Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বুধবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১১ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:১০
তেরো সংকটে মংলা বন্দর
সামছুজ্জামান শাহীন, খুলনা
তেরো সংকটে মংলা বন্দর

১৩ সংকট মাথায় নিয়ে চলছে দক্ষিণাঞ্চলের সম্ভাবনাময় মংলা বন্দর। এতে পণ্য খালাস-বোঝাইসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ব্যবহারকারীদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ফলে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বন্দরে বার্ষিক মালামাল ওঠানো-নামানোর ক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশই অব্যবহৃত থাকছে।

জানা যায়, বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি (ইকুইপমেন্ট) নেই। বিশেষ করে ২০ ফুট কনটেইনারের স্বল্পতা দীর্ঘদিনের। শুল্ক বিভাগের স্ক্যানার না থাকায় কার্গো পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সময় অপচয় হয়। কাস্টমস অফিসের সব কার্যক্রম মংলায় না থাকায় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমেও দীর্ঘসূত্রতায় ভোগান্তি বাড়ে। আবার শেড না থাকায় বন্দরের যেখানে সেখানে খোলা আকাশের নিচে রাখা হয়েছে হাজার কোটি টাকা দামের প্রচুর গাড়ি।

জানা যায়, নানা সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের মোট আমদানি পণ্যের শতকরা ৬ থেকে ৮ ভাগ আমদানি হয় মংলা বন্দর দিয়ে। বন্দরের আউটার বার এলাকার ড্রেজিং না করায় আকরাম পয়েন্ট ও হারবারিয়া এলাকায় বেশি ড্রাফটের (বড় জাহাজ) জাহাজ আসতে পারে না। সান্ধ্যকালীন ব্যাংকিং কার্যক্রম না থাকায় আমদানিকৃত মালামাল খালাসে বিঘ্নতার সৃষ্টি হয়।

আমদানিকারকরা জানান, ২০০৯ সালের ৩ জুন মংলা বন্দরের মাধ্যমে সর্বপ্রথম রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি শুরু হয়েছে এবং তা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারি পর্যায়ে আমদানিকৃত খাদ্যশস্য ও সারের ৪০% মংলা বন্দরে খালাসের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করায় পণ্য ওঠানো-নামানো অনেক বেড়েছে। কিন্তু নানামুখী সংকটে বন্দরে জাহাজ আসা ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বার বার পিছিয়ে পড়ছে।

অনাগ্রহের কারণ : বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বন্দর ব্যবহারকারীদের সমন্বয়ে গঠিত ১০ সদস্যের কমিটি সম্প্রতি মংলা বন্দরের ১৩টি সংকট চিহ্নিত করে তা নিরসনে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ আকারে উপস্থাপন করেছে। ওই সুপারিশপত্রে বলা হয় : ‘মংলা বন্দরে আসা জাহাজের ভাড়া তুলনামূলক বেশি ও এখানে ইকুইপমেন্টের স্বল্পতা রয়েছে। এ ছাড়া জাহাজে বাহিত মালামালের পরিমাণ, গুণগত মান ইত্যাদি বিষয়ে আমদানিকারকদের সঙ্গে শিপিং এজেন্টদের মতবিরোধ, স্টিভেডরের সঙ্গে হ্যান্ডলিং বাবদ পাওনার বিষয়ে সাপ্লায়ার বা শিপিং এজেন্টের মতবিরোধে মালামাল খালাস কাজ ব্যাহত হয় এবং জাহাজ দীর্ঘদিন বন্দরে পড়ে থাকে। এসব কারণেও জাহাজের মালিকরা কখনো কখনো মংলা বন্দরে জাহাজ পাঠাতে নিরুৎসাহিত হন।

শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় ভোগান্তি : মংলা বন্দর থেকে রপ্তানি ও আমদানির কাজে শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় শুল্ক বিভাগের ছাড়পত্র নিতে আমদানি ও রপ্তানিকারককে ছুটতে হয় বন্দর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে খুলনা নগরীর খালিশপুরে অবস্থিত শুল্ক ভবনে (কাস্টম হাউস)। কাস্টম্স কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালি ও হয়রানির বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মংলা বন্দরেই শুল্ক বিভাগের (কাস্টম্স) পূর্ণাঙ্গ একটি ইউনিট থাকার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এ প্রসঙ্গে মংলা বন্দর ব্যবহারকারী সমন্বয় কমিটির মহাসচিব অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম বলেন, বন্দরের মূল সমস্যা কাস্টম্স। তাদের অহেতুক হয়রানি ও ঘুষ বাণিজ্যের কারণে আমদানিকারকরা বন্দর ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের মালামাল খালাসে দিনের পর দিন লাগলেও মংলা বন্দর ব্যবহারে তারা আগ্রহ দেখায় না। মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য পরিচালক (ট্রাফিক) আবদুস সালাম বলেন, আমদানিকারকরা প্রায়ই শুল্ক বিভাগের সমস্যার কথা বলেন। তবে শুল্ক বিভাগে স্ক্যানার আনা হলেও তা এখনো স্থাপন করা হয়নি।

সময় ক্ষেপণ : মংলা থেকে ঢাকা পর্যন্ত উন্নত সড়কব্যবস্থা থাকলেও অনিয়মিত ফেরি পারাপার ব্যবস্থায় রাজধানীর সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে। যে কারণে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুরের শিল্পগুলো মংলা বন্দরের ওপর নির্ভর করতে পারেনি। তারা সব সময়ই চট্টগ্রাম বন্দরকে প্রাধান্য দিয়ে আসছে। কিন্তু পদ্মা সেতু নির্মাণ হলে এ অবস্থার পরিবর্তন হবে। কারণ, বর্তমানে ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের দূরত্ব সড়কপথে প্রায় ২৬৫ কিলোমিটার। পদ্মা সেতু নির্মাণ হলে ঢাকার সঙ্গে মংলা বন্দরের দূরত্ব হবে সড়কপথে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার। এতে পরিবহন খরচ ও সময় দুই-ই সাশ্রয় হবে।

সম্ভাবনা : মংলা বন্দর ঘিরে পদ্মা সেতু, খুলনা-মংলা রেলপথ, খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণ হচ্ছে। মংলা ইপিজেডের কার্যক্রম দিন দিন বাড়ছে। মংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। ভারতসহ ভুটান ও নেপাল নিকট ভবিষ্যতে মংলা বন্দর ব্যবহার শুরু করবে। এ ছাড়া এ বন্দরের কাছাকাছি স্থানে বেসরকারি উদ্যোক্তারা বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন। স্বভাবতই এসব সরকারি-বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রধানত মংলা বন্দর ব্যবহার করবে। ফলে ২০২০ সালের মধ্যে মংলা বন্দরে জাহাজ আগমন ও মালামাল হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ গাণিতিক হারে বাড়বে।

এ প্রসঙ্গে মংলা বন্দরের ডেপুটি ট্রাফিক ম্যানেজার মোস্তফা কামাল জানান, বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে ইতিমধ্যে অনেক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রায় ৯০ কোটি টাকা খরচ করে বন্দরের জন্য প্রয়োজনীয় ২২টি ইকুইপমেন্ট আনা হয়েছে। জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের সুবিধার্থে ১০০ ও ৫০ টন ক্ষমতাসম্পন্ন মোবাইল ক্রেন সংগ্রহ করা হয়েছে। ১১২ কোটি টাকা ব্যয়ে পশুর চ্যানেলে ড্রেজিং কাজ সম্পন্ন হয়েছে। হিরণ পয়েন্ট ও রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র পর্যন্ত ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে দেওয়া বন্দর ব্যবহারকারীদের সুপারিশপত্রে মংলা বন্দর ব্যবহারে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে আগামী তিন বছরের জন্য এ বন্দরের মাধ্যমে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ২০% শুল্ককর হ্রাসের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে তা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সম্পর্কিত ও সরকারি নীতিনির্ধারণী বিষয় বলে জানিয়েছে মংলা কাস্টম হাউস।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow