Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বুধবার, ৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৪ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:০৪
শুল্ক ফাঁকি বন্ধে ডগস্কোয়াড
চোরাচালান বন্ধে যোগ হচ্ছে হেলিকপ্টার নৌ-জাহাজও
রুহুল আমিন রাসেল

দেশে চোরাচালান ও শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে অর্থ পাচার এবং জঙ্গি অর্থায়নের নিবিড় যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছে রাজস্ব প্রশাসন। তাই দেশের সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষায় সন্ত্রাসবাদ, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য অবৈধ বাণিজ্য সঙ্কুচিত করতে নিজেদের কার্যক্রম শক্তিশালীকরণের ওপর নজর দিয়েছে শুল্ক প্রশাসন। সারা দেশের জল-স্থল ও আকাশপথে অবৈধ বাণিজ্যসহ আর্থিক অপরাধ ঠেকাতে ৩ হাজার ১৬৮ জনবল কঠামো, ৩০টি ডগস্কোয়াড, ২টি হেলিকপ্টার এবং ৫টি সামুদ্রিক জাহাজের প্রস্তাব করেছে শুল্ক গোয়েন্দা। সংস্থাটি বর্তমানে মাত্র ১৮৪ জনবল দিয়ে সারা দেশে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।

সরকারের রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠান জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমানের কাছে গত ২ সেপ্টেম্বর শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুর খান সংস্থাটির সাম্প্রতিক বর্ধিত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তন ও সম্প্রসারণের একটি প্রস্তাব দিয়েছেন।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুর খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমাদের গোয়েন্দা কার্যক্রমে সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রস্তাবিত নতুন সাংগঠনিক কাঠামো অনুমোদনে সরকারের সুবিবেচনার জন্য পেশ করেছি। এটা দ্রুত সময়ে অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ এবং জনবল নিয়োগের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে প্রত্যাশা করছি। এই প্রস্তাব অনুযায়ী— প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করলে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিরাপত্তাসহ অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতর আরও দৃঢ় ভূমিকা পালন করবে। মূলত এ জন্যই ৩ হাজার ১৬৮ জনবল কঠামো, ৩০টি ডগস্কোয়াড, ২টি হেলিকপ্টার এবং ৫টি সামুদ্রিক নৌজাহাজসহ অন্যান্য লজিস্টিকস এবং অফিস যন্ত্রপাতির চাহিদা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এনবিআরকে দেওয়া ওই প্রস্তাবে বলা হয়, শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতর চোরাচালান ও শুল্ক ফাঁকি প্রতিরোধে দৃশ্যমান বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে আসছে। ফলে সংস্থাটির ভূমিকা বাড়ায় এবং দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় কার্যক্রম আরও অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। পুরো বাংলাদেশই বর্তমানে শুল্ক গোয়েন্দার কর্মক্ষেত্র। এর সাংগঠনিক কাঠামোতে মোট জনবল রয়েছে ৩৩৪ জন (সুপারনিউমারিসহ)। তবে বর্তমানে কর্মরত আছে মাত্র ১৮৪ জন। মাঠ পর্যায়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে ১১০ জনের মধ্যে কর্মরত আছে মাত্র ৬৪ জন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সীমান্ত ও শুল্ক বন্দরসমূহের তুলনায় শুল্ক গোয়েন্দার বর্তমান এই জনবল খুবই অপ্রতুল। এই সীমিত সংখ্যক জনবল দিয়ে দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সামনে রেখে এবং ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনা করে শুল্ক গোয়েন্দার কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি।

ওই প্রস্তাবে শুল্ক গোয়েন্দার মহাপরিচালকের পদটি তৃতীয় গ্রেড থেকে দ্বিতীয় গ্রেডে উন্নীত করে পদটিকে সদস্য বা চিফ কমিশনারের মর্যাদা প্রদান করতে বলা হয়েছে। সংস্থাটির সদর দফতরে গোয়েন্দা ফরেনসিক ল্যাবরেটরি ও দেশের ৮টি বিভাগীয় শহরে পৃথক সদর দফতর স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া সদর দফতরের কার্যক্রম গতিশীল করতে অতিরিক্ত মহাপরিচালকের নতুন ৩টি পদ সৃষ্টি করে তা তৃতীয় গ্রেডে উন্নীতকরণ এবং এই ৩টি পদের একেকজনের বিভাগ হবে যথাক্রমে— গোয়েন্দা, অপারেশন ও মানি লন্ডারি ও ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন বিভাগ। বাংলাদেশে যেসব অর্থ পাচার হয়, তার অধিকাংশই বাণিজ্যের আড়ালে সম্পন্ন হয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি—জিএফআইর প্রতিবেদন ২০১৫’র তথ্য উল্লেখ করে বলেছে, বাংলাদেশ থেকে ২০১৪ সালে ৭৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। গত ১০ বছরে বিদেশে প্রায় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার স্থানান্তরিত হয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়। এই অর্থ পাচারের প্রায় ৮০ শতাংশ সংঘটিত হয় বাণিজ্যের মাধ্যমে। ফলে অর্থ পাচার আইনের সংশোধনী অনুযায়ী— শুল্ক গোয়েন্দার এই নতুন দায়িত্ব পালনের জন্য সক্ষমতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে জনবল ও সাংগঠনিক কাঠামো সংশোধন করা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। শুল্ক গোয়েন্দা প্রস্তাবে আরও বলেছে, রাজস্ব আহরণ, সুরক্ষা ও নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখতে সম্প্রতি স্বর্ণ, মাদক, মুদ্রা ও অন্যান্য ক্ষতিকর পণ্যের চোরাচালান প্রতিরোধে শুল্ক গোয়েন্দার কার্যক্রম দৃশ্যমান এবং সংসদে প্রশংসিত হয়েছে। বর্তমানে সন্ত্রাসবাদ বিস্তারের পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় এনে শুল্ক গোয়েন্দার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। সম্প্রতি এই দফতর পরিচালিত অপারেশন জাতীয় নিরাপত্তায় বিশেষ অবদান রেখেছে। চলতি অর্থ আইন-২০১৬’র মাধ্যমে শুল্ক আইনের বিদ্যমান শুল্ক কর্মকর্তাদের শুল্ক সংক্রান্ত যে কোনো অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি মোতাবেক পুলিশের ন্যায় অপরাধ তদন্ত করার দায়িত্ব শুল্ক গোয়েন্দাকে দেওয়া হয়েছে। আবার মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সংশোধনী অনুযায়ী— চোরাচালানসহ ৫টি অপরাধের অর্থ পাচার সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে শুল্ক গোয়েন্দাকে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের প্রস্তাবিত জনবলের সার-সংক্ষেপে দেখা যায়,  একটি মহাপরিচালক পদের সঙ্গে ৪টি অতিরিক্ত মহাপরিচালকের পদ সৃষ্টি করতে বলা হয়েছে।

এর সঙ্গে নতুন অন্য পদগুলো হলো— ১০টি পরিচালক, ১৮টি যুগ্ম-পরিচালক, ৮২টি উপ/সহকারী পরিচালক, ১টি চিফ কেমিস্ট, ১টি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, ২টি টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার, ৬টি পাইলট, ৪টি ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার, ১টি প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, ৫৬টি প্রোগ্রামার, ১২৮টি রাজস্ব কর্মকর্তা, ৫১৮টি সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা, ৬৩টি সহকারী প্রোগ্রামার, ৬৯টি কম্পিউটার অপারেটর, ১৮টি অফিস সুপাররিনটেনডেন্ট, ৫৫টি প্রধান সহকারী, ১২৫টি উচ্চমান সহকারী, ৫টি সাঁট-লিপিকার কাম-কম্পিউটার অপারেটর, ২৮টি সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর, ৫৯টি ক্যাশিয়ার, ১৫৫টি অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর, ১৫১টি ডাটা এন্টি অপারেটর, ১৮২টি গাড়ি চালক, ৬৫টি ফটোকপি মেশিন অপারেটর, ১১২টি ডেসপাস রাইডার, ৬৯টি সাব-ইন্সপেক্টর, ৫টি ডগ হ্যান্ডেলার ট্রেইনার, ৭২৪টি সিপাই, ৪০টি ডগ হ্যান্ডলার, ১০টি স্পিড বোট চালক, ২৫৪টি অফিস সহকারী/এম.এল.এস.এস, ৫৭টি নৈশপ্রহরী ও ৯০টি সুইপার পদে মোট ৩ হাজার ১৬৮ জনের জনবলের পাশাপাশি ৩০টি ডগ স্কোয়াডের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow