Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৯ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:৫৬
সিন্ডিকেটে বন্দী শেয়ারবাজার
ব্রোকার হাউস মালিক কোম্পানির পরিচালন বৃহৎ বিনিয়োগকারীরা নিয়ন্ত্রণ করছে সব
আলী রিয়াজ

একাধিক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে শেয়ারবাজার। সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে লেনদেন হয় বাজারে। শেয়ারবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্রোকার হাউস মালিক, কোম্পানির পরিচালন, বৃহৎ বিনিয়োগকারীরা মিলে তৈরি করেছে এই সিন্ডিকেট। বর্তমানেও শেয়ারবাজার সিন্ডিকেটের দাপটে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারছে না। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে জুয়াড়িদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিলেও কারসাজি রোধ করা যাচ্ছে না। বড় ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে কিছু দিন চুপ থেকে ফের সক্রিয় হয়ে ওঠে জুয়াড়িরা। বিশেষজ্ঞরা বিনিয়োগকারীদের এই জুয়াড়িদের সম্পর্কে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলছেন, শুধু মুনাফা নয়, শেয়ার কারসাজিকারীদের সম্পর্কে সতর্ক না থাকলে নিজের পুঁজি হারানোর শঙ্কা থাকে। বাজারে বিনিয়োগের সময় গুজবনির্ভর কোনো বিনিয়োগ করা উচিত নয়। শেয়ারবাজারে কেবল নিরবচ্ছিন্ন লাভ, তিন বা ছয় মাসেই পুঁজি দ্বিগুণ, রাতারাতি টাকাওয়ালা বনে যাওয়ার স্বপ্নে তাড়িত হয়ে যারা নিজের ও স্বজনদের সব সঞ্চয় নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তাদেরই বিপদ বেশি। এসইসির উচিত সিন্ডিকেটের ব্যাপারে কঠোর নজরদারি করা। ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালের ভয়াবহ দরপতনের ঘটনার পরে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রণে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এরপর কিছুদিন চুপচাপ থাকলেও সিন্ডিকেট চক্র আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে। এই চক্র নির্দিষ্ট কিছু শেয়ার সম্পর্কে গুজব ছড়িয়ে দর ওঠানামা করায়। কিছু শেয়ারের সম্পর্কে দর বৃদ্ধির তথ্য ছড়িয়ে সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় কোটি কোটি টাকা।

কয়েক মাস আগেও কয়েকটি কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ শেয়ার ছিল। এসব শেয়ার সম্পর্কে গুজব ছড়িয়ে নিজেরা বিক্রি করে দিয়েছে। দেখা গেছে বর্তমানে ওই সব কোম্পানির পরিচালকদের শেয়ার সংখ্যা ২০ থেকে ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। কোম্পানিগুলোর এমন তথ্য দেখে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করা অনেকে তাদের বিনিয়োগ  প্রত্যাহার করেছেন। অভিযোগ রয়েছে বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে যোগসাজশ করে তারা কোনো ঘোষণা না দিয়ে বাজারে শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছে। এর ফলে শেয়ারের দর অনেক কমে যায়। সম্প্রতি লেনদেনে আসা একমি ল্যাবরেটরিজের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছে। লেনদেন শুরু হওয়ার সময় ৫৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ শেয়ার ছিল কোম্পানির উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকদের কাছে। বাকি শেয়ারের মধ্যে ৩২ দশমিক ২৬ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং ১০ শতাংশ শেয়ার ছিল সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে। আর বর্তমানে এ শেয়ারের ৩৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ আছে উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকদের কাছে। বাকি শেয়ারের মধ্যে ২৬ দশমিক ৫৪ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, দশমিক ৪৮ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং ৩৪ দশমিক ১০ শতাংশ শেয়ার আছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে। একই ঘটনা ঘটেছে মতিন স্পিনিং, ডিবিএইচ, বেঙ্গল উইন্ডশরসহ অনেক কোম্পানিতে। এর বাইরে সম্প্রতি বাজারে জাঙ্ক শেয়ার হিসেবে পরিচিত কয়েক কোম্পানির শেয়ারদর কোনো কারণ ছাড়াই বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলসের তিন প্রান্তিকে ইপিএস ছিল ১ টাকা ৯৬ পয়সা। এ হিসেবে বছর শেষে ইপিএস হওয়ার কথা ২ টাকা ৬০ পয়সার কাছাকাছি। কিন্তু ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫ সমাপ্ত হিসাব বছরে কোম্পানিটি ইপিএস দেখিয়েছে ৪ টাকা ৭৮ পয়সা। ইপিএসের এই উল্লম্ফনের খবর আসার পর থেকেই কোম্পানির শেয়ারের দাম ব্যাপক হারে বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে দাম বেড়ে প্রায় ২০০ টাকায় উঠে যায়। এর কিছু দিনের মধ্যে কোম্পানির উদ্যোক্তাদের শেয়ার বিক্রির ঘোষণা আসে। জেমিনি সি ফুডের প্রথম প্রান্তিকে ইপিএস) হয়েছে ৮ টাকা ৫৪ পয়সা। আগের বছর একই সময়ে কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি লোকসান ছিল ১ টাকা ৫৯ পয়সা। এর পর অক্টোবর মাস থেকে শেয়ারে দাম বাড়তে থাকে। ৪০০ টাকা থেকে বেড়ে এটি হয় প্রায় ১১৪৫ টাকা। কেয়া কসমেটিকস তৃতীয় প্রান্তিকে ইপিএস হয়েছে ৬১ পয়সা। গত বছর একই সময়ে লোকসান ছিল ২২ পয়সা। তবে ৯ মাসে কোম্পানিটির বেসিক ইপিএস হয়েছে ১ টাকা ৪৬ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এটি লোকসান ছিল ২০ পয়সা। ডাইলুটেড করার পর এটি হয়েছে ১ টাকা ২২ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ লোকসান ছিল ১৬ পয়সা। এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এর বাইরেও এ্যাপেক্স ফুডস, রহিম টেক্সটাইল ও বিডি অটোকার্স। কোম্পানিগুলোর শেয়ারের অস্বাভাবিক দর বাড়ার পেছনে কারণ জানতে চেয়ে ডিএসই নোটিস পাঠায়। এর জবাবে কোম্পানিগুলো জানায়, কোন রকম অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই শেয়ার দর বাড়ছে। গত ৪ আগস্ট থেকে এ্যাপেক্স ফুডসের শেয়ার দর টানা বেড়ে চলেছে। এর মধ্যে মাত্র দুই কার্যদিবস শেয়ারটির দরপতন হয়েছে। আলোচিত সময়ে শেয়ারটির দর ১২১ টাকা ৪০ পয়সা থেকে বেড়ে সর্বশেষ ১৩৩ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে শেয়ারবাজারে ১৯৯৬ ও ২০১০ সালে শেয়ার কারসাজি করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে। তারাই এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে শেয়ারবাজারে। শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক ব্রোকার সদস্যরা মিলে তৈরি করেছে একাধিক গ্রুপ। যারা নেতৃত্বে থাকে তাদের মাধ্যমেই লোপাট হয় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ। জানতে চাইলে খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সময় যারা বাজারে প্রভাব বিস্তার করতেন এখনো মার্কেটে তারা রোল প্লে করছেন। অর্থাৎ বাজার এখনো তাদেরই দখলে। বিচারের জন্য যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সেটা খুবই সীমিত, পুরো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নয়। এসইসির উচিত ছিল আরও বেশি তদন্ত করে কারসাজির সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটের সব সদস্যকে শাস্তির আওতায় আনা। বর্তমানেও এই চক্রের মধ্যেই বন্দী হয়ে পড়েছে বাজার।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow