকে জানান, আড়াই হাজার টাকা দিলে আবেদন করা যাবে। এরপর ধাপে ধাপে আরও প্রায় তিন থেকে চার হাজার টাকা লাগবে। ওবায়দুল্লাহ দাবি করেন, বোর্ডের লোকজনের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে। টাকার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই নাম সংশোধনের কাজটি ভোগান্তি ছাড়াই করে দেবেন তিনি। এ প্রতিবেদক ওবায়দুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে বাড়তি টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। বলেন, আমরা বাড়তি কোনো ফি নেই না। আমরা সেবামূলক কাজ করে থাকি। অভিযোগ রয়েছে— বোর্ডে পত্রিকা বিলি করা হকার, সিকিউরিটি গার্ডরাও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সেবার নাম করে ফাঁদে ফেলে অনৈতিকভাবে অর্থ আদায় করছেন। সার্টিফিকেট আটকিয়ে জিম্মি করে অর্থ আদায় করারও অভিযোগ মেলে এদের বিরুদ্ধে মাঝে-মধ্যেই। এ ছাড়া স্কুল ও কলেজে ভর্তি চলাকালীন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের পিয়ন-কর্মচারীরা ভর্তির কথা বলে সহজ-সরল শিক্ষার্থীদের ফাঁদে ফেলে অর্থ হাতিয়ে নেয়। বিদ্যালয়ের পাঠদান অনুমতি নিতে গেলেও বাড়তি টাকা সংশ্লিষ্ট বিভাগের ব্যক্তিদের দিতে হয় এমন অভিযোগও রয়েছে। শিক্ষা বোর্ডটির কর্মচারী ইউনিয়ন নিয়োগের ক্ষেত্রে বরাবরই নিজেদের লোকদের চাকরি পাইয়ে দিতে হস্তক্ষেপ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু বকর সিদ্দিক সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ইউনিয়ন নিয়োগের ক্ষেত্রে অযাচিত হস্তক্ষেপ করে। ক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টা করে। এর আগে কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি হুমায়ুন কবীর ও সাধারণ সম্পাদক লোকমান মুন্সি নিয়োগের ক্ষেত্রে নিজেদের লোকদের বিধিবহির্ভূত নিয়োগ পাইয়ে দিয়েছিলেন। পরে এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে বোর্ডের ১৫১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী স্বাক্ষরিত একটি অভিযোগপত্র জমা দেন শিক্ষামন্ত্রণালয়ে। আবেদনটি আমলে নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সংশ্লিষ্ট শাখাকে বিষয়টি দেখার নির্দেশ দেন। পরে নিয়োগটি বাতিল হয়ে যায়। পরে তাদের দ্বন্দ্বের কারণে আরও একটি নিয়োগের প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে বোর্ড কর্তৃপক্ষ। এসব ব্যাপারে বক্তব্য নিতে দফায় দফায় চেষ্টা করেও বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. মাহাবুবুর রহমান ও সচিব শাহেদুল খবীর চৌধুরী ফোন রিসিভ করেননি।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow