Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৪২
নৌপথেও মৃত্যুর শেষ নেই
অবৈধ ট্রলারে যাত্রী পরিবহন
রাহাত খান, বরিশাল
অবৈধ ট্রলারে যাত্রী পরিবহন

নদ-নদীর দেশ বরিশালে অনুমোদনহীন ট্রলারে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। দক্ষিণের উপকূলীয় এলাকার নৌপথে যুগ যুগ ধরে প্রকাশ্যে উত্তাল নদী পাড়ি দিতে গিয়ে অথবা ঝড়-ঝঞ্ঝার কবলে পড়ে প্রায়ই এসব ট্রলার দুর্ঘটনায় বহু প্রাণহানি হচ্ছে। তবে বিআইডব্লিউটিএ বলেছে, শুধু পণ্য পরিবহনের জন্য নৌপথে ট্রলার চলাচলের অনুমোদন দেয় সমুদ্র পরিবহন অধিফতর। তবে সেই ট্রলারগুলোতে অবশ্যই ন্যূনতম ১৬ অর্শ্বশক্তির অধিক ক্ষমতা সম্পন্ন ইঞ্জিন স্থাপন করতে হবে। সর্বশেষ গত বুধবার বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার দাসেরহাট সংলগ্ন সন্ধ্যা নদীতে ট্রলার ডুবির ঘটনায় এ পর্যন্ত নারী-শিশুসহ ২৭ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে একজন। প্রায় অর্ধশত যাত্রী নিয়ে ট্রলারটি বানারীপাড়া থেকে উজিরপুরের হাবিবপুর যাওয়ার পথে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ দুর্ঘটনার ৬ দিন আগে হিজলা উপজেলার মৌলভীরহাট সংলগ্ন মেঘনায় লঞ্চের ধাক্কায় ট্রলারডুবে দুই ভাইবোনের মৃত্যু হয়। গত বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি বরগুনার তালতলী উপজেলাসংলগ্ন পায়রা নদে এবং ১১ জুন ভোলার চরফ্যাশনের ঢালচর-সংলগ্ন মেঘনায় পৃথক দুটি ট্রলারডুবির ঘটনায়ও ১৫ জনের প্রাণহানি হয়েছিল। নৌপথ নিরাপদ রাখার দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিএ এবং নৌপরিবহন অধিফতরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেছেন, ট্রলার শুধু পণ্য পরিবহনের জন্য। যেসব ট্রলারে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে সেগুলো অননুমোদিত। ট্রলার চলাচলের রুটগুলোও বিআইডব্লিউটিএর অনুমোদিত নয়। অথচ ট্রলারে যাত্রী পরিবহন বন্ধে বিআইডব্লিউটিএ কোনো আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এমনকি উপকূলীয় এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ নদ-নদীতে কতগুলো ট্রলারে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে তারও কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই সংস্থাটির কাছে। অননুমোদিত এসব ট্রলারে কোন শক্তির জোরে প্রকাশ্যে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে—এমন প্রশ্নে বরিশাল বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক ও নদীবন্দর কর্মকর্তা এবং নৌ-নিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বেশির ভাগ নদীর খেয়াঘাট ইজারা দেয় উপজেলা ও জেলা পরিষদ। তাদের ইজারার আওতায় কোন ধরনের নৌযানে যাত্রী পরিবহন করা হবে—সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। এই অস্পষ্টতার সুযোগে ইজারাদারের ছত্রছায়ায় ট্রলারে যাত্রী পরিবহন করা হয়। ওইসব ট্রলার চলাচলে বাধা দেওয়া হলে ইজারাদার এবং ইজারাদাতা প্রতিষ্ঠানের (উপজেলা ও জেলা পরিষদ) সঙ্গে বিআইডব্লিটিএর বিরোধ সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে বলে মনে করেন বরিশাল নদীবন্দর কর্মকর্তা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নদীবেষ্টিত বরিশাল বিভাগের সব জেলা-উপজেলায় প্রকাশ্যে ট্রলারে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। শতাধিক যাত্রী নিয়ে উত্তাল নদী মেঘনা, পায়রা, কালাবদর, বিষখালী, তেঁতুলিয়া, আগুনমুখা পাড়ি দেওয়া হয়। দক্ষিণের এমন অনেক ইউনিয়ন রয়েছে যেখানকার জনগণের উপজেলা সদরে যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে নিষিদ্ধ ট্রলার। এরমধ্যে সাগর ঘেঁষা পটুয়াখালী ও বরগুনা এবং মেঘনাবেষ্টিত ভোলা জেলায় চরের এক জনপদ থেকে অন্য জনপদে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে এসব ট্রলার। বরিশালেও বিভিন্ন স্বল্প দূরত্বে ট্রলারে নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। বরিশাল বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, পটুয়াখালীর গলাচিপা, রাঙ্গাবালি, কলাপাড়া উপজেলার চরবিশ্বাস, চরকলমি, চরমমতাজ, ভোলার ইলিশা ও লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীর হাট রুটে ট্রলারে যাত্রী পরিবহন করা হয়। বরিশাল নগরীর কালিবাবুর খেয়াঘাট থেকে চরমোনাই, কীর্তনখোলা নদীর নগরীর ট্রলারঘাট থেকে চরকাউয়া খেয়াঘাট, বাবুগঞ্জের মীরগঞ্জ খেয়াঘাট থেকে মুলাদী প্রান্তের খেয়াঘাট এবং সদর উপজেলার লাহারহাট থেকে ভোলার ভেদুরিয়া পর্যন্ত যাত্রীবাহী ট্রলার চলছে অহরহ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বরিশাল সদর উপজেলার লাহারহাট ফেরিঘাট থেকে আধা ঘণ্টার বেশি সময় উত্তাল কালাবদর ও তেঁতুলিয়া পাড়ি দিয়ে মেহেন্দিগঞ্জের শ্রীপুর, লেঙ্গুটিয়া এবং ভোলার ভেদুরিয়া পর্যন্ত যাত্রীবাহী ট্রলার চলছে। হিজলা থেকে মেঘনা পাড়ি দিয়ে মেহেন্দিগঞ্জের লালখাড়াবাদ, হিজলা-গৌরবদীর একতা বাজার ও মৌলভীর হাট রুটে আধাঘণ্টা পর পর যাত্রীবোঝাই করে ট্রলার চলছে। মুলাদী উপজেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন ইউনিয়ন রামচর, ছবিপুর ও বাটামারা যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম ট্রলার। মনপুরা থেকে ভোলা সদরে যেতে হলে প্রায় ৩ ঘণ্টা মেঘনা পাড়ি দিতে হয়। ১৫ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মৌসুমে ওই নৌপথে সব যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ করে দিয়ে শুধু বিআইডব্লিউটিসির সি-ট্রাক চালানো হয়। অথচ ওই সময়ে প্রায়ই সি-ট্রাক বিকল হলে ট্রলারই তাদের একমাত্র ভরসা। বরিশাল সমুদ্র পরিবহন অধিফতরের পরিদর্শক নুরুল করিম বলেন, ১৬ অর্শ্বশক্তির বেশি গতি হলে সেসব ট্রলারগুলোকে নদীপথে পণ্য পরিবহনের জন্য রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়। নৌকার আদলে তৈরি ট্রলারে যাত্রী পরিবহন নিষিদ্ধ। এগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসনের।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow