Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বুধবার, ৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৪ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:০৫
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর
চাঁদাবাজি কর ফাঁকির মহোৎসব
মাহমুদ আজহার ও সরকার হায়দার

দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া সীমান্তে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর ক্রমেই স্থবির হয়ে পড়ছে। ঘাটে ঘাটে দেদার চলছে চাঁদাবাজি। পণ্যসামগ্রী পারাপারে চলছে বিপুল কর ফাঁকি। অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন আমদানি-রপ্তানিকারকরা। কাস্টমস, রাজস্ব কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী সংগঠনের একাংশের পাশাপাশি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের যোগসাজশে চলছে লুটপাট। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। সরেজমিনে ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। আজ স্থলবন্দর সরেজমিনে পরিদর্শনে যাচ্ছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান। তিনি সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলবেন। রাজস্ব আয় কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়েও সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দেবেন। জানা যায়, চলতি বছরের জুন মাসে ভুয়া এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খুলে ভুয়া এনওসি দিয়ে ১১ কোটি টাকার ভারতীয় তুলা আমদানি করার ঘটনায় প্রতারণার শিকার হয় ভারতের আহম্মেদাবাদের মেসার্স দুরজেশ ইমপে্কট প্রাইভেট লিমিটেড। রপ্তানিকারক এ প্রতিষ্ঠান দূতাবাসের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের কাছে ঘটনার বিচার দাবি করে আবেদন করে। এ জালিয়াতির ঘটনা ফাঁস হওয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ঘটনা তদন্তে কাস্টমসের বুড়িমারী স্থলবন্দরের ডেপুটি কমিশনার আবদুল আলিমকে প্রধান করে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা আনিসুল ইসলাম এবং সহ-রাজস্ব কর্মকর্তা ফরিদুজ্জামানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, এ ঘটনায় এই স্থলবন্দর দিয়ে ভুয়া এলসির মাধ্যমে ভারত থেকে আমদানি করা ১১ কোটি টাকা মূল্যের কটন লোপাট করা হয়েছে। এরসঙ্গে জড়িত বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের একজন সহকারী কমিশনার (কাস্টমস), রাজস্ব কর্মকর্তা, দুই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও আমদানিকারক একটি সিএন্ডএফ এজেন্ট। আর লোপাট মালামালের বিক্রয়লব্ধ অর্থের ১১ কোটি টাকা কাস্টমসের তৎকালীন বিভিন্ন কর্মকর্তা ও ওই সিএন্ডএফ এজেন্ট এবং আমদানিকারক অপর একটি প্রতিষ্ঠান অন্যরা ভাগবাটোয়ারাও করে নেন। এ ঘটনায় মামলা হলেও কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। জানা যায়, কিছুদিন আগে মিথ্যা ঘোষণায় আনা প্রায় চার কোটি টাকা মূল্যের ভারতীয় সাইকেল পার্টস আটক করে ১৮ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন। চলতি জুন মাসে ভুয়া এলসি খুলে (লেটার অব ক্রেডিট ) এনওসি দিয়ে ১১ কোটি টাকার ভারতীয় তুলা লুটপাট করে বন্দরের প্রভাবশীলা। এ ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সীমাহীন দুর্নীতি ও সিএন্ডএফ এজেন্টের দৌরাত্ম্য ক্রমেই বাড়ছে। সেইসঙ্গে ঘাটে ঘাটে বাড়ছে চাঁদাবাজিও। এই বন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারকরা ব্যবসা-বাণিজ্যে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। শুধু তাই নয়, সরকারও বিশাল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বন্দর সূত্র জানায়, প্রশাসনের নজরদারির অভাবে ফলমূল, সাইকেলসহ আমদানি করা নানা পণ্যে ওজন কম দেখিয়ে সরকারি রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ করে দেওয়া হয়। অবৈধ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এ সুযোগ দেওয়ায় সংশ্লিষ্টরা ইতিমধ্যে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। ২০১৫ সালের ১৯ মে এ স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানি করা দুই হাজার ৪০০টি বাইসাইকেল শুল্ক ফাঁকি দিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা আটক করে। এরমধ্যে ৪৮০টি বাইসাইকেলের রাজস্ব পরিশোধের কাগজপত্র ও বন্দর কর্তৃপক্ষে অনাপত্তিপত্র ছিল। এ সময় পাঁচটি ট্রাকের আটজন চালক ও সহকারীকেও আটক করা হয়। স্থানীয় কাষ্টমস সূত্রে জানা যায়, গত ২০১১-২০১২ অর্থবছরে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে এক কোটি ৮২ লাখ ৩৬ হাজার ১৮০ ইউএস ডলারের পণ্য ভারত ও নেপালে রপ্তানি করে ১১ কোটি ১৮ লাখ ৭২ হাজার ৭৬৪ টাকা রাজস্ব (আমদানি শুল্ক) আদায় হয়েছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২ কোটি ৯৪ লাখ ১৬ হাজার ২৯০ ইউএস ডলারের পণ্য রপ্তানি করে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১৩ কোটি ৮২ লাখ ২৬ হাজার টাকা। ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে রাজস্ব আয় হয়েছে ২৩ কোটি ৩৫ লাখ ৫৬১ টাকা। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে আয় হয়েছে ৩৬ কোটি ৭৬ লাখ ৩ হাজার ৩০৪ টাকা। ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে ৬০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আদায় হয়েছে মাত্র অর্ধেক। গত অর্থবছর থেকে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৬ কোটি টাকা। আগস্ট পর্যন্ত আদায় হয়েছে মাত্র ১৩ লাখ টাকা। তবে এ ব্যাপারে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কোনো কর্মকর্তাই কথা বলতে রাজি হয়নি। সম্প্রতি বেশ কয়েকজন আমদানি-রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীর স্থলবন্দরের নানা অনিয়মের কথা বাংলাদেশ প্রতিদিনের কাছে তুলে ধরেন। নাম না প্রকাশের শর্তে একাধিক ব্যবসায়ী জানান, এই বন্দরে ক্ষুদ্র অথচ প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট রাজস্ব ফাঁকিসহ নানা অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত। কোনো পণ্যসামগ্রী আমদানি-রপ্তানি করতে গেলেই প্রত্যেক ট্রাক বাবদ কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে মোটা অঙ্কের ঘুষ প্রদান করতে হয়। প্রত্যেক পরিবহন থেকে ভারতীয় ১০০ রুপি করে চাঁদা দিতে হয়। কথিত আমদানি-রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাবান্ধা ইউনিয়ন পরিষদ এবং বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর কুলি শ্রমিক ইউনিয়নের নামে এ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এটা সরকারের কোনো ফান্ডে যাচ্ছে না। তিনি জানান, এই টাকার একটি অংশ বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাবান্ধা ইউনিয়ন পরিষদকে দেওয়া হয়। আদায়কৃত টাকার ১০ ভাগ দেওয়া হয় কুলি শ্রমিক ইউনিয়নকে। সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের কল্যাণ ফান্ডের নামে এই টাকা উত্তোলন করা হলেও তা গুটিকয়েক নেতার পকেটে যায়। অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি তফিজুল ইসলাম জানান, কোনো ব্যবসায়ীই এই অনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত নয়। এই চাঁদার কারণে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা পাথরের মূল্য বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়েছেন। এ কারণে আমদানিকারকরা এই বন্দরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।  অ্যাসোসিয়েশনের কোষাধ্যক্ষ মোজাফ্ফর হোসেন জানান, আদায় করা এই টাকার হিসাব আমার কাছে নেই। শুরু থেকেই বিরোধিতা করছি বলে আমাকে হিসাব জানানো হয় না। তবে অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মেহেদী হাসান খান বাবলা জানান, ব্যবসায়ীদের কল্যাণের জন্যই এই টাকা নেওয়া হয়। ১০ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। তা থেকে কল্যাণমূলক বিভিন্ন কাজ এবং ইফতার পার্টিতে খরচ হয়েছে ৬ লাখ। চাঁদা আদায়ের রশিদে আদায়কারী তিন প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ থাকলেও বাংলাবান্ধা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কুদরত-ই-খুদা মিলন ইউনিয়ন পরিষদের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, কে বা কারা করছে আমি জানি না।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow