Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২২:৫২
অভিযান চলে, বন্ধ হয় না ভেজাল
ভেজাল কারবারিদের গতিবিধি বা পরবর্তী কার্যক্রমে তদারকি নেই
মাহবুব মমতাজী

যথারীতি বছরজুড়ে বিভিন্ন স্থানে ভেজালবিরোধী অভিযান চলছে, কিন্তু বন্ধ হচ্ছে না ভেজালের কারবার। অভিযানে জেল-জরিমানা করা হলেও কাজ হচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে ওই ভেজাল কারবারিরা জেল-জরিমানা ভোগ করে আবারও একই কাজে যুক্ত থাকছেন। এর ফলে অভিযানের ফল হচ্ছে শূন্য।

এ বিষয়ে এক অনুসন্ধানে ধারণা পাওয়া গেছে, এ ঘটনার মূলে রয়েছে অভিযানের ফলোআপ না থাকা। একে তো আইনের ফাঁক গলে পার পেয়ে যান ভেজাল প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকরা, তার ওপর অভিযান চালানোর পর এগুলোর আর তদারকি থাকে না। এমনকি অভিযানের পর কোনো ফলোআপ রিপোর্টও রাখা হয় না। মূলত র‌্যাব, জেলা প্রশাসন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার অধিদফতর ও সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত ভেজালবিরোধী অভিযানগুলো পরিচালনা করে। অভিযানে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা ছাড়াও বিভিন্ন মেয়াদে জেলও দেওয়া হয়। ওয়াকিবহালদের অনেকেরই বক্তব্য, এভাবেই দায়িত্ব শেষ করা হচ্ছে। ভেজাল কারবারিদের গতিবিধি বা পরবর্তী কার্যক্রমের বিষয়ে কোনো ধরনের তদারকি করা হচ্ছে না।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এ পর্যন্ত বেশির ভাগ ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে উত্তরা, রামপুরা, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, জুরাইন, চকবাজার, বাবুবাজার, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে। এ বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত শতাধিক প্রতিষ্ঠানে চালানো হয়েছে ভেজালবিরোধী অভিযান। করা হয়েছে প্রায় কয়েক কোটি টাকা জরিমানা। তবুও বন্ধ হয়নি ভেজালের কারবার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কড়া নজরদারির অভাব আর ভেজাল প্রতিরোধে যথাযথ অথরাইজড প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত সমস্যার কারণে এমন হচ্ছে। সূত্রমতে, আমলাতান্ত্রিকতার চেয়ে গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে ভেজাল রোধ করা সম্ভব। ভেজাল রোধ করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ নয়। বরং তাদের সহায়তায় বিএসটিআইকে আরও বেশি শক্তিশালী করতে হবে। নয় তো এ দেশের খাদ্যব্যবস্থায় উন্নতি হবে না। দিন দিন মানুষ ঠকতেই থাকবে। সূত্রগুলো আরও জানায়, অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক লাভের আশায় সাধারণ ক্রেতাদের ঠকিয়ে বিভিন্ন পণ্যে ক্ষতিকারক উপাদান মেশান। আবার অনেকে পচা ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাবারও সরবরাহ করেন। এসবে রাজধানীর সুপার শপ ‘স্বপ্ন’ ও ‘মীনাবাজার’-এর মতো অভিজাত প্রতিষ্ঠানগুলোরও সংশ্লিষ্টতা পেয়েছেন অভিযান পরিচালনাকারীরা। ৭ সেপ্টেম্বর উত্তরার ‘ডেইলি শপিং মল’ ও ‘নিউ বি-বাড়িয়া বেকারি’তে অভিযান চালায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। এটি পরিচালনা করেন আর্মড ব্যাটালিয়ন পুলিশ ও ঢাকা জেলা প্রশাসন। ভেজাল শ্যাম্পু, স্ক্রিন ক্রিম, মশার কয়েল, ময়দা, ক্ষতিকারক রং ব্যবহার করে রুটি, কেক, বিস্কুটসহ বিভিন্ন পণ্য ও খাবার বিক্রির অপরাধে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান মো. শাকিল হোসেনকে ১ লাখ ও মো. শিমুল মিয়াকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ৬ সেপ্টেম্বর ভেজাল মেডিকেল সামগ্রী সরবরাহের অভিযোগে র‌্যাব অভিযান চালায় ধানমন্ডিতে। মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে প্যাথলজি সেবা ও অনিবন্ধিত ওষুধ সরবরাহের অপরাধে ‘মেডিনোভা ডায়াগনস্টিক সেন্টার’কে সাড়ে ৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে ‘বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল’কে করা হয় ১০ লাখ টাকা জরিমানা। ৫ সেপ্টেম্বর বিক্রয়-নিষিদ্ধ সরকারি হাসপাতালের ওষুধ ও গরু মোটাতাজাকরণের ওষুধ সরবরাহের দায়ে র‌্যাবের আরেকটি অভিযানে পুরান ঢাকার ১২ ব্যবসায়ীকে বিভিন্ন মেয়াদে জেল-জরিমানা করা হয়। অভিযানে বাবুবাজারের অভিযুক্ত ভেজাল প্রতিষ্ঠানগুলো হলো তিতাস মেডিকেল হল, আলপনা মেডিকেল হল, পুরবী এন্টারপ্রাইজ, মহামায়া ড্রাগ হাউস, বনানী মেডিকেল স্টোর, এবি ড্রাগ হাউস, গ্রামীণ ফার্মা, সিকদার এন্টারপ্রাইজ, এস আর ড্রাগ হাউস, নিশাদ এন্টারপ্রাইজ, বোরহান এন্টারপ্রাইজ ও আরমান মেডিকেল হল। ১ সেপ্টেম্বর র‌্যাবের ভেজালবিরোধী অভিযানে অনিরাপদ চিকিৎসাসেবা দেওয়ার দায়ে মোহাম্মদপুরের সেবিকা জেনারেল হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড ব্লাড ব্যাংক, ফেমাস ডায়াগনস্টিক, কনসালট্যান্ট সেন্টার অ্যান্ড ব্লাড ব্যাংককে জরিমানা করা হয়। আর ভেজাল খাবার সরবরাহের দায়ে উত্তরার কাসুন্দি রেস্তোরাঁকে ৫০ হাজার ও রুচি রেস্তোরাঁকে করা হয় ২৫ হাজার টাকা জরিমানা। ২৩ আগস্ট ভেজাল সেমাই ও মিছরি তৈরির অপরাধে কামরাঙ্গীরচরের ‘ভাই ভাই প্রোডাক্টস’কে ৭০ হাজার ও ‘জামান ফুড প্রোডাক্টস’কে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। রামপুরার মোল্লাবাড়ী এলাকায় ‘বাটা সু’র নকল পণ্য বিক্রির অপরাধে এনায়েত নামে একজনকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। ২২ আগস্ট ময়দা আর চিনির সঙ্গে স্যাকারিন ও অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট মিশিয়ে কেক, পাউরুটি ও বিস্কুট তৈরির অপরাধে চকবাজারের ‘আল নূর প্রোডাক্টস’কে দেড় লাখ, ‘মীম ফুড প্রোডাক্টস’কে ২ লাখ, ‘টেস্টি ফুড বেকারি’কে দেড় লাখ ও ‘জমজম বেকারি’কে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ২৮ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ঢাকা জেলা প্রশাসনের সমন্বিত এক অভিযানে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য, পচাবাসি খাবার বিক্রির অপরাধে সুপার শপ ‘স্বপ্ন’ ও ‘মুসলিম সুইটস’কে মোট ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। ২১ আগস্ট র‌্যাবের অভিযানে ভেজাল ডিটারজেন্ট পাউডার উৎপাদনের দায়ে গাজীপুরের ‘চন্দ্রা করপোরেশন’কে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ১৭ জুলাই খিলগাঁওয়ে ভেজালবিরোধী অভিযান চালায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন—এপিবিএন। এ সময় ভেজাল পণ্য রাখার অপরাধে ‘ক্যাফে ৫৬৭’, ‘টাঙ্গাইল চমচম ঘর অ্যান্ড বেকারি’, ‘চাপ সামলাও’ ও ‘স্বপ্ন ডি-স্টোর’কে মোট ৩১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ৩০ জুন জুরাইন বাজার এলাকায় অনুমোদন ছাড়া অবৈধ, ভেজাল ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুখাদ্য, গুঁড়া দুধ বা ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার, সেমাই, শ্যাম্পু, সাবান, টুথপেস্ট, সফট ড্রিংক পাউডার ইত্যাদি বিক্রির অপরাধে ‘জনপ্রিয় স্টোর’, ‘বিক্রমপুর স্টোর’, ‘মুজাহিদ স্টোর’ ও ‘আনোয়ার স্টোর’কে ১০ হাজার করে মোট ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করে ঢাকা জেলা প্রশাসন। ২৭ জুন চকবাজারে র‌্যাবের একটি অভিযানে ভেজাল গুঁড়া দুধ, শিশুখাদ্য উৎপাদন, মজুদ ও বিক্রির অপরাধে ‘আজমেরী ট্রেডার্স’-এর মালিক মো. মারুফ আহমেদকে দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২৬ জুন মোহাম্মদপুরে ভেজাল পণ্য মজুদ ও বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে মীনাবাজারকে জরিমানা করে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসব প্রতিষ্ঠানে ভেজালবিরোধী অভিযান চালানো হলেও পরে তাদের ওপর রাখা হয়নি কোনো ধরনের নজরদারি বা তদারকি। ভেজালবিরোধী অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের শিক্ষক আবু সারা শামসুর রউফ বলেন, ‘ভেজাল অভিযানের পর ভেজাল প্রতিষ্ঠানগুলোয় কোনো ধরনের নজরদারি বা তদারকির ব্যবস্থা নেই। কারণ আমাদের দেশে ভেজাল নির্মূলের কোনো অথরাইজড নেই। ভেজাল প্রতিরোধের জন্য যে ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন তা বিএসটিআই ও বিসিএসআইর নেই। এর জন্য একটি টেস্টিং ইউনিট রাখতে হবে। বিএসটিআইকে স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে তার কাঠামোকে ঢেলে সাজাতে হবে। সমস্ত দেশে পূর্ব-পশ্চিমাঞ্চলে ভাগ করে জেলাভিত্তিক সাব অফিস গঠন করতে হবে। তবেই ভেজাল রোধ করা সম্ভব হবে।’ তবে এ ব্যাপারে র‌্যাব সদর দফতরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম বলেন, ‘আমরা ভেজাল অভিযান চালানোর পরও অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোয় মনিটরিং করি। এটা আমাদের নিয়মিত কার্যক্রমের একটি অংশ। তারা যাতে পরবর্তীতে আবারও ভেজালে জড়িয়ে না পরে সেজন্য মনিটরিং করা হয়।’

এই পাতার আরো খবর
up-arrow