Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:১৩
বিলাসবহুল ৩৬ গাড়ি অবশেষে নিলামে
রুহুল আমিন রাসেল
বিলাসবহুল ৩৬ গাড়ি অবশেষে নিলামে

এবার শতকোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি দেওয়া অবৈধ গাড়ি উঠছে নিলামে। যদিও গেল এক বছরে ৩৬টি অবৈধ বিলাসবহুল গাড়ি আটকের ঘটনায় গ্রেফতার হয়নি কেউ। গাড়িগুলো আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা, মডেল পরিবর্তন, শুল্কমুক্ত ও পর্যটন সুবিধার অপব্যবহার করে দেশে আনা হয়। কমপক্ষে ২৫ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ২২ কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা, এমন দুই শতাধিক গাড়ি ছড়িয়ে আছে সারা দেশে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিচারিক প্রক্রিয়া অনেকটা এগিয়ে গেছে। এরপর যেসব মালিক শুল্ক দিয়ে গাড়ি ফেরত নেবেন না, সেগুলো নিলামে উঠবে। তবে কাস্টমস আদালত একজনের গাড়ি শুল্ক নিয়ে ফেরতের রায় দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ হাইকোর্টে গেছেন। এতে কিছু রায় সরকারের পক্ষে এসেছে। বাকি রায়গুলো সরকারের পক্ষে যাতে আসে, সে জন্য সর্বোচ্চ প্রয়াস চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আটক গাড়িতে সরকারের প্রায় ১০০ কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। বিলাসবহুল এই অবৈধ গাড়িগুলো আটকের ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করতে পারিনি। তবে আমরা গ্রেফতার করব।’ জানা গেছে, ব্যবসায়ী-শিল্পপতি নয়, শিক্ষক ও শোবিজ তারকারাও ব্যবহার করছেন অবৈধ দামি বিলাসী গাড়ি। দু-একটি রুলস রয়েলস নয়, বিএমডব্লিউ-পোর্শা-মার্সিডিজ-প্রাডো গাড়িতে সয়লাব অভিজাত এলাকাগুলো। মিথ্যা ঘোষণায় শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা এসব গাড়ির মালিকরা ধরা খাওয়ার ভয়ে রাস্তায় এগুলো রেখে পালিয়ে যাচ্ছেন। উদ্ধারও হচ্ছে। সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধ গাড়ি ধরার অভিযানে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ৩৬টি বিলাসী গাড়ি আটক হয়েছে। জানা গেছে, অবৈধভাবে তিন শতাধিক বিলাসবহুল গাড়ি ২০১০ থেকে ২০১৩ সালে ‘কার্নেট ডি প্যাসেঞ্জার’ সুবিধায় বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর মধ্যে প্রায় দেড়শ গাড়ি ফেরত যায়। বাকি দেড় শতাধিক গাড়ি মালিকানা বদল করে জাল দলিল ও ভুয়া রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে ব্যবহার করা হচ্ছে। মিথ্যা ঘোষণা ও শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আমদানি করা কয়েক শ’ অবৈধ গাড়ি দেশে আছে। এনবিআর ও শুল্ক গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, আগে তাদের ধারণা ছিল, কেবল বড় ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরাই কোটি কোটি টাকা দামের গাড়ি ব্যবহার করেন। কিন্তু তাদের সে ধারণা ভেঙে গেছে সম্প্রতিক সময়ে সাবেক একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-এমপি, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একজন শিক্ষক ও শোবিজ জগতের এক তারকার কাছ থেকে অবৈধভাবে ব্যবহার করা বিলাসী গাড়ি উদ্ধারের মধ্য দিয়ে। শুল্ক গোয়েন্দা জানিয়েছে, সর্বশেষ গত সপ্তাহে চট্টগ্রামে দুটিসহ মোট ৩৬টি গাড়ি আটক করা হয়েছে। এর আগে ২২ সেপ্টেম্বর মিতসুবিশি ব্র্যান্ডের গাড়ি মৌলভীবাজার থেকে জব্দ করা হয়। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা এই গাড়িটি ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছিল। ৫ সেপ্টেম্বর মৌলভীবাজারের শাহবন্দর উপজেলার পতন গ্রামের বাসিন্দা সাজ্জাদুর রহমানের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে শুল্ক গোয়েন্দা নিশান গাড়ি জব্দ করে। এই গাড়িটির প্রকৃত মালিক সাজ্জাদের মামা রুবেল আহমেদ বলা হলেও কোনো দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সিলেটের সুবিদবাজার লন্ডনী রোড থেকে ২ সেপ্টেম্বর চার হাজার ‘জাগুয়ার এস টাইপ’ ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল গাড়ি আটক করে শুল্ক গোয়েন্দা। প্রায় তিন কোটি টাকা দামের এই তিনটি গাড়িই কার্নেট সুবিধার অপব্যবহার করে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। ৩১ আগস্ট গভীর রাতে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি কাকরাইলে শুল্ক গোয়েন্দার সদর দফতরের সামনে প্রায় তিন কোটি টাকা দামের অবৈধ মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি ফেলে রেখে যান। এ গাড়িতে থাকা খোলা চিঠিতে বলা হয়, ‘আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে আমার দখলে থাকা গাড়িটি শুল্ক গোয়েন্দার সদর দফতরে জমা প্রদান করি। আমি এই গাড়িটি জমা দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই যে, আমার মতো অন্যরাও যেন অনুরূপভাবে অবৈধ গাড়ি জমা প্রদান করেন।’ ১ আগস্ট চট্টগ্রামে অভিযান চালিয়ে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া প্রায় ১১ কোটি টাকা দামের বিলাসবহুল দুটি গাড়ি আটক করা হয়। গাড়ি দুটির একটি রেঞ্জ রোভার, যারা দাম প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। এটি চট্টগ্রাম মহানগরীর মেহেদীবাগ এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। আরেকটি নগরীর অলঙ্কার মোড়-সংলগ্ন পেট্রলপাম্প থেকে প্রায় ছয় কোটি টাকা দামের পোরশে মডেলের গাড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। এই গাড়িগুলোর বৈধ রেজিস্ট্রেশন অথবা আমদানি-সংক্রান্ত কোনো দলিলাদি নেই। মংলা বন্দর দিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় ছাড় করা জার্মানির তৈরি ভক্সওয়াগন গলফ এস মডেলের একটি গাড়ি ২৪ জুলাই রাজধানীর কাকরাইল থেকে আটক করে শুল্ক গোয়েন্দা। আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা ও কম শুল্ক দেওয়ার অপরাধে গাড়ি আটক করা হয়। এটি ৮ মার্চ মংলা বন্দরে খালাস হয়। ৬২ লাখ টাকা দামের এই গাড়ির আমদানিকারক টিবিএইচ কোং। মিরপুরের দারুস সালামের ১৬/১ আনন্দনগরে মো. শহীদুল্লাহর বাসা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় দীর্ঘদিন নজরদারিতে থাকা বিলাসবহুল নীল রঙের বিএমডব্লিউ ১৯ জুলাই আটক করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া নম্বর-প্লেট ব্যবহার করা তিন কোটি টাকা দামের এই গাড়ির মালিক রোপেন নামের গুলশানের এক ব্যবসায়ী। কার্নেট সুবিধার অপব্যবহার করে শুল্ক ফাঁকি দেওয়ায় ২৫ জুন সুনামগঞ্জ সদরের হাজীপাড়ার একটি বাসা থেকে প্রায় চার কোটি টাকা দামের কালো রঙের বিলাসবহুল লিক্সাস জিপ (আরএক্স৩০০) আটক করেছে শুল্ক গোয়েন্দা। গাড়িটি আমদানির কাগজপত্র জাল করে বিআরটিএ থেকে রেজিস্ট্রেশন করা হয়। লন্ডনপ্রবাসী রুপা মিয়া ২০১০ সালের ৭ অক্টোবর গাড়িটি শুল্কমুক্ত সুবিধায় ছাড় করান। মংলা বন্দরে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে ২১ জুন যুক্তরাজ্যের তৈরি সাদা রঙের মিনি কুপার আটক করা হয়। গাড়ির আমদানিকারক ফয়সাল জাকারিয়া মিথ্যা ঘোষণা দেওয়ায় গাড়িটি জব্দ করা হয়। চলতি বছরের ২০ জুন মংলা বন্দরে দুটি ও রাজধানীর কমলাপুর আইসিডিতে একটি গাড়ি জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা। ১৩ জুন রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোডে প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের চারটি মার্সিডিজ নিউ ব্র্যান্ডের গাড়ি আটক করা হয়। ১২ জুন বারিধারা স্বদেশ অটো লিমিটেড থেকে আটক করা হয় শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা ১৫ কোটি টাকা দামের চারটি গাড়ি। ৯ জুন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে দুটি গাড়ি জব্দ করা হয়। ৬ জুন চট্টগ্রাম বন্দরের কাস্টমস জেটি থেকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আমদানি করা ৬ কোটি টাকা দামের একটি রেঞ্জ রোভার গাড়ি আটক করা হয়। চলতি বছরের ৩১ মে রাজধানীর উত্তরা থেকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের হার্ড জিপ ল্যান্ড রোভার গাড়ি আটক করে শুল্ক গোয়েন্দা। ২৫ মে তেজগাঁও থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় প্রায় পাঁচ কোটি টাকা দামের বিএমডব্লিউ গাড়ি আটক করা হয়। গাড়িতে ভুয়া নম্বর প্লেট ছিল। ৩ মে বনানী থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা দামের বিলাসবহুল রেসিং গাড়ি আটক করা হয়। একই সময়ে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতাল থেকে জাতীয় পার্টির একজন সংসদ সদস্যের ফেলে রাখে যাওয়া সাড়ে ৩ কোটি টাকা দামের একটি গাড়ি উদ্ধার করা হয়। ২৪ এপ্রিল গুলশানের এবিকো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা দামের একটি পোর্শে মডেলের গাড়ি আটক করা হয়। ১৯ এপ্রিল জালিয়াতির মাধ্যমে আমদানি করা ৪ কোটি টাকা দামের একটি লেক্সাস গাড়ি সিলেট থেকে আটক করা হয়। ১২ এপ্রিল বনানী থেকে আটক করা হয় বিএমডব্লিউ সিডান মডেলের ৩ কোটি টাকা দামের একটি গাড়ি। এর মালিক জাকির হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী। ৯ এপ্রিল সিলেট এয়ারপোর্ট রোড থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে আমদানি করা ১ কোটি ৭ লাখ টাকা দামের মার্সিডিজ বেঞ্জ সিলভার কালারের একটি গাড়ি আটক করা হয়। ৬ এপ্রিল কথিত মডেল জাকিয়া মুনের কাছ থেকে ৫ কোটি টাকা দামের একটি অবৈধ গাড়ি আটক হয়। গুলশানে তার্কিশ হোপ স্কুল-সংলগ্ন মুনের বাসা থেকে উদ্ধার পোর্শে মডেলের গাড়িটির মালিকানা দাবি করেছেন তার কথিত স্বামী প্যাসেফিক গ্রুপের কর্ণধার ব্যবসায়ী শফিউল আজম মহসীন। ৪ এপ্রিল অবৈধভাবে আমদানি করা তিন কোটি টাকা দামের বিএমডব্লিউ এক্স-ফাইভ মডেলের একটি গাড়ি গুলশান থেকে আটক করা হয়। গাড়িটি ব্যবহার করতেন বুয়েটের শিক্ষক কাজী ফাহরিবা মোস্তফা। ১০ মার্চ ৩৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চারটি গাড়ি অবৈধভাবে আমদানি করায় দুবাই এভিয়েশন করপোরেশনের বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় মামলা করেছে শুল্ক গোয়েন্দা। গত বছর ৯ ডিসেম্বর মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা আরও একটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করা হয়। অবৈধভাবে আমদানি করা বিএমডব্লিউ গাড়িটিও এক্স-ফাইভ মডেলের। গুলশান-২ নম্বর এলাকা থেকে গাড়িটি জব্দ করা হয়। অবৈধভাবে আনা এই গাড়ির দাম প্রায় তিন কোটি টাকা। জানা গেছে, জাফর সাদেক চৌধুরী নামের এক ব্যবসায়ী ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে এই গাড়িটি আমদানি করেন। গত বছর ৩ এপ্রিল ধানমন্ডির ৫ নম্বর সড়কের ২৩/এ বাড়ি থেকে অবৈধভাবে আনা বিলাসবহুল মার্সিডিজি বেঞ্জ গাড়ি আটক করে শুল্ক গোয়েন্দা। গাড়িটির মালিক বেলায়েত হোসেন। ওই গাড়ির দাম প্রায় ৫ কোটি টাকা। গাড়িটির নম্বর- ঢাকা মেট্রো-গ-১৪-৯৭৩৮। এ বিষয়ে ধানমন্ডি থানায় মামলা হয়েছে। অপরদিকে গত বছর ৭ মে একই নম্বর প্লেট ব্যবহার করায় বনানী ও উত্তরা থেকে দুটি গাড়ি আটক করা হয়েছে। এর একটি টয়োটা প্রাডো জিপ ও অপরটি বিএমডব্লিউ গাড়ি দুটিতে ব্যবহূত নম্বর ভুয়া ছিল।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow