Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৪০
ভালো নেই নারী শ্রমিকরা
কৃষকের স্বীকৃতি নেই, পোশাক খাতে বঞ্চনা, গৃহকর্মীরা উপেক্ষিত, আছে মজুরিবৈষম্য
জিন্নাতুন নূর
ভালো নেই নারী শ্রমিকরা

রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, লোকজনের নেতিবাচক কথা শুনে বছরের পর বছর বিভিন্ন খাতে শ্রম দিয়ে যাওয়ার পরও ভালো নেই বাংলাদেশের নারী শ্রমিক। পুরুষ শ্রমিকের সমান, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশি শ্রম দিয়েও নারী শ্রমিকরা পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে কম বা পুরুষ শ্রমিকের মোট পারিশ্রমিকের অর্ধেক টাকা পাচ্ছেন।

এমনকি নারীরা তাদের নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরে অতিরিক্ত কাজ করলেও বঞ্চিত হচ্ছেন সেই পারিশ্রমিক থেকে। কর্মক্ষেত্রে পুরুষ শ্রমিকরা যেখানে মোট কর্মঘণ্টার এক থেকে দেড় ঘণ্টা কম কাজ করেন, সেখানে নারী শ্রমিক খাওয়ার সময়টুকু বাদে বিশ্রামের জন্য আলাদা সুযোগও নিচ্ছেন না। দুধের শিশুকে কোলে নিয়ে বহু নারী শ্রমিককে প্রায়ই কাজ করতে দেখা যাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য নেই নারীবান্ধব পরিবেশ। গৃহশ্রমে জড়িত নারী শ্রমিকরা দেশে তো বটেই, এমনকি বিদেশেও গৃহকর্তার শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। আর পোশাক খাতে কর্মরত নারীদের সামান্য কাজের ভুলে সুপারভাইজার কর্তৃক গালিগালাজ ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। কৃষি খাতে কর্মরত নারীরা এখনো পাননি কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি। এর বাইরে নির্মাণ খাতের সঙ্গে জড়িত নারী শ্রমিকরা মজুরিবৈষম্যের শিকার হচ্ছেন প্রায়ই। সব মিলিয়ে পদে পদে বঞ্চনার শিকার     হতে হচ্ছে নারী শ্রমিককে। এমনকি নারী শ্রমিকদের অধিকাংশই মাতৃত্বকালীন ছুটি পাচ্ছেন না। সন্তান প্রসবের সময় ছুটি চাওয়ায় কাজ হারাতে হয়েছে অনেককেই।

নগরীর বেশ কয়েকটি গার্মেন্ট ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কর্মজীবী মায়ের সন্তানদের জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের হাতে গোনা দু-একটি ছাড়া বাকিগুলোতে নেই শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র বা ডে-কেয়ার সেন্টার। অথচ নারী শ্রমিকদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই গার্মেন্টে কাজ করছেন। বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে, বাংলাদেশের সচল গার্মেন্টগুলোর ৯০ শতাংশেরই ডে-কেয়ার সেন্টার নেই। কারখানার শ্রমিকরা জানান, কারখানায় বাচ্চা রাখা হলেও দুপুরের কোনো খাবার দেওয়া হয় না। শুধু বিকালে নাস্তা দেওয়া হয়। এ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়া এবং সাম্প্রতিক সময়ে কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শ্রমিকরা বাচ্চাদের কারখানার শিশুকক্ষে রাখার ব্যাপারে অনাগ্রহী। শ্রমিকনেতারা দাবি করেন, পোশাক কারখানাগুলোতে কাগজে-কলমে শিশুদের দিবাযত্ন কেন্দ্রের কথা বলা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে তা নেই। ফলে ছোট সন্তান আছে এমন নারী শ্রমিকরা কাজ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার হার কম হওয়া, সাংসারিক কাজের জন্য বাড়ি থেকে বেশি দূরে যেতে না পারা এবং নারীদের অসহায়ত্বের কারণে নারী শ্রমিকরা মজুরিবৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। শহরে উৎপাদনমুখী কারখানা, পোশাক খাত, খাদ্য ও কোমল পানীয় তৈরির কারখানা, বিড়ি শিল্প ইত্যাদিতে কম মূল্যে শ্রম পাওয়া যায় বলেই নারী শ্রমিকের চাহিদা বেশি। বেসরকারি সংস্থা অক্সফার্মের হিসাবে, বিগত এক দশকে দেশের বাজারে নারী শ্রমিকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় অর্ধকোটি, যার ৭৭ শতাংশই গ্রামীণ নারী। আর এদের অধিকাংশই মজুরিবৈষম্যের শিকার। ঢাকায় তো বটেই, এমনকি রাজধানী ও শহরের বাইরে এ বৈষম্য আরও বেশি।

কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি নেই : কর্মজীবী নারী সংগঠনগুলোর দেওয়া তথ্যে, নারী শ্রমিকদের ৭০ শতাংশই কৃষিকাজে জড়িত। এমনকি বিভিন্ন কৃষি উপকরণ তৈরির কাজও করছেন তারা। অথচ এত শ্রম দেওয়ার পর আজও কৃষক হিসেবে নারীর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই। নারীর শ্রমের নেই আর্থিক মূল্য। ফলে স্বীকৃতি না থাকায় একজন কিষানি এ পেশায় তার রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা ও অন্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিষেশজ্ঞরা বলছেন, নারীদের কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবীর বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ২০টির বেশি কৃষিকাজে নারীদের অবদান থাকা সত্ত্বেও তাদের কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না। এতে করে কৃষক হিসেবে একজন পুরুষ যেসব সুবিধা ভোগ করছেন, নারীরা তা পাচ্ছেন না। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নারী কৃষকের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তার মতে, নারীদের কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। মানিকগঞ্জের গৃহিণী সুফিয়া খাতুন বলেন, বিয়ের পর থেকে এ পর্যন্ত ২০ বছর তিনি তার স্বামীর সঙ্গে ধান, সরিষা এবং বিভিন্ন মৌসুমি শাক-সবজির চাষ করে আসছেন। এ জন্য আলাদা কোনো সুবিধা তিনি কখনো পাননি। বিষয়টি এমন যে, ঘরের বউ হিসেবে ঘরের অন্যান্য কাজের পাশপাশি স্বামীর সঙ্গে খেতের কাজ করাও দৈনন্দিন কাজের একটি অংশ।

পোশাক খাতে বঞ্চনা : অন্যদিকে পোশাকশিল্পে জড়িত নারী শ্রমিকদের পুরুষদের তুলনায় বেশি অবহেলা, নির্যাতন ও বঞ্চনার শিকার হতে হচ্ছে। কাজ করতে গিয়ে নারী শ্রমিকরা তাদের পুরুষ সহকর্মী ও সুপারভাইজারদের মাধ্যমে মানসিক, শারীরিক ও যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। এ ছাড়া ক্ষেত্রবিশেষে তারা মাতৃত্বকালীন ছুটি পাচ্ছেন না। বরং এ সময় তারা নানা অজুহাতে চাকরি হারাচ্ছেন। বিশেষ প্রয়োজনে, যেমন শারীরিক অসুস্থতায় ছুটিও পাচ্ছেন না। পুরুষদের তুলনায় প্রতিবাদী কম হওয়ায় তাদের থেকে অতিরিক্ত দায়িত্বও আদায় করে নেওয়া হচ্ছে। নগরীর কয়েকটি পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকরা জানান, কর্মস্থলে কাজের সময় সুপারভাইজার বা মালিকশ্রেণির কর্তাব্যক্তিদের দ্বারা তারা নানাভাবে লাঞ্ছিত হচ্ছেন। কিন্তু চাকরি হারানোর ভয়ে বেশির ভাগ শ্রমিক তাদের নিপীড়নের কথা কারও কাছে প্রকাশ করেন না। শ্রমিকনেতারা জানান, একটি কারখানায় মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা প্রেম-বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে, এমনকি অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়ার কথা বলে অনেক সময় একাধিক নারী শ্রমিকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেন। এ ছাড়া কারখানার সুপারভাইজাররা প্রায়ই নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কুরুচিপূর্ণ কথা বলেন। এমনকি শ্রমিকদের সামান্য ভুলের জন্য তাদের অশ্রাব্য ভাষায় কথা ও গায়ে হাত তোলেন তারা। দেশের শ্রম আইনে একজন নারীকে তার অনুমতি ছাড়া লেটনাইট ডিউটি করানোর নিয়ম নেই। যদি কোনো পোশাক কারখানা এমন করে, সে ক্ষেত্রে সেই নারীকে নিরাপদে তার গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের। কিন্তু দেশের পোশাক কারখানাগুলোতে এই নজির নেই। বেশ কয়েকজন নারী শ্রমিক জানান, লেটনাইট ডিউটি শেষে রাতে বাড়ি ফেরার পথে প্রায়ই তাদের বখাটেদের মুখোমুখি হতে হয়। বখাটেরা তাদের কুশ্রী মন্তব্য করে। মিরপুর শেওড়াপাড়ার পোশাক শ্রমিক রুমা বলেন, ‘মাইয়াগো অনেক সমস্যা। সব সমস্যার কথা পুরুষগোরে বলাও যায় না। যদি কখনো খুব প্যাডব্যথা করে, তখন সুপারভাইজারগো কাছে ছুটি চাইলে কয়, কিসের ব্যথা, যা কাজ কর। ’ গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশারেফা মিশু বলেন, ‘নারীদের রাত ৮টার পর কাজ করানোর নিয়ম না থাকলেও কারখানাগুলোতে রাতভর তাদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকরা চাকরি হারানোর ভয়ে নিজেদের অপ্রাপ্তি নিয়ে প্রতিবাদ করার সাহস পান না। এ ছাড়া আমাদের কারখানাগুলোতে নারীবান্ধব পরিবেশ তদারকির জন্য কোনো কার্যক্রমও নেই। ’

উপেক্ষিত নারী গৃহকর্মী : গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি, ২০১৫ প্রণয়ন করা হলেও এর বাস্তবায়ন না হওয়ায় নারী গৃহকর্মীরা এখনো নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তাদের বেতনবৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যে, দেশে গৃহশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। এদের মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু। এই শ্রমিকদের বেতনবৈষম্যের শিকার হওয়ার সঙ্গে তাদের নির্ধারিত মজুরির তুলনায় অধিক শ্রমের কাজ করতে হচ্ছে। এমনকি অনেকেই ঠিকমতো বেতন পান না। ঢাকার একটি বাসায় গৃহশ্রমের জন্য একজন নারীকে যেখানে থাকা-খাওয়াসহ দুই হাজার টাকা দেওয়া হয়, সেখানে একজন পুরুষ যদি বাড়ির কেয়ারটেকারের দায়িত্ব পালন করেন, তবে তাকে দেওয়া হয় পাঁচ হাজার টাকা। অর্থাৎ মজুরিবৈষম্য এখানেও স্পষ্ট। মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গৃহকর্মীরা গুরুতর নির্যাতনের শিকার না হওয়া পর্যন্ত আইনি সহায়তা পান না। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গৃহকর্মীদের নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র বের করা যায় না। এ ক্ষেত্রে এলিনা খান সরকারের তরফ থেকে গরিব-দুস্থদের আইনি সহায়তার জন্য পর্যাপ্ত মনিটরিং সেলের ব্যবস্থা করতে বলেন।

অন্যান্য খাতেও বঞ্চনা : এর বাইরে ইটভাটা, নির্মাণকাজ, মাটিকাটা ও চাতালের কাজসহ অপ্রাতিষ্ঠানিক অন্য কাজগুলোতে নারীরা পুরুষের সমান মজুরি পাচ্ছেন না। একজন পুরুষ দিনমজুর যেখানে গড়ে ৩০০ টাকা করে পান, সেখানে নারী শ্রমিক পান ২০০ থেকে ২২০ টাকা। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এ বৈষম্য আরও বেশি। ওয়ার্ল্ডভিশন বাংলাদেশ ও স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের যৌথ এক গবেষণাপত্র ‘নারীর জন্য অর্থনৈতিক ন্যায্যতা’ থেকে জানা যায়, নারীরা একই রকমের কাজের জন্য পুরুষের তুলনায় কম মজুরি পান। মাটিকাটা, ইট-পাথর ভাঙা ও নির্মাণকাজে জড়িত কয়েকজন নারী শ্রমিক জানান, তারা সকালবেলা আগে কাজ শুরু করে সন্ধ্যায় পুরুষদের পর বাড়ি ফিরে গেলেও পুরুষদের তুলনায় ৫০ থেকে ১০০ টাকা কম মজুরি পান। এ নিয়ে ম্যানেজার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে অভিযোগ জানালে নারীদের কাজ থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহম্মদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নারীশ্রম সস্তা বলেই মুনাফা বৃদ্ধির জন্য মালিকরা নারী শ্রমিকদের নিয়োগ দেন। দিনমজুর থেকে সব ধরনের অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ বেশি। জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কাঠামো না থাকার সুযোগে নারীদের কম মজুরি দিয়ে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে তদারকির প্রয়োজন আছে। তা না হলে নারী-পুরুষ শ্রমিকের মধ্যে বৈষম্য কমবে না।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow