Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৩ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:১২
অব্যবস্থাপনায় বিতরণ শুরু দিয়ে স্মার্টকার্ড
নিজস্ব প্রতিবেদক
অব্যবস্থাপনায় বিতরণ শুরু দিয়ে স্মার্টকার্ড

নানা অব্যবস্থাপনা ও ভোগান্তির মধ্য দিয়ে গতকাল শুরু হয়েছে স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র বিতরণ। বিতরণের শুরুতেই অব্যবস্থাপনা, যান্ত্রিক ত্রুটি, কার্ড খুঁজে না পাওয়াসহ ভোগান্তির অভিযোগ করেছেন নাগরিকরা। প্রচার-প্রচারণার অভাবে অনেকে আগেভাগে কার্ড নিতে ভিড় করেছেন বিতরণ কেন্দ্রে। এতে ভোগান্তির মাত্রা আরও বেড়ে যায়। সফটওয়ারের ত্রুটির কারণে অনেককে আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে স্মার্টকার্ড না পেয়ে ফিরে যেতে হয়েছে। অন্যদিকে স্মার্টকার্ডের তথ্য ভুল, ছবি অস্পষ্ট, সার্ভারে ছবি না থাকাসহ অনেক সমস্যাও দেখা গেছে। সরেজমিনে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ ও উত্তরা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র ঘুরে এসব নানা অব্যবস্থাপনার তথ্য পাওয়া গেছে। এদিকে প্রথম দিনে গতকাল সকালে উপচে পড়া ভিড় থাকলেও দুপুরের পর থেকে লোকজনের উপস্থিতি কমতে থাকে। এ সময় অনেক কর্মকর্তাকে বসেও থাকতে দেখা গেছে। প্রচার কম থাকায় এমনটি হয়েছে বলে অনেকে জানিয়েছেন। ইসি কর্মকর্তারা বলেছেন, পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই কার্ড বিতরণ শুরু করায় এমন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত লোকবলের অভাবের কথাও বলেছেন অনেকে।   রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও কয়েকজন বিশিষ্টজনের হাতে স্মার্টকার্ড তুলে দেওয়ার পরদিন গতকাল থেকে সাধারণ ভোটারদের মধ্য উন্নতমানের এ জাতীয় পরিচয়পত্র বিতরণ শুরু করে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে গতকাল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উত্তরায় এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের রমনা এলাকায় পৃথকভাবে শুরু হয় স্মার্টকার্ড বিতরণ। এ ছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার গতকাল বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দাদের হাতে স্মার্টকার্ড তুলে দিয়েছেন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, আমরা যতটা চ্যালেঞ্জ মনে করেছিলাম, ততটা মনে হচ্ছে না। বিভিন্ন মসজিদে ইমামদের মাধ্যমে বলা হয়েছে। আশা করছি, সবকিছু ভালোই হয়েছে।

ঢাকা বিভাগীয় আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মিহির সারওয়ার মুর্শেদ জানান, প্রথম দিনেই মানুষের ব্যাপক উৎসাহের কারণে সকালে বিতরণ কেন্দ্রে ব্যাপক ভিড় লেগেছিল। নির্ধারিত এলাকার বাইরের কিছু লোক ভুল করে কার্ড নিতে আসায় কিছুটা বিঘ্ন হয়েছে। সফটওয়্যারের ত্রুটির কারণে কিছু ক্ষেত্রে স্মার্টকার্ড বাছাই করেও তাদের হাতে তুলে দেওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্টদের আঙ্গুলের ছাপ ও আইরিশের প্রতিচ্ছবি নিয়ে রাখা হয়েছে, যারা পরে এসে কার্ড সংগ্রহ করতে পারবেন। প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আগামী দিনে আরও সুচারুভাবে কাজ করা সম্ভব হবে বলে আশা করেন মিহির। এ ছাড়া কিছু বয়স্ক নাগরিকের ক্ষেত্রে সব আঙ্গুলের ছাপ পাওয়া যাচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে ওইসব আঙ্গুলের ছাপ না নিয়েই কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান ইসির কর্মকর্তারা।

দুপুর ২টার পরে উত্তরা হাইস্কুল কেন্দ্রে স্মার্টকার্ড নিতে আসেন সামরিক কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম। তার ১০ আঙ্গুলের ছাপ ও চোখের আইরিশ নেওয়ার পর সফটওয়্যারে স্মার্টকার্ডটি কোথায় রয়েছে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে অপারেটর কামরুল হাসান বলেন, আমরা তার ঠিকানা ও যোগাযোগ নাম্বার রেখে দিয়েছি। কারিগরি ত্রুটির কারণে কার্ড কোন বক্সে সাজানো রয়েছে তা শনাক্ত করতে পারিনি। আমাদের টেবিলে এ পর্যন্ত এমন ১১টি ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি বিতরণ কেন্দ্রের টেকনিক্যাল এক্সপার্ট ফয়সাল মোহাম্মদ শাহনেওয়াজকে জানালে তিনি বলেন, এই কেন্দ্রের প্রায় চার হাজার কার্ড রয়েছে। বেলা দুটা পর্যন্ত ২৫ জন অপারেটর ৭০০ কার্ড বিতরণ করতে পেরেছেন। সবার স্মার্টকার্ড বিতরণকেন্দ্রে এসেছে কিনা তা যাছাই-বাছাই করা হচ্ছে। কারিগরি ত্রুটি ও লোকবল সংকটের কারণে এমন জটিলতা হচ্ছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিকালে উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের নাসরিন হক কার্ড নিতে এসে জানতে পারেন ওই কেন্দ্রে কেবল ১ ও ২ নম্বর সেক্টরের কার্ড বিতরণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, কখন কোথায় কার কার্ড বিতরণ করা হবে তার কোনো ভালো প্রচারণা দেখছি না। আমি কার্ড কবে পাব তাও জানাতে পারছেন না, এভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেন নাসরিন। এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রথম স্মাটকার্ড পেয়েছেন সাহানা আক্তার খানম। সকাল সাড়ে ৯টায় রমনা থানার সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ ক্যাম্প থেকে তিনি কার্ডটি সংগ্রহ করেন। সাহানা আক্তার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন অংশের কাকরাইলের ভোটার। এ ছাড়া সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ কেন্দ্র থেকে কার্ড সংগ্রহ করতে এসেছিলেন ফৌজিয়া হক। তিনি বলেন, আমার পরিবারের সাতজন সদস্য একই সঙ্গে ভোটার আইডি কার্ডের আবেদন করেছেন। কিন্তু স্মার্টকার্ড পাওয়া গেল তিনজনের। সিদ্ধেশ্বরীতে মো. হালিম খান তুহিন বলেন, স্মার্টকার্ড পেয়েছি কিন্তু বাপের নাম ভুল। বিষয়টি কাকে জানাব বুঝতে পারছি না। কার্ড সংগ্রহ করতে আসা হামিদা গনি বলেন, অনেক কষ্টে প্রায় এক ঘণ্টা পর কার্ড হাতে পেলাম। কাজে অনেক মিস ম্যানেজমেন্ট, সমন্বয়ের অভাব। এ ছাড়া রহমত উল্লাহ নামের একজন জানান, কার্ড পেতে অনেক সময়ে লেগেছে। প্রথমে আমাকে আগামী ৯ অক্টোবর আসতে বলা হয়েছিল। পরে অনেক ঘোরাঘুরির পরে কার্ড পেলাম। সিদ্ধেশ্বরীতে নির্বাচন কমিশনের কারিগরি বিভাগের কর্মী খান মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ বলেন, আঙ্গুলে কাটা দাগ থাকলে, ভারী কাজ করতে করতে আঙ্গুলের রেখা মুছে গেলে এবং ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে সমস্যা হচ্ছে।

স্মার্টকার্ড পেলেন বিলুপ্ত ছিটমহলবাসী

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র পেলেন কুড়িগ্রামের বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার ভোটাররা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ গতকাল দুপুরে বিলুপ্ত ছিটের বাসিন্দাদের হাতে স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র তুলে দেন। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার কালিরহাট বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে এক অনুষ্ঠানে স্মার্টকার্ড বিতরণ উদ্বোধন করেন সিইসি। এর মধ্য দিয়ে ১ বছর ২ মাস পর ভোটার হওয়াসহ নাগরিকত্বের পূর্ণতা পেল ছিটবাসীরা। প্রথম দিনে প্রায় ৯৮৫ জনের মাঝে জাতীয় পরিচয়পত্র বিতরণ করা হয়। ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে জেলার অভ্যন্তরে বিলুপ্ত অন্য ছিটমহলের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের ভোটারদের মাঝে স্মার্টকার্ড বিতরণ করা হবে। স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ বলেন, আপনারা দীর্ঘ ৬৮ বছর অনেক কষ্ট করেছেন আর কষ্ট করতে হবে না। এই স্মার্টকার্ড পাওয়ার মাধ্যমে আপনারা আপনাদের নাগরিক অধিকার পাবেন।

নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব মোখলেসুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক, মোহাম্মদ আবু হাফিজ, শাহনেওয়াজ, নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব বেগম জেসমিন টুলী, কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক খান মো. নুরুল আমিন ও পুলিশ সুপার তবারক উল্ল্যা প্রমুখ।

স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়ে খুশি বিলুপ্ত ছিটের মানুষেরা। স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া দাসিয়ার ছড়ার ছোট কামাত গ্রামের ইব্রাহীম খাঁ (৬০) জানান, শেষ বয়সে এসে বাংলাদেশের পরিচয়পত্র পেয়েছি। এখন থেকে ভোট দিতে পারব, জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে সব জায়গায় ঘুরতে পারব—এটাই বড় পাওয়া। দাসিয়ারছড়ার মোছা. চম্পা খাতুন বলেন, আগে আমাদের ছেলেমেয়ে ভুয়া পরিচয়ে লেখাপড়া করত এখন আর তা করতে হবে না। আমরা এই জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে দেশের সব সুবিধা ভোগ করব। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছ থেকে স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়ে মহা আনন্দিত হয়েছেন মছিরন বেগম, মজনু শেখসহ ছিটমহলের বাসিন্দারা।

up-arrow