Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:১৯
অস্ত্রধারীদের পাহারায় ভিআইপি গাড়িতে যায় ইয়াবার চালান
আটক ব্যবসায়ীর চাঞ্চল্যকর তথ্য
সাঈদুর রহমান রিমন

সামনে পেছনে একাধিক মোটরসাইকেলে অস্ত্রধারীদের কড়া পাহারায় মহাদামি সব গাড়িতে ইয়াবার বড় বড় চালান পাঠান মাদক সম্রাট ভাতিজা রাসেল। শীর্ষ সন্ত্রাসী যোশেফের অন্যতম সহযোগী শামীম ওরফে প্যাদা শামীমের নেতৃত্বে ৬-৭ জন পেশাদার সন্ত্রাসী এ দায়িত্ব পালন করে। সশস্ত্র পাহারায় প্রতিদিনই তারা বারিধারার আস্তানা থেকে ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, মিরপুর ও উত্তরায় নিজস্ব ডিলারদের কাছে হাজার হাজার পিস ইয়াবা পৌঁছে দেয়। প্রতিপক্ষ ব্যবসায়ী বা দুর্বৃত্তদের হানা থেকে ইয়াবার চালান রক্ষায় পেশাদার সন্ত্রাসীদের পাহারাদার করা হলেও প্রশাসনিক তল্লাশি এড়াতে তারা ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। ইয়াবার চালান বহনকারী বিএমডব্লিউ বা প্রাডো গাড়ির সামনে পেছনে ভুয়া স্টিকার সাঁটানো থাকে। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প কাজে নিয়োজিত, র‌্যাব, পুলিশ, ভ্রাম্যমাণ আদালত কিংবা টিভি-পত্রিকার নামে বানানো ভুয়া স্টিকার। আবার কখনো কখনো গাড়ির ভিতরে হ্যাঙ্গারে পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার ব্যাজ লাগানো ইউনিফর্ম ঝুলিয়ে রাখা হয়; ফলত ইয়াবাবাহী গাড়ি অনায়াসে পেরিয়ে যায় র‌্যাব-পুলিশের চেকপোস্ট। ইয়াবা পাচারের ক্ষেত্রে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা ভাতিজা রাসেলের সেকেন্ড ইন কমান্ড শামীম ওরফে প্যাদা শামীমকে গ্রেফতার করতেই চাঞ্চল্যকর এই কাহিনী জানতে পায় গোয়েন্দা পুলিশ। নারায়ণগঞ্জ জেলা ডিবির সদস্যরা বুধবার রাতভর ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে। এ সময় শ্যামলী এলাকা থেকে মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলানগর থানা এলাকার ‘ইয়াবা ডিলার’ ফাহিম আহমেদকেও গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় ডিবি। ফাহিমের নিয়ন্ত্রণে অর্ধশতাধিক তরুণ-তরুণী ওই এলাকায় প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার পিস ইয়াবা বেচাকেনা করে থাকে বলেও জানা গেছে। অভিযান পরিচালনাকারী নারায়ণগঞ্জ জেলা ডিবির পরিদর্শক মাহমুদুল ইসলাম পিপিএম জানান, কারাগারে অন্তরীণ শীর্ষ সন্ত্রাসী যোসেফ গ্রুপের অন্যতম কিলার প্যাদা শামীম আন্ডারওয়ার্ল্ডের মূর্তিমান আতঙ্ক। ঢাকার বহু খুনখারাবির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত শামীম কয়েক বছর ধরে ইয়াবা বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ে। ভাতিজা রাসেলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে এ সন্ত্রাসী ছিল ইয়াবা বাণিজ্যের নিরাপত্তা দেখভালের দায়িত্বে। প্যাদা শামীম ও তার সন্ত্রাসী সহযোগীরা সশস্ত্র পাহারা দিয়ে ইয়াবার বড় বড় চালান রাজধানীর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিরাপদে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করত। ডিবির পরিদর্শক মাহমুদুল ইসলাম পিপিএম জানান, রাজধানীর ইয়াবা সম্রাট হিসেবে চিহ্নিত ভাতিজা রাসেলকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সূত্র ধরে গতকাল থেকেই ঢাকা মহানগরসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মঈনুল হকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে জেলা ডিবির অন্তত তিনটি টিম টানা অভিযানে নেমেছে। এর আগে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ মাদক সম্রাট ভাতিজা রাসেলকে অভিজাত পরিবারের এক তরুণসিহ কাঁচপুর এলাকায় গ্রেফতার করা হয়। রিমান্ডে থাকাবস্থায় ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে ভাতিজা রাসেল রাজধানীর অন্যতম প্রধান ইয়াবা সিন্ডিকেটের বিশদ জানাতে বাধ্য হয়। তার নেতৃত্বে দেড় শতাধিক তরুণী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন নিয়ে প্রায় ৪০০ কর্মীর ‘ইয়াবা বাজারজাত’ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। গুলশান, বনানী, বারিধারা, ধানমন্ডি, উত্তরার মতো অভিজাত এলাকার দেশি-বিদেশি ইয়াবাসেবী নিয়ে ‘নেশার আলাদা সাম্রাজ্য’ রয়েছে তার। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ুয়া অনেক মেয়ে শিক্ষার্থী তার প্রতারণায় সর্বস্ব খুইয়ে এখন জিম্মি হয়ে পড়েছে। দুই দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ফয়সাল ইসলাম রাসেল ওরফে ভাতিজা রাসেল গতকাল নারায়ণগঞ্জ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাসেল তার জবানবন্দিতে ইয়াবা বাণিজ্যের নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী মহল, অর্থ বিনিয়োগকারী ও সহায়তাকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নামধাম-পরিচয় বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তার নিয়ন্ত্রণে থাকা অর্ধশতাধিক ইয়াবা ডিলারের পরিচয়ও ফাঁস করেছেন তিনি। ডিবির কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে এই ইয়াবা সম্রাট চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেছেন, ‘সরকারের শীর্ষ মহল ছাড়া তার সিন্ডিকেটের ইয়াবা বাণিজ্য নির্মূল করার সাধ্য কারও নেই।’ এদিকে বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত তথ্যের সূত্র ধরে বিভিন্ন থানায় রাসেলের নামে থাকা মামলা ও ওয়ারেন্টের বিষয় জানতে চেয়ে নারায়ণগঞ্জ ডিবি আরও দুই দিন আগে থানায় থানায় তারবার্তা পাঠিয়েছে। কিন্তু কেবলমাত্র রাজধানীর বনানী থানা থেকে দ্রুত বিচার আইনে রাসেলের বিরুদ্ধে থাকা একটি মামলার বর্ণনা পাঠালেও অন্য সব থানা তার প্রিভিয়াস রেকর্ড চাপা দিতে ওই তারবার্তা এড়িয়ে যাচ্ছে। এ প্রতিবেদক জানতে পেরেছেন, ধানমন্ডি থানায় ভাতিজা রাসেলের বিরুদ্ধে গ্যাংরেপের যে মামলাটি রয়েছে তার নম্বর ৫(৭)২০১১, মামলাটির বাদী হচ্ছেন মোহাম্মদ হাফিজউল্লাহ। মামলাটির সিএস নম্বর-১৫৪(৩) তারিখ-১৪-১২-২০১১। মিরপুর মডেল থানায় রাসেলের বিরুদ্ধে রয়েছে অস্ত্র আইনের মামলা, এর নম্বর-২৯(৮)২০১৪। মামলাটি (সিএস নম্বর-৭৯৫/১৪) ঢাকা মেট্রো স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল আদালতে চলমান রয়েছে। এসব মামলার বিবরণ সংশ্লিষ্ট থানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা ধামাচাপা দিয়ে রেখেছেন। এ ছাড়া কাফরুল থানা, গুলশান থানাতেও রাসেলের বিরুদ্ধে গাড়ি চুরি, রাহাজানি, হত্যা চেষ্টাসহ সর্বমোট ১৪টি মামলা থাকার খবর পাওয়া গেছে। কিন্তু ডিএমপি থানাগুলো থেকে তদন্তকারী সংস্থা নারায়ণগঞ্জ জেলা ডিবিকে সহায়তা না করায় মাদকের রাঘববোয়ালটি শিগগিরই খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে যাবে বলেও আশঙ্কা করছেন অনেকে। ডিবি পরিদর্শক মাহমুদুল ইসলাম পিপিএম বলেছেন, রাসেলের মতো বড় মাপের ইয়াবা সম্রাট কোনোভাবেই ছাড়া পাওয়ার সুযোগ নেই। এর মধ্যেই তিনি আদালতে নিজের ভয়ঙ্কর অপরাধ কর্মকাণ্ডের যাবতীয় তথ্য বিবরণসহ স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। মামলার বিস্তারিত তদন্ত স্বার্থে তাকে দ্বিতীয় দফা রিমান্ড চেয়ে খুব শিগগিরই আদালতে আবেদন করা হবে বলেও জানিয়েছেন ডিবি পরিদর্শক।

up-arrow