Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৫১
সাপের বিষে শত শত কোটি টাকা
সক্রিয় একাধিক চক্র
মোস্তফা কাজল
সাপের বিষে শত শত কোটি টাকা

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বেশ কয়েকটি চক্র গোখরা সাপের বিষ (কোবরা ভেনম) চোরাচালান ও কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত। গুলশান এলাকায় কোবরা ভেনম চোরাচালান ও কেনাবেচার কয়েকটি চক্র রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে কোবরা ভেনম উদ্ধার করেছে। বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী এক বছরে অভিযানে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বিষ উদ্ধার ও ২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। জানা যায়, এসব সাপের বিষ বাংলাদেশের নয়, ফ্রান্সের রেড ড্রাগন কোম্পানির তৈরি। এ বিষের বোতলের মুখ বিশেষ এক ধরনের যন্ত্র বা গানের সাহায্যে খুলতে হয়। বোতলের মুখে যে ছিপি তাতে বিশেষ যন্ত্র ঠেকিয়ে ফায়ার করলে বোতলের মুখ খুলে যায়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভেনম চোরাচালানের রুট হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইউরোপে এই বিষ নেশা জাতীয় দ্রব্য হিসেবে ব্যবহূত হয় এবং বিষ থেকে ওষুধ তৈরি করা হয়। সূত্র জানায়, চক্রের সদস্যরা দিনের বেলায় অন্য কাজ করেন। সন্ধ্যার পর সবাই একসঙ্গে বসেন। জানা যায়, প্রতি সেটের বোতলগুলোর গায়ে সুন্দর নকশা করা। বোতল গোলাকার। প্রতিটি বোতলে থাকে দুই পাউন্ড করে সাপের বিষ। দুটি বোতলে তরল বিষ থাকে চার পাউন্ড, দুটি বোতলে গুঁড়া (পাউডার) বিষ থাকে চার পাউন্ড ও দুটি বোতলে দানাদার বিষ থাকে চার পাউন্ড। ছয়টি বোতলে থাকে মোট ১২ পাউন্ড বিষ।   তরল বিষের রং নীল এবং গুঁড়া ও দানাদার বিষের রং সাদা। ছয়টি বোতলের এক সেট বিষের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

যেভাবে বিক্রি হয় বিষ : বিষের বোতলের ছবি নিয়ে বিক্রির জন্য ক্রেতা খোঁজা হয়। ক্রেতা পাওয়া গেলে ক্রেতার প্রতিনিধি এবং কোবরা ভেনম বিক্রেতার প্রতিনিধির মধ্যে প্রথমে ছবি দেখাদেখি হয়। এরপর হয় ভিডিও দেখাদেখি। পত্রিকার ওপর বিষের বোতল রেখে ছবি তুলতে হয় বা ভিডিও করতে হয় যাতে ভিডিও করার বা ছবি তোলার তারিখ স্পষ্ট দেখা যায়। ক্রেতার প্রতিনিধি টাকার নোটের ওপর তারিখ লিখে দেন। সেই নোটটি বোতলের ওপর রেখে ভিডিও করে বা ছবি তুলে দেওয়া হয়। সে ছবি বা ভিডিও দেখে ক্রেতার প্রতিনিধি নিশ্চিত হন, ওই ব্যক্তির কাছে কোবরা ভেনম আছে। এরপর বিক্রেতার কাছে চাওয়া হয় ক্যাটালগ। দাম নির্ভর করে ক্যাটালগের ওপর। ক্যাটালগ না থাকলে বিষ বিক্রি হয় না। কোনো ক্রেতা বা বায়ারকে প্রথমে মূল ক্যাটালগ দেওয়া হয় না। ক্যাটালগের রঙিন ফটোকপি দেওয়া হয়। এটা দেখে পছন্দ হলে দাম নির্ধারণ হয়। এর পরের ধাপে হয় স্যাম্পল পরীক্ষা। প্রতি সেট বোতলের সঙ্গে থাকে স্যাম্পল। বায়ার ল্যাবরেটরিতে স্যাম্পল পরীক্ষা করেন। স্যাম্পলের কোড নম্বর এবং মূল বোতলের কোড নম্বর এক থাকে। মূল বোতলের সেট বুঝে নেওয়ার সময় এই কোড নম্বর মিলিয়ে নেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞরা যা বলেন : দুরারোগ্য ব্যাধির ওষুধ নাকি তৈরি করা হয় এ বিষ দিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, কালো বাজারে বিষের এখনো চাহিদা আছে। এ ছাড়া ইউরোপে কোনো কোনো ওষুধ কোম্পানি সাপের বিষ কিনে থাকে। সাপের বিষ খুবই দামি। বাংলাদেশে এর কোনো ব্যবহার নেই। হাইটেকনোলজির ওষুধ কোম্পানি বাংলাদেশে নেই। রেড ড্রাগন কোম্পানির যে কোবরা ভেনম আমাদের দেশে ধরা পড়ছে তা এখানে ব্যবহারের জন্য আসে না।  

বিষ উদ্ধারের চিত্র : বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশ সদর দফতর জানায়, সর্বশেষ ২ আগস্ট চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার নীলমনিগঞ্জের পিটিআই মোড়ে প্রায় ১২ কোটি টাকা মূল্যের সাপের বিষসহ মোহাম্মদ সোহেল নামে (৪০) এক ব্যক্তিকে আটক করে বিজিবি। চুয়াডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তোজাম্মেল হক জানান, বিষ পাঠানো হয়েছিল নমুনা পরীক্ষার জন্য। কিন্তু বিষের বোতলের মুখ খোলা সম্ভব হয়নি। ৭ মার্চ রাজধানীর লালবাগের ইরাকি কবরস্থান মাঠের পশ্চিম পাশে একটি ৪র্থ তলা ভবনের নিচ তলার ফ্ল্যাট থেকে র‌্যাব ১২ পাউন্ড সাপের বিষ উদ্ধার করে। এর বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। চক্রটি সাপের বিষ বিদেশে পাচার করে আসছিল। র‌্যাব-১০ এর স্কোয়াড কমান্ডের (সিপিসি-১) শেখ জিল্লুর রহমান বলেন, আমরা যে বিষ উদ্ধার করেছিলোম তার প্যাকেট ইনট্যাক্ট ছিল। লেখা ছিল মেড ইন ফ্রান্স। ২০১৫ সালের ২৪ জুলাই সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার রাউত গ্রাম থেকে ১২ পাউন্ড গোখরার বিষ উদ্ধার করে র‌্যাব-৯। এ সময় সাতজনকে আটক করা হয়। বিষের মূল্য ছিল ৪৬ কোটি টাকা। ২০১৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জয়পুরহাটে একটি আবাসিক হোটেল থেকে ১২ পাউন্ড কোবরার বিষ উদ্ধার করেন র‌্যাব-৫ জয়পুরহাট ক্যাম্পের সদস্যরা। ওই চক্রের ৫ সদস্যকে আটক করা হয়। বিষের মূল্য ৬৮ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর উত্তরা থানা এলাকা থেকে ছয় বোতল সাপের বিষ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আনুমানিক মূল্য ১২ কোটি টাকা। ২০১০ সালে মতিঝিল থেকে র‌্যাব দুই আউন্স সাপের বিষ উদ্ধার করে। ২০০৯ সালের আগস্টে কারওয়ান বাজারের একটি আবাসিক হোটেল থেকে ১২ আউন্স সাপের বিষ উদ্ধার করে র‌্যাব। ২০০৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পাবনার ফরিদপুর উপজেলা থেকে ১২ পাউন্ড সাপের বিষ উদ্ধার করে র‌্যাব-১২।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow