Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৩ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:১০
গোপনে আসছে ড্রোন রোবট
বোমা সংযোজন করে হামলার আশঙ্কা গোয়েন্দাদের
মির্জা মেহেদী তমাল

বিমানবন্দর হয়ে গোপনে দেশে ঢুকছে অত্যাধুনিক অস্ত্র, শক্তিশালী ড্রোন (উড়ন্ত যান) আর রোবট। দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট খেলনার বাক্সে করে বিদেশ থেকে এসব প্রাণঘাতী সরঞ্জাম নিয়ে আসছে।

বিমানবন্দরে অস্ত্র, ড্রোন আর রোবটের বেশ কয়েকটি চালান আটকের ঘটনা পুলিশ ও গোয়েন্দাদের ভাবিয়ে তুলেছে। তাদের আশঙ্কা, নাশকতার জন্যই মিথ্যা ঘোষণায় এসব সরঞ্জাম দেশে আনা হতে পারে। তবে কী পরিমাণ সরঞ্জাম দেশে ঢুকেছে তা নিয়ে এখন চিন্তিত তারা।

বিগত এক বছরে শুধু শাহজালাল বিমানবন্দরেই আটক হয়েছে অর্ধ-শতাধিক ড্রোন। গত ২৭ সেপ্টেম্বর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নয়টি ‘পিস্তলসহ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জার্মানির দুই নাগরিককে আটক করা হয়। এর কয়েকদিন আগে একই বিমানবন্দরে আটক করা হয় ১৫ কেজি ওজনের একটি রোবট ও বিপুল পরিমাণ গোয়েন্দা সামগ্রী। এসব মালামাল আনা হয় খেলনা ঘোষণা দিয়ে। পুলিশ ও কাস্টমস বলছে, মিথ্যা ঘোষণায় এসব মালামাল ঢাকায় আনা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছে, রিমোট কন্ট্রোল চালিত এসব ড্রোন নিঃশব্দে ৪৫ কি.মি. বেগে ছুটে চলতে পারে। এসব ড্রোনে বোমা সংযোজন করে বিস্ফোরণ ও হামলার আশঙ্কা করছে গোয়েন্দারা। ক্যামেরা বসিয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ যে কোনো স্থাপনার ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করা যায় এসব ড্রোন দিয়ে। গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা গেছে খেলনা বলে এগুলো দেশে আনা হলেও আদৌ এগুলো খেলনা নয়। প্রাণঘাতী অস্ত্র হিসাবেই এসব ব্যবহার হয়ে থাকে। ড্রোন তৈরির সরঞ্জামসহ ইতিপূর্বে গ্রেফতার হওয়া জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের দুই সদস্যের কাছ থেকে তাদের ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনা সম্পর্কে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়। তাদের তৈরি ড্রোন ভারী বোমা নিয়ে ২০-৩০ তলা পর্যন্ত উঁচুতে উঠতে পারে। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নয়টি ‘আগ্নেয়াস্ত্র’সহ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জার্মানির দুই নাগরিক আনিসুল ইসলাম ও মনির বেন আলীকে গত মঙ্গলবার আটক করা হয়। তাদের তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি—এগুলো খেলনা পিস্তল, আসল নয়। বায়তুল মোকাররম মার্কেটের একটি অস্ত্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের এগুলো আনতে বলেছিল বলে তারা কাস্টমস ও গোয়েন্দাদের জানিয়েছেন। একটি কার্টনের ভিতর এসব অস্ত্র ছিল। কার্টনের ওপর ‘স্মল ফায়ার আর্মস’ লেখা। তবে প্রাথমিক পরীক্ষার পর গোয়েন্দারা বলছে, বিভিন্নভাবে এগুলো ব্যবহার করা যাবে। পিস্তলের ব্যারেল পরিবর্তন করলেই এগুলো আসল পিস্তলে রূপ নেবে। বুলেট ব্যবহার করে প্রাণহানি সম্ভব এই অস্ত্র দিয়ে। এ ছাড়া গ্যাসও ব্যবহার করা যাবে। জানা গেছে, এসব অস্ত্র দেশে আনছে যে সিন্ডিকেট। তার নেতৃত্বে রয়েছেন মনির এবং সাবু। বিমান বন্দরের একটি সংস্থা বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এই সিন্ডিকেট ড্রোন এবং রোবটও আনছে। এদিকে বিমানবন্দর থেকে আটক দুই ব্যক্তিকে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, এসব অস্ত্র তারা বাইতুল মোকাররম এলাকার অস্ত্র ব্যবসায়ী ইমরানের জন্য এনেছে। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মঈনুল খান বলেন, দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে যেটা সন্দেহ হবে সেটাই তল্লাশি করে দেখা হবে। কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। যেসব খেলনা পিস্তল আনা হয়েছে সেসবের অনুমতি নেই। বিমানবন্দর শুল্ক কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক বছরে ৫০টিরও বেশি চালকবিহীন ছোট উড়ন্ত যান বা ড্রোন আটক করা হয়। সর্বশেষ গত ২১ সেপ্টেম্বর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একজন যাত্রীর লাগেজ থেকে একটি ড্রোন জব্দ করেছে শুল্ক বিভাগের গোয়েন্দারা। ড্রোনটি প্রতি ঘণ্টায় ৪৫ কিলোমিটার বেগে চলতে পারে। এটির সঙ্গে উন্নতমানের ক্যামেরা আর সেন্সর রয়েছে বলে শুল্ক গোয়েন্দাদের পক্ষ থেকে বলা হয়। এর আগে ২৬ জুলাই শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পোস্টাল পার্সেলে আনা বোমা বহনে সক্ষম ড্রোন আটক করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। সিঙ্গাপুর থেকে আসা চার কেজি ওজনের দুটো প্যাকেটের পার্সেল থেকে ড্রোনটি আটক করা হয়। পার্সেলটি চার কেজি ওজনের দুটো প্যাকেটে সিঙ্গাপুর থেকে পোস্টাল সার্ভিসের মাধ্যমে আসে। এর পার্সেল নম্বর সি.কিউ-৩০৩৩৪৪৫২০, এস.কিউ অ্যান্ড সি.কিউ- ৩০৩৩৪৪৬৪৯ এস.কিউ। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে, ড্রোন নানা ধরনের নাশকতার কাজে ব্যবহার হতে পারে এই আশঙ্কায় সম্প্রতি বাংলাদেশে এর আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। সরকারের অনুমতি ছাড়া ড্রোন আমদানি করা যায় না। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. মইনুল খান জানান, আমদানি নীতি আদেশ অনুযায়ী এটি নিষিদ্ধ। এটিতে বোমা সংযোজন করে যে কোনো নাশকতা করা যেতে পারে। অধিকন্তু এতে ক্যামেরা বসিয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ যে কোনো স্থাপনার ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করা যায়। তিনি বলেন, নিরাপত্তার জন্য এর অপব্যবহার ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচিত। বর্তমানে এই ড্রোন আমদানি ও ব্যবহার সম্পর্কে নীতিমালা তৈরি প্রক্রিয়াধীন। আটক সব ড্রোনের বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

up-arrow