Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বুধবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১১ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:১১
অবশেষে সাভারমুখী ট্যানারি শিল্প
নবনির্মিত দুটিতে ঝুলছে চামড়াবোঝাই ড্রাম, নতুন যন্ত্র বসছে কয়েকটিতে
মোস্তফা কাজল

অবশেষে সাভারমুখী রাজধানীর হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্প। দুই বছর আগেও এখানে ছিল বালুর মাঠ।

এখন চলছে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের পাইলিং, দেয়াল নির্মাণ এবং ছাদ ঢালাইসহ নানা ধরনের নির্মাণের কর্মযজ্ঞ। সরেজমিন সেখানে দেখা গেছে, নবনির্মিত দুটি ট্যানারিতে চামড়াবোঝাই ড্রাম ঘুরছে। কয়েকটিতে যন্ত্র স্থাপনে ব্যস্ত শ্রমিকরা। দেরিতে হলেও শেষ পর্যন্ত সাভারমুখী হয়েছেন হাজারীবাগের ট্যানারি মালিকরা। মূল কারণ আদালতের জরিমানা আরোপ। নইলে শিল্পপ্লট বাতিলে মন্ত্রণালয়ের কড়া হুঁশিয়ারি। এ ছাড়াও যেসব ট্যানারি স্থানান্তরের জন্য অর্থ সংকট রয়েছে তারা স্বল্পসুদে ঋণ পেতে আগামী ১৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আবেদন করবেন। সাভারের হরিণধরা মোড় থেকে কিছুটা এগোলেই চামড়া শিল্পনগরী। হাজারীবাগ থেকে না যাওয়ায় সেখানকার ১৫০ ট্যানারিকে উচ্চ আদালতের নির্দেশে গুনতে হচ্ছে প্রতিদিন  মোট ১৫ লাখ টাকা জরিমানা। এ কারণে অবশিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সাভারমুখী হতে বেশ তত্পর হয়ে উঠেছে। চলতি অক্টোবর মাসেই সেখানে চালু হয়েছে অন্তত ২৫টি ট্যানারির কর্মকাণ্ড। হাজারীবাগ থেকে সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে ট্যানারি স্থানান্তরে ১৩ বছর ধরে সরকার সব ধরনের চেষ্টা চালাচ্ছে। সর্বশেষ গত ১০ এপ্রিল পর্যন্ত সময়  বেঁধে দিয়ে সরকার হাজারীবাগে কারখানা বন্ধ করার আলটিমেটাম দেয়। এরপর গত জুন মাসে উচ্চ আদালতের রায়ে ট্যানারিগুলো স্থানান্তরিত না হলে প্রত্যেক ট্যানারিকে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই থেকে হাজারীবাগের ১৫০ ট্যানারি প্রতিদিন ১৫ লাখ টাকা জরিমানা দিচ্ছে।

চলছে নির্মাণ কাজ : সাভার চামড়া নগরী ঘুরে আরও দেখা গেছে, পুরোদমে চলছে বেশির ভাগ ট্যানারির নির্মাণ কাজ। ২০৫টি প্লটে বরাদ্দ পেয়েছে ১৫৫ ট্যানারি। তবে আইনি জটিলতা থাকায় ১২টি ট্যানারির নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। দু-একটি ট্যানারির পাইলিংয়ের কাজ চললেও বেশির ভাগ ট্যানারি ভবন নির্মাণের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। এ ছাড়া ৯৪টি ট্যানারির ছাদ ঢালাই শেষ হয়েছে। এর মধ্যে অনেক ভবনই বহুতলবিশিষ্ট। ৫০টিতে যন্ত্রপাতি আনা হয়েছে। পাশাপাশি চলছে যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ। ২৫টিতে যন্ত্র স্থাপন শেষ হয়েছে। চারটি কারখানা চামড়াও নিয়ে এসেছে। কয়েক দিন আগে চালু হয়েছে মারসন্স নামের একটি ট্যানারি। রিলায়েন্স লেদার দুই মাস ধরে উৎপাদন করছে। মেশিন স্থাপনের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে এপেক্স, ঢাকা হাইড, ফরচুন, প্রিন্স, আজমেরি, ফেন্সি, সাথী, মদিনা, আমিন, সামিনা, বে, নবারুনসহ ৩০টি প্রতিষ্ঠানের। গত ২৪ সেপ্টেম্বর অ্যাসোসিয়েশনের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, অর্থ সংকটে থাকা ট্যানারিগুলো ডিসেম্বর পর্যন্ত হাজারীবাগে চালু রাখার জন্য আবেদন করা হবে।

প্রকল্পের অবস্থা : বিভিন্ন ট্যানারির তত্ত্বাবধায়করা জানান, শুধু মালিকদের কারণেই যে স্থানান্তরে দেরি হচ্ছে, তা নয়। প্রকল্পের কাজও বাকি আছে। পুরোপুরি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ শেষ হয়নি। দু-চারটি ট্যানারি বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ পেলেও অনেকে আবেদন করে এখনো সংযোগ পাননি। কোনো কোনো কারখানায় গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হয়নি। এখনো ওয়েস্ট ডাম্পিং ইয়ার্ড প্রস্তুত হয়নি। চালু দুটি ট্যানারি সলিড ওয়েস্ট বা বর্জ্য কুয়া খনন করে স্তূপ করছে। পরে ট্রাকবোঝাই করে অন্য স্থানে ফেলা হচ্ছে। ড্রেন লাইনের বর্জ্য স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় ত্রুটি ও দায়িত্বশীলদের গড়িমসির কারণে সড়কে ছড়িয়ে পড়ছে দুর্গন্ধযুক্ত পানি। এ ছাড়া ব্যবসায়ী, শ্রমিক, প্রকৌশলীসহ ট্যানারি-সংশ্লিষ্টদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা এখনো হয়নি। দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে শিল্পনগরীর প্রকল্প পরিচালক আবদুল কাইয়ুম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দুই সপ্তাহের মধ্যেই কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) দুটি মডিউল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হবে। এতে ৩০টির বেশি ট্যানারির বর্জ্য শোধন করা যাবে। এ ছাড়াও সলিড ওয়েস্ট ডাম্পিং প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যেসব ট্যানারি চালুর প্রক্রিয়ায় আছে তাদের দ্রুত বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। হাজারীবাগের গ্যাস সংযোগ বন্ধ হলে তারা সাভার শিল্পনগরীর ট্যানারিতে সংযোগ পাবেন বলে জানান তিনি। ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার,  লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) সাবেক সভাপতি আবু তাহের বলেন, সাভারে দ্রুত কারখানা চালুর চেষ্টা করছেন সব ট্যানারি মালিক। ট্যানারিগুলোর হাতে থাকা অর্থ ইতিমধ্যেই বিনিয়োগ করা হয়েছে। এখন অর্থ সংকটে অনেকে নির্মাণ কাজ শেষ করতে পারছেন না। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সাভারে এরই মধ্যে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে। এদিকে নির্মাণ কাজ শুরু হলেও কারখানা চালু করতে আরও তিন-চার মাসের বেশি সময়ের প্রয়োজন। এতে আগামী ছয় মাসে প্রায় ১৮ লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হবে। মারসন্স ট্যানারির মালিক মো. বাবু বলেন, পাঁচ দিনের জরিমানা দিয়ে দ্রুত এ ট্যানারি চালু করা হয়েছে। কিন্তু সলিড ওয়েস্ট  ফেলার নির্দিষ্ট কোনো স্থান নেই। তাই বর্জ্য জমে যাচ্ছে। আজমেরি লেদারের মালিক শহিদ উল্লাহ জানান, গত বুধবার হাজারীবাগের তার কারখানা বন্ধ করে সেখানকার যন্ত্রপাতি সাভারে আনা হয়েছে। এখন বিদ্যুৎ সংযোগের অপেক্ষা। তার মতো বিভিন্ন ট্যানারি মালিক এক থেকে দেড় লাখ টাকা জরিমানা জমা দিয়েছেন। বিসিক সূত্রে জানা যায়, বিদ্যুতের জন্য আবেদন করা ১২৮টি ট্যানারির মধ্যে ৪০টির টাকা জমা পড়েছে। এর মধ্যে চারটি সংযোগ পেয়েছে। তা ছাড়া ১০২টি গ্যাসের জন্য এবং ৪৩টি পানির জন্য আবেদন করেছে। তিনটিতে পানির সংযোগ দেওয়া হয়েছে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow