Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বুধবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৪১
বিষাক্ত বর্জ্যের থাবায় বিপর্যস্ত
রেজা মুজাম্মেল, চট্টগ্রাম
বিষাক্ত বর্জ্যের থাবায় বিপর্যস্ত

দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম প্রাকৃতিক মত্স্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদী এখন চরম বিপর্যস্ত বিষাক্ত কীটনাশকের থাবায়। কীটনাশকের নেতিবাচক প্রভাবে কমছে মাছ।

হ্রাস পাচ্ছে জলজ প্রাণী। হারাচ্ছে প্রাণিবৈচিত্র্য। পক্ষান্তরে হাটহাজারীর শিকারপুর ও মাদার্শা ইউনিয়নের সাতটি খাল হয়ে শিল্প ও আবাসিক বর্জ্য সরাসরি গিয়ে পড়ছে এ নদীতে। ফলে নাভিশ্বাস উঠেছে নদীটির। চরমভাবে প্রভাব ফেলছে মা-মাছের ওপর। দূষিত ‘কালো পানি’তে ভরা খালও এখন মাছশূন্য। বিপর্যয় ঘটছে পরিবেশের। জানা যায়, হালদা নদীর দুই পাশে আছে বড় আকারের বিস্তৃত দুটি বিল। এখানে বছরে দুবার ফসল উৎপাদন করা হয়। এর সঙ্গে আছে প্রায় ১৫টি বড় বাণিজ্যিক চা-বাগান। এসব বিল ও চা-বাগানে ব্যবহার করা হয় বিপুল পরিমাণ কীটনাশক। কীটনাশক পানির সঙ্গে মিশে গিয়ে পড়ে হালদা নদীতে। এর মধ্যে আছে অর্গানোকোরিন, অর্গানোফসফরাস, অর্গানোকার্বনেট, সিনথেটিক পাইরিথ্রয়েড গ্রুপের মারাত্মক ক্ষতিকারক কীটনাশক। কীটনাশকের প্রভাবে মাছ ও জলজ প্রাণীর ওপর নানা ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ার মধ্যে আছে মাছের খাদ্য প্রাণী ও উদ্ভিদকণার মৃত্যু এবং খাদ্যশিকল ধ্বংস হওয়া। মাছ জলজ পরিবেশ থেকে খাদ্য গ্রহণ করে জীবন ধারণ করে। খাদ্য হিসেবে মাছ জলজ পরিবেশ থেকে অণুজীব, উদ্ভিদকণা, প্রাণিকণা, অমেরুদণ্ডী প্রাণী, মেরুদণ্ডী প্রাণী এবং বিভিন্ন

নিমজ্জিত ও ভাসমান উদ্ভিদ গ্রহণ করে থাকে। জলজ পরিবেশে কীটনাশকের সংমিশ্রণ হলে কীটনাশকের মাত্রাভেদে প্রায় সব প্রাণী এবং উদ্ভিদের ওপরই কীটনাশকের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাব ও বিষক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়। অন্যদিকে এ কারণে মাছ ও অন্যান্য জলজ জীবের সরাসরি মৃত্যু হয়। প্রায় সব ধরনের কীটনাশকই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাছের জন্য ক্ষতিকর। এদের মধ্যে অর্গানোকোরিন ও পাইরিথ্রয়েড গ্রুপের প্রায় সব কীটনাশক এবং অর্গানোফসফেট ও কার্বনেট গ্রুপের প্রায় অর্ধেক কীটনাশক মাছের জন্য চরম বিষাক্ত। এসব চরম বিষাক্ত কীটনাশক নিচু এলাকার ধানখেতে প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে পার্শ্ববর্তী এলাকায় অবস্থানরত মাছের সরাসরি মৃত্যু ঘটে থাকে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। চট্টগ্রাম হাজী মুহম্মদ মুহসীন কলেজের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ইদ্রিস আলী বলেন, হালদা নদী-সংশ্লিষ্ট তিনটি উপজেলা আছে। এসব উপজেলার ধানি জমিতে যে পরিমাণ কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, এর ২৫ শতাংশ বৃষ্টিসহ নানা মাধ্যমে সরাসরি হালদা নদীতে গিয়ে পড়ে। এ ছাড়া আশপাশের আবাসিক, শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকার বর্জ্যও গিয়ে পড়ছে নদীটিতে। কীটনাশক ও বর্জ্যের নির্যাসে হালদা নদীর নির্ঘাত মৃত্যু হবে। এ মৃত্যু থেকে হালদাকে রক্ষা করতে এখনই সক্রিয় হওয়া জরুরি। পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম বিভাগের সিনিয়র কেমিস্ট মো. কামরুল হাসান বলেন, ‘হালদা নদী রক্ষায় আমরা ইতিমধ্যে সরেজমিন ঘুরে এসে ১২টি সুপারিশ প্রণয়ন করে মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। এ ছাড়া দূষণের দায়ে সিলগালা করা হয়েছে কিছু প্রতিষ্ঠানকে। বিশেষ করে অনন্যা আবাসিকের বর্জ্য অপসারণে নতুন পরিকল্পনার সুপারিশ করা হয়েছে। ’ হালদা নদী রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী বলেন, বামুনশাহী খালের দূষিত পানি মিশছে আশপাশের আবাদি জমিতে। ইতিমধ্যে শিকারপুর ও মাদার্শা ইউনিয়নের প্রায় অর্ধেক পুকুর ও জলাশয় দূষিত হয়েছে। খাল-সংলগ্ন কৃষিজমি ও বিল হয়ে পড়ছে আবাদের অনুপযোগী। ক্রমশ মাছশূন্য হয়ে পড়ছে বিল ও পুকুর। সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, হালদা নদীতে সরাসরি বর্জ্য পড়ছে মাদার্শা ইউনিয়নের খন্দকিয়া, কাটাখালী ও মাদারী খাল দিয়ে। এর সঙ্গে আছে শিকারপুর ইউনিয়নের কুয়াইশ, বাথুয়া, হামিদিয়া ও কৃষ্ণখালী খাল। প্রায় দুই বছর ধরে নগরীর বায়েজিদ থেকে কুলগাঁও এলাকার শতাধিক শিল্প-কারখানার খাল হয়ে গিয়ে পড়ছে হালদা নদীতে। এর মধ্যে মদিনা ট্যানারি, রওশন ট্যানারি ও রিফ লেদার নামক প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য হালদায় পড়ছে কৃষ্ণখালী খাল হয়ে। কেডিএস ডাইং ও টিকে ডাইংয়ের বর্জ্য পড়ছে খন্দকিয়া খাল হয়ে। ইব্রাহিম কটন মিলের বর্জ্য পড়ছে কাটাখালী খাল হয়ে। এশিয়ান পেপার মিলের বর্জ্য পড়ছে মাদারী খাল হয়ে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ‘অনন্যা’ আবাসিক এলাকার কাটা মাটি ও আবাসিক বর্জ্য প্রকল্পের মূল নালা হয়ে কুয়াইশ, কৃষ্ণখালী ও খন্দকিয়া খাল হয়ে হালদায় পড়ছে। দূষণের মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাবে হালদায় চলতি বছর মা-মাছ নমুনা ডিম ছাড়লেও অন্য বছরের মতো স্বাভাবিক ডিম ছাড়েনি। স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম মুন্না বলেন, ক্রমেই খালের পানি হয়ে যাচ্ছে কুচকুচে কালো। আবাদি জমি হচ্ছে অনাবাদি। সন্দেহ জাগছে, ভবিষ্যতে হালদায় মা-মাছ আর ডিম ছাড়বে কি-না। কারণ কালো হয়ে দুর্গন্ধ হচ্ছে পুকুরের পানি। মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। চর্মরোগ ছড়িয়ে পড়ছে।

up-arrow