Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : রবিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৫ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:৫৪
কার্ড বিক্রি হচ্ছে হাজার টাকায়, অনিয়ম চলছেই
১০ টাকার চাল
প্রতিদিন ডেস্ক

হতদরিদ্রদের ১০ টাকা কেজির চাল বিতরণ নিয়ে দায়িত্বশীল মহল এবং প্রভাবশালীদের চালবাজি চলছেই। দরিদ্ররা এসব বিষয়ে অভিযোগ করেও কোনো ফল পাচ্ছে না। বিভিন্ন এলাকা থেকে এ সংক্রান্ত নানা খবর প্রতিদিনই পাওয়া যাচ্ছে।

কার্ড বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম : নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, মহাদেবপুর উপজেলার ভীমপুর ইউনিয়নে যাদের নামে কার্ড দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে অন্তত ২০০ জনই সচ্ছল। তাদের রয়েছে পাকা বাড়ি, ধানের চাতাল ও বয়লারের ব্যবসা, রয়েছে বয়স্ক ভাতা ও ভিজিডি কার্ড। এ ইউনিয়নে সচ্ছল পরিবারের যারা কার্ড পেয়েছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শিকারপুর গ্রামের বীরেন্দ্রনাথ, আন্দারকোঠা গ্রামের আবদুল জলিল, আনিছার রহমান, খাতিজা খাতুন, পাতনা গ্রামের আবদুল হামিদ, হর্ষি গ্রামের দেওয়ান মাহমুদুন্নবী, আবদুল আজিজ, মিন্টু আলম, বাছের, আফজাল হোসেন, ফারুক হোসেন, বাগাচারা গ্রামের ইসলাম হোসেন, রাজু, রানা, গোয়ালবাড়ী গ্রামের ইংরেজ আলী, চয়েন উদ্দীন, এনামুল হক, উজ্জ্বল, এমজি ইয়াসমিন, আসমা বানু, আবুল হাসান, জহুরা বেগম, সীমা বেগম ও পূর্ণিমা রানী মহন্ত, পিড়া গ্রামের বিপুল চন্দ্র মণ্ডল, কনকলতা হাজরা, বেলঘরিয়া গ্রামের গৌতম কুমার, মিঠন চৌধুরী, আনন্দ চন্দ্র প্রামাণিক, সুকুমার চন্দ্র সরকার, অসীম কুমার, দক্ষিণ লক্ষ্মীপুর গ্রামের শুধাংশু হাজরা, গণেশপুর গ্রামের সমর পাল, উত্পল হাজরা, মুকুল মণ্ডল ও বিউটি রানী, ভীমপুর গ্রামের সিরাজুল, জিয়াউল, সেকেন্দার আলী, আবদুস সালাম ও আসাদ আলী। এ ব্যাপারে ভীমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাম প্রসাদ ভদ্র বলেন, ‘ইউপি নির্বাচনের অল্প কিছুদিন পরই কার্ডের লিস্টের নির্দেশ আসায় সময় স্বল্পতার কারণে তাড়াহুড়া করতে গিয়ে নবনির্বাচিত ইউপি সদস্যরা কিছু কার্ড সচ্ছল ও বয়স্ক ভাতা প্রাপকদের নামে ইস্যু করে। এখন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পুনরায় যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত হতদরিদ্রদের নামেই কার্ড ইস্যু করা হচ্ছে।’

পাঁচশ-এক হাজার টাকায় কার্ড বিক্রি : কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, হতদরিদ্রের নামে ১০ টাকা মূল্যের কার্ড প্রণয়নে স্বজনপ্রীতি ও দেরিতে বিতরণ, বিক্রিতে অনিয়ম, ওজনে কম, সচ্ছল এবং প্রবাসীদের নামে চাল উত্তোলনের নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। চিলমারী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে জানা গেছে, কিছু মহিলা সংরক্ষিত ও ইউপি সদস্য, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিসহ দলীয় নেতা-কর্মীরা ১০ টাকার চালের তালিকা প্রণয়নে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, টাকার বিনিময়ে কার্ড বিক্রি করেছেন। তাই কার্ড পাওয়া থেকে বাদ পড়েছেন এলাকার হতদরিদ্ররা। এ ব্যাপারে পাত্রখাতা গ্রামের হতদরিদ্র মশিউরের স্ত্রী খাদিজা জানান, সংরক্ষিত মহিলা আসনের (৭, ৮, ৯) ওয়ার্ডের সদস্য মোছা. জাহানারা ১ হাজার টাকা চেয়েছিল। তিনি অনেক কষ্টে ৫০০ টাকা জোগাড় করে দিয়েছিলেন। খাদিজা বলেন, ‘৫০০ টাকা লাভের ওপর আনি দিছনু। কিন্তু মোক কার্ড না দিয়ে কইছে এই টাকায় হয় নাই, তোক ২০ কেজি চালের নাম দেইম তিন মাস পাবু।’ পরে এলাকাবাসীর অভিযোগের ভিত্তিতে আরেক বিত্তশালী কার্ডধারী মঞ্জু মিয়া বাড়িতে গিয়ে তাকে প্রশ্ন করলে তিনি জানান, ৩০০ টাকা দিয়ে তিনি কার্ড নিয়েছেন। ওই কার্ডটি তিনি অন্য একজনকে দিয়ে দিয়েছেন। শুধু মঞ্জু মিয়া নয়, এ রকম অনেক প্রভাবশালী, অবসরপ্রাপ্ত সেনা, ব্যবসায়ী, ধনাঢ্য কৃষকের নাম উঠেছে ১০ টাকার চালের তালিকা অর্থাৎ হতদরিদ্রদের তালিকায়। এ বিষয়ে এলাকার মুক্তিযোদ্ধা আ. মজিদ বলেন, ‘কিছু অসাধু ইউপি সদস্য, সংরক্ষিত মহিলা সদস্য, গণ্যমান্য ব্যক্তিসহ দলীয় লোকজন বিভিন্নজনের কাছ থেকে ৫০০ থেকে ১ হাজার করে টাকা নিয়ে কার্ড বিক্রি করেছে। তাই প্রকৃত হতদরিদ্ররা এই কর্মসূচি থেকে বাদ পড়েছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু চিলমারী নয়, কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট, উলিপুর, ভুরুঙ্গামারী, নাগেশ্বরী ও ফুলবাড়ীসহ ৭ উপজেলায়ই একই কাণ্ড করা হয়েছে।

হরিলুটে চেয়ারম্যান-মেম্বার-ডিলার শীর্ষে : সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, ১০ টাকার চাল নিয়ে শ্যামনগর উপজেলার কৈখালি ইউনিয়ন ও সাতক্ষীরা সদর উপজেলার লাবসা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান-মেম্বার ও ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ইউনিয়নে ওজনে কম দেওয়া থেকে শুরু করে গরিবদের বাদ দিয়ে গাড়ি-বাড়ির মালিকসহ বিত্তশালীদের মাঝে চাল পাওয়ার কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। এমনকি একই পরিবারের ৩ থেকে ৪ জন সদস্যের মধ্যেও বিতরণ করা হয়েছে চালের কার্ড। স্থানীয়দের অভিযোগ, শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসনের কাছে নতুন তালিকা প্রণয়ন ও ডিলারশিপ বাতিলের জন্য অভিযোগ করেও কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। জানা গেছে, শ্যামনগর উপজেলার ৫ নম্বর কৈখালি ইউনিয়নে গরিবদের বাদ দিয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যান জি এম রেজাউল করিম গাড়ি-বাড়ির মালিকসহ একই পরিবারের ৩ থেকে ৪ জনের নামে কার্ড দিয়েছেন। এমনকি সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামী থেকে আওয়ামী লীগে যোগদানকারী প্রায় ১০০০ বিঘা জমির মালিক ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মিন্দিনগরের ইন্দ্রিস হাজী এবং একই গ্রামের একতলা বিল্ডিংবাড়ি ও প্রায় ৫০ বিঘা জমি এবং ঘেরের মালিক মাকছুদুর রহমানকেও দেওয়া হয়েছে চালের কার্ড। এলাকাবাসী জানান, আগামী ৩১ অক্টোবর ইউনিয়ন পরিষদের স্থগিতকৃত ১, ২ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ নেতা ও চেয়ারম্যান রেজাউল করিম তার সমর্থকদের মধ্যে বিতরণ করেছেন চালের কার্ড। এর জন্য অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। এ ছাড়া সাতক্ষীরা সদর উপজেলার লাবসা ইউনিয়নে তালিকা তৈরি ও রেশন কার্ড বিতরণে ইউপি চেয়ারম্যান  জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল আলিমও পিছিয়ে নেই। তালিকা তৈরি এবং কার্ড বিতরণে নগদ টাকা পর্যন্ত আদায় করেছেন তার লোকেরা। একইভাবে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জামির হোসেনের বিরুদ্ধে হতদরিদ্র পরিবারের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে আদায় করার অভিযোগ উঠেছে। অতিদরিদ্রদের চাল নিয়ে জেলার সবকটি ইউনিয়নেই কমবেশি এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow