Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : রবিবার, ৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৮ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:৪৪
সেশনজট ও টেন্ডারে অস্থির চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
সুখে-দুঃখে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়
রেজা মুজাম্মেল, চট্টগ্রাম
সেশনজট ও টেন্ডারে অস্থির চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম উচ্চশিক্ষা নিকেতন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) ভর করে আছে নানামুখী সমস্যা আর সংকট। চবির উন্নয়ন কাজে টেন্ডার ফরম বিক্রি নিয়ে লেগে আছে অস্থিরতা। সারা বছর থাকছে সেশনজট। আছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আবাসন ও পরিবহন সমস্যা। জটিলতা কাটছে না বেদখল ভূমি উদ্ধারে। ফাটল ধরেছে আবাসিক ভবনে। নানা কারণে নষ্ট হচ্ছে আবাসিক হলের পরিবেশ।

তবে চবি কর্তৃপক্ষের দাবি, কিছু সমস্যা নিরসন প্রক্রিয়াধীন। কিছু জটিলতা দীর্ঘদিনের হওয়ায় তা নিরসনে সময় লাগছে। আর কিছু আছে যা উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে পর্যায়ক্রমে এসব সমস্যা নিরসন করা হবে।

টেন্ডার নিয়ে অস্থিরতা : ৭৫ কোটি টাকায় চবির কলা অনুষদ পাঁচতলায় উন্নীতকরণ ও ১৯ কোটি টাকায় বঙ্গবন্ধু হল সম্প্রসারণে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টেন্ডার জমা দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ আছে, এ টেন্ডার চবির সাবেক নেতাদের তিনটি সিন্ডিকেট দখলে নেওয়ার চেষ্টা করে। টানা কয়েক দিন পাহারা দিয়ে রাখা হয় প্রকৌশল দফতর। টেন্ডার  শিকারিরা মহড়া দেয় চবির ২০টি স্পটে। ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিডিউল জমা পড়ে মাত্র একটি করে। তবে শিডিউল বিক্রির শেষ সময়ে দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছে আরও দুটি ফরম বিক্রি করা হয়। কিন্তু দরপত্র জমা দিতে এসে ফিরে যেতে হয়েছে ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে। এ নিয়ে ক্যাম্পাসে ছিল উত্তেজনা। এর আগে ২০১৩ সালে শেখ হাসিনা হলের (প্রথম ধাপ) নির্মাণকাজে চাঁদা দাবি করেছিল ছাত্রলীগ। তখন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ছাত্রলীগের চাপে বেশ কিছুদিন কাজও বন্ধ রাখে।

সেশনজটের কবলে শিক্ষার্থীরা : চবির ৪৭টি বিভাগ-ইনস্টিটিউটের অধিকাংশেই ভর করেছে সেশনজট। জীববিজ্ঞান অনুষদের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, মাইক্রোবায়োলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, কলা অনুষদের ইতিহাস ও ইসলামের ইতিহাস বিভাগ ছাড়া প্রায় সব বিভাগেই লেগে আছে সেশনজট। এর মধ্যে বাণিজ্য অনুষদের অ্যাকাউন্টিং, মার্কেটিং ও কলা অনুষদের ইংরেজি বিভাগ সেশনজটে শীর্ষে। চার বছরের অনার্স শেষ করতে লাগছে সাড়ে পাঁচ বছর। এক বছরের মাস্টার্স শেষ করতে লাগছে দেড় থেকে দুই বছর। চবি সূত্রে জানা যায়, কলা অনুষদে অনার্স কোর্স শেষ হতে লাগছে সাড়ে পাঁচ বছর। সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অর্থনীতি, নৃবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স কোর্স সাড়ে পাঁচ বছরের কমে শেষ হচ্ছে না। এ অনুষদে বেশি সেশনজট অর্থনীতি বিভাগে। ১৯৯৩ সালে যাত্রা করা আইন অনুষদ সেশনজট মুক্ত হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সেটিও এখন সেশনজটের কবলে। বাণিজ্য অনুষদের ছয়টি বিভাগেও ভর করছে সেশনজট। মার্কেটিং, অ্যাকাউন্টিং ও ম্যানেজমেন্ট বিভাগে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করতে সাত বছরেরও বেশি সময় লাগছে। বিজ্ঞান অনুষদের পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত ও পরিসংখ্যান বিভাগে আছে এক বছরের সেশনজট। জীববিজ্ঞান অনুষদের মনোবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিদ্যা ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগে চার বছরের অনার্স শেষ করতে লাগছে সাড়ে ছয় বছর। এ ছাড়া ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজ এবং ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটে চার বছরের অনার্স শেষ হয় পাঁচ বছরে।

পরিবহন সংকট : চবিতে পরিবহন সংকট দীর্ঘদিনের। ২৩ হাজার ৮৭৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে এখানে ছাত্র ১৫ হাজার ৪৫৫ ও ছাত্রী ৮ হাজার ৪২১। তাদের যাতায়াতে কোনো বাস সার্ভিস নেই। যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম শাটল ট্রেন। কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়। আবার শাটল ট্রেনের অনেক আসন ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত বগিভিত্তিক সংগঠনের নেতার দখলে থাকে বলে অভিযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের। জানা যায়, চবিতে দুটি শাটল ট্রেন চলাচল করে। প্রতিটিতে ৯টি করে ১৮টি বগি আছে। প্রতি বগিতে ১৪৪টি করে মোট আসন আছে ২ হাজার ৫৯২টি। অভিযোগ আছে, প্রতি বগিতে প্রায় অর্ধেক আসনই ছাত্রলীগের দখলে থাকে। আসন সংকটের কারণে প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থী ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদ, দরজা ও ইঞ্জিনের সামনে দাঁড়িয়ে যাতায়াত করেন। ফলে দুর্ঘটনাও ঘটে। তবে একসময় শিক্ষার্থীদের জন্য কয়েকটি বাস থাকলেও বর্তমানে তা বন্ধ। ফলে রাতে শহর থেকে ক্যাম্পাসে যেতে শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হতে হয় দুর্ভোগের। পরিবহন দফতরের প্রশাসক প্রফেসর ড. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর জন্য পরিবহন ব্যবস্থা অপ্রতুল। বর্তমানে শিক্ষকদের জন্য ২৬টি বাস, হাটহাজারী, রাউজান ও ফটিকছড়ির শিক্ষার্থীদের জন্য বিআরটিসির ১০টি, মহিলাদের জন্য তিনটি এবং নগরের শিক্ষার্থীদের জন্য দুটি শাটল ট্রেন আছে। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য শাটল ট্রেন ও বাস বৃদ্ধি এবং শিক্ষকদের জন্য এসি বাসের দাবি থাকলেও তা পূরণ হয়নি।

বেদখলে ভূমি : চবির মোট ভূমি আছে ১৭৫৩ দশমিক ৮৮ একর। এর মধ্যে বিএস জরিপ হয় ১২৫৫ একর। বাকি ৪৯৮ একর ভূমি এখনো বেদখলে আছে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে এসব ভূমি বেদখলে আছে। বিভিন্ন সময় এসব ভূমি উদ্ধারে অভিযান চললেও কার্যত বেদখলই থেকে যায়। এখানে গড়ে উঠেছে বাসাবাড়ি, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ নানা স্থাপনা। দখলদারদের তালিকায় আছেন চবি-সংশ্লিষ্ট অনেকেই।

আবাসন সংকট : চবির শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট দীর্ঘদিনের। এখানে ১০টি আবাসিক হল আছে। এর মধ্যে ছাত্রহল সাতটি ও ছাত্রীহল তিনটি। এসব হলে পাঁচ হাজার ৯৪ জন শিক্ষার্থীর থাকার সুযোগ আছে। কিন্তু ২৩ হাজার ৮৭৬ শিক্ষার্থীর এ শিক্ষানিকেতনে এটি নিতান্তই নগণ্য।

অপ্রতুল চিকিৎসাসেবা : বেহাল দশা চবির মেডিকেল সেন্টারের। নেই রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচর্যা। সময়মতো পাওয়া যায় না চিকিৎসক। থাকে না প্রয়োজনীয় ওষুধ। ২৩ হাজার ৮৭৬ শিক্ষার্থীদের একমাত্র ভরসা এ সেবাকেন্দ্রে পাওয়া যায় না প্রত্যাশিত সেবা। সব রোগের মহৌষধ নাপা, হিস্টাসিন, এইস। নেই অভিজ্ঞ চিকিৎসক। ফলে রোগীদের ভোগান্তি এখানে চরমে। এখানে মোট ১১ জন চিকিৎসক, চারটি অ্যাম্বুলেন্স ও ছয়টি অস্থায়ী শয্যা রয়েছে। অভিযোগ আছে, দুই শিফটে একজন করে মহিলা চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও তাদের পাওয়া যায় না। ছয়টি অ্যাম্বুলেন্সের চারটিই অচল। বাকি দুটির মধ্যে একটির অবস্থা শোচনীয়। সচল দুটি অ্যাম্বুলেন্সে রোগী না নিয়ে চিকিৎসক ও তাদের সন্তানদের স্কুলে আনা-নেওয়ার কাজ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংকট আসন সংখ্যায় : চবির সাতটি অনুষদের ৩৬টি বিভাগে মোট আসন আছে চার হাজার ৭৯১টি। কিন্তু চলতি ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে আবেদন জমা পড়েছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭৭৯টি। প্রতি আসনের জন্য লড়তে হচ্ছে ৫১ জন পরীক্ষার্থীকে। পর্যাপ্ত আসন না থাকায় প্রতিবছরই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে।

চবি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : চবির রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) প্রফেসর ড. কামরুল হুদা বলেন, ‘সম্প্রতি টেন্ডার নিয়ে যা ঘটেছে তা দাফতরিক নয়। এ ছাড়া ওই প্রকল্পের কাজের পুনঃ দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তাতেও যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয় তাহলে আমরা ই-টেন্ডারে যাব।’ সেশনজট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে সেশনজট অনেক কমে এসেছে। অতীতের তুলনায় বর্তমানে সেশনজট নেই বললেই চলে।’ শিক্ষার্থীদের পরিবহন সংকট প্রসঙ্গে রেজিস্ট্রার বলেন, ‘শাটল ট্রেন বৃদ্ধির পরিকল্পনা আছে। স্টেশনের যে প্লাটফরম আছে, সেখানে নয়টির বেশি বগি ঘোরানো যায় না। তাই আমরা রেলপথ মন্ত্রণালয়ে প্লাটফরমটি বড় করার প্রস্তাব করেছি, যাতে অন্তত ১২ থেকে ১৫টি বগি ঘোরানো যায়। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট অচিরেই কাটবে।’

up-arrow