Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:০৭
দ্বন্দ্ব থাকলেও ১৪ দল বেশি সক্রিয়
জোটের রাজনীতি ভোটের রাজনীতি - চট্টগ্রাম
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
দ্বন্দ্ব থাকলেও ১৪ দল বেশি সক্রিয়

দল গোছানোর চেয়ে বিরোধী জোটের তত্পরতা বা কর্মকাণ্ড মোকাবিলাতেই ব্যস্ত ক্ষমতাসীন ১৪-দলীয় জোট। দলীয়ভাবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা নাকচ করা হলেও কোনো কারণে নির্বাচন অনিবার্য হয়ে উঠলে, বিরোধী জোটের চেয়ে মাঠের রাজনীতিতে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের প্রস্তুতি বেশ ভালো বলেই দাবি নেতৃবৃন্দের।

চট্টগ্রাম মহানগরে আওয়ামী লীগের শীর্ষ দুই নেতার নানা ইস্যুতে জিইয়ে থাকা স্নায়ুযুদ্ধ দল গোছানোর কাজকে সুদূরপরাহত করলেও আলোচ্য দুই নেতাই মাঠে বেশ সক্রিয়। তবে অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে হাঁটা যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগকে নিয়ে গভীরভাবে ভাববার এখনই সময়— এমনটি মনে করেন তৃণমূলের কর্মীরা। ২০১৩ সালের মধ্য নভেম্বরে সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনকে যথাক্রমে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত হয় মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি। কথা ছিল নতুন করে সাংগঠনিক গতিশীলতার লক্ষ্যে ৪৪টি সাংগঠনিক ওয়ার্ড ও ১২টি থানায় সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠন হবে। আরও চাঙ্গা হবে যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো। কিন্তু মধ্যখানে বিএনপি-জামায়াত জোটের ‘আগুন-সন্ত্রাস’, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচন এবং হাল আমলের জঙ্গি তত্পরতা মোকাবিলা করতেই সাংগঠনিক পুনর্গঠন কাজ প্রত্যাশিতভাবে এগোয়নি বলে স্বীকার করলেন প্রথম সাংগঠনিক সম্পাদক নোমান আল মাহমুদ। অনুষ্ঠেয় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সম্মেলনের পরই চট্টগ্রাম মহানগরের সব কটি ওয়ার্ড ও থানা      কমিটি পুনর্গঠনের কাজ পুরোদমে শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এদিকে জোটের প্রধান দলের গতিশীলতার ওপরই মূলত জোটের রাজনীতি ও ভোটের রাজনীতি নির্ভর করে বলে মনে করেন জোটের শরিক জাসদের মহানগর সভাপতি অভীক ওসমান। জাসদের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জসিমউদ্দিন বাবুল বলেন, ‘চট্টগ্রামে ১৪-দলীয় জোটে অনৈক্য নেই। এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও আ জ ম নাছির উদ্দিনের নেতৃত্বে জোট ঐক্যবদ্ধ। ’ যে কোনো মুহূর্তে এ জোট জাতীয় নির্বাচন করার সক্ষমতা রাখে বলে জানান চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ সালাম। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহজাদা মহিউদ্দিন এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘দক্ষিণ চট্টগ্রামের রাজনীতিতেও নিঃসন্দেহে ১৪-দলীয় জোট বিএনপি-জামায়াত জোটের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়। অপশক্তি মোকাবিলায় মাঠ দখলে রয়েছে আওয়ামী লীগের। ’ এদিকে, দক্ষিণের রাজনীতিতে সম্প্রতি ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের সঙ্গে দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমদের বিরোধ স্পষ্ট হয়েছে। এ বিরোধ নিরসনে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বীর বাহাদুর এমপির মধ্যস্থতা কামনা করেছেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। ১৪-দলীয় জোটের চট্টগ্রামের নেতারা মনে করেন, মহানগরে বিএনপির নতুন কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট অসন্তোষ মাঠের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র দলগুলোর জন্য ইতিবাচক। এদিকে বিরোধীদের দ্বন্দ্ব বা ভঙ্গুরতা সত্ত্বেও ক্ষমতাসীনদের মাঝেও যে স্বস্তি নেই, তার প্রমাণ মেলে মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর কণ্ঠে। দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইনামুল হক দানু স্মরণে বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘এখন ধনপতি বা অর্থবিত্তের মালিকরাই মন্ত্রী-এমপি হচ্ছেন। ’ একই সভায় অবশ্য মেয়র ও মহানগর সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, ‘দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে মুখে বক্তৃতা দিয়েও কেউ কেউ নিজের স্বার্থে দুর্বৃত্তদের পাশে থাকেন। ’ উল্লেখ্য, শীর্ষ এ দুই নেতার মধ্যে সম্প্রতি প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বন্দরসহ নানা ইস্যুতে স্নায়বিক দ্বন্দ্ব থাকলেও এক মঞ্চেই থাকছেন তারা।

২০-দলীয় জোট : চট্টগ্রামে ২০-দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে চলছে টানাপড়েন। সময়ের সঙ্গে বাড়ছে দূরত্ব। আন্দোলন ও কর্মসূচিতে জোটের শরিক দলগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ না করা, ছোট দলগুলোকে মূল্যায়ন না করা এবং বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধের কারণে জোটের শরিকদের মধ্যে চলছে গাঢ় স্নায়ুযুদ্ধ। নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে চরম অনাস্থা ও অবিশ্বাস। এমন অবস্থায় জোটের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে হতাশা। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকার বলেন, বিএনপির নেতৃত্বে ২০-দলীয় জোট গঠিত হলেও জোটে সব দলকে সমান মূল্যায়ন করা হয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও সব দলের মতামতকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে কোনো জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রে সবার মতামত নেওয়া সম্ভব হয় না। বিষয়টা অন্য দলের নেতা-কর্মীরাও স্বাভাবিকভাবে নেন। জোটের বিভিন্ন দলের নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে জোটের নেতারা বিবৃতি না দেওয়ায় ২০-দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বাড়তে থাকে। বিগত সময়ে উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়াকে কেন্দ্র করে জোটের শরিকদের মধ্যে দূরত্ব চরম আকার ধারণ করে। এ ছাড়া কওমি মতাদর্শী দলগুলোর সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয় ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পর। ওই সময় জোটের শরিকরা ‘যথাযথ ভূমিকা’ না রাখায় অভিমান করে কওমি মতাদর্শী অনেক দলের নেতা-কর্মী জোটের কর্মসূচিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। এমনকি ওই ঘটনার জেরে জোট থেকেই বের হয়ে যায় ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশ। বিএনপি ও জামায়াত বাদে ২০-দলীয় জোটের মধ্যে চট্টগ্রামে যে কটি দল সক্রিয় রয়েছে তার মধ্যে ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশ, এলডিপি, কল্যাণ পার্টি, খেলাফত মজলিশ, জাগপা, মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, লেবার পার্টি অন্যতম। ২০-দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে টানাপড়েনের কথা অস্বীকার করে বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম বলেন, ‘কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জোটের সব শরিকের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা হয়। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় দলগুলোর নেতাদের মতামতকে একটু বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের এক নেতা বলেন, ‘এখন আমরা জোট নিয়ে ভাবছি না। আমাদের ভাবনা জুড়েই রয়েছে অস্তিত্ব রক্ষা করা। আমরা এখন অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম করছি। ’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে ২০-দলীয় জোটের একটি দলের চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি বলেন, ‘চট্টগ্রামে ২০-দলীয় জোট রয়েছে শুধু কাগজে কলমে। ’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জোটের চট্টগ্রামের আরেক শীর্ষ নেতা বলেন, ‘বিগত ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচনে আমাদের মতো ছোট দলগুলোর কোনো মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। কিন্তু জামায়াতের আগের মতো শক্তি-সামর্থ্য না থাকলেও তাদের অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। ’

বাম দল : অতীতে দেশে জাতীয় নানা ইস্যু নিয়ে বাম দলগুলোর লক্ষণীয় অবস্থান-ভূমিকা ছিল। কিন্তু বর্তমানে চট্টগ্রামসহ দেশে এসব সংগঠনের সাংগঠনিক অবকাঠামো অনেকটাই দুর্বল। কোথাও কমিটি থাকলেও কর্মসূচি নেই। অনেক উপজেলায় কমিটিও নেই। আবার সিংহভাগ কর্মকাণ্ডই পরিচালিত হয় নগরকেন্দ্রিক। ১৪ দল ও ২০-দলীয় জোটের বাইরের বাম দলগুলোর সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া যায়। বর্তমানে চট্টগ্রামে কর্মকাণ্ড চলমান আছে এমন বাম দলের মধ্যে আছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ-খালেকুজ্জামান), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ-মার্কসবাদী), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ-মোজাফফর), গণসংহতি আন্দোলন, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল (বদরুদ্দীন উমর)। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রাম নগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা নিয়েই সিপিবির একটি সাংগঠনিক জেলা কমিটি আছে। তবে উপজেলা ও নগরের কয়েকটি থানা কমিটি থাকলেও সেগুলো অনেকটা নিষ্ক্রিয়। সংগঠনটির অধিকাংশ কর্মসূচি নগরকেন্দ্রিক। এদিকে, বাসদের (খালেকুজ্জামান) নগর, দক্ষিণ ও উত্তর জেলা নিয়ে একটি আহ্বায়ক কমিটি আছে। নগরে পাহাড়তলী ও বায়েজীদ থানা কমিটি এবং জেলায় পটিয়া ও মিরসরাই উপজেলা কমিটি ছাড়া আর কোনো থানা কমিটি নেই। কর্মসূচিও নগরনির্ভর। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম নগর, দক্ষিণ ও উত্তর জেলা নিয়ে গণসংহতি আন্দোলনের একটি আহ্বায়ক কমিটি আছে। তা ছাড়া রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় আহ্বায়ক কমিটি ছিল। কিন্তু নভেম্বরের কেন্দ্রীয় সম্মেলন সামনে রেখে কমিটিগুলো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আর এ দলের কর্মকাণ্ডও নগরকেন্দ্রিক। সিপিবি চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম বলেন, ‘জাতীয় নানা ইস্যুতে আমরা দলীয় কর্মসূচি পালন করে আসছি। বর্তমানে তেল-গ্যাস রক্ষা, কর্ণফুলীর দখল-দূষণ রোধ ও জঙ্গিবাদবিরোধী নানা কর্মসূচি পালন করছি। ’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের আয়ের অন্যতম প্রধান তিন খাত হলো গার্মেন্ট শিল্প, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স ও কৃষি উৎপাদন। আমরা চাই এ তিন খাতকে গুরুত্ব দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন হোক। ’ বাসদ চট্টগ্রামের সমন্বয়ক মাহিন উদ্দিন বলেন, ‘সব উপজেলায় সাংগঠনিক কমিটি না থাকলেও কর্মী-সমর্থকরা আমাদের কর্মসূচিতে যোগ দেন। তবে আগামীতে সব উপজেলায় কমিটি করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি। ’ তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারের উন্নয়নের পক্ষে। তবে উন্নয়ন যদি হয় গণতান্ত্রিক ধারায়, তা আরও সাবলীল ও জনসমর্থিত হতো বলে আমরা মনে করি। ’ গণসংহতি আন্দোলনের আহ্বায়ক মারুফ হাসান রুমি বলেন, ‘আমাদের দলকে নতুন করে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। আগামী নভেম্বরে জাতীয় সম্মেলনের পর দেশজুড়ে নতুন করে সব কমিটি গঠন করা হবে। ’ বাম সংগঠনগুলোর অভিযোগ, জাতীয় নানা ইস্যুতে চট্টগ্রামসহ সারা দেশেই জোরালো কর্মসূচি পালিত হয়। কিন্তু এসব কর্মসূচির খবর গণমাধ্যমে যথাযথভাবে প্রচার হয় না। ফলে বাম দলগুলোর অনেক কর্মকাণ্ড দেশজুড়ে প্রকাশ পায় না।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow